দেশের পুঁজিবাজারে পণ্যের বৈচিত্র্য, বাজারের গভীরতা ও দক্ষতা বাড়াতে এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড প্ল্যাটফর্মে আর্থিক ডেরিভেটিভস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। এ লক্ষ্যে ২০২৮ সালের জানুয়ারির মধ্যে ডেরিভেটিভ পণ্য চালুর পরিকল্পনা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে ডেরিভেটিভস চালুর আগে প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়ন, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি (সিসিপি) ব্যবস্থা এবং কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ডিএসই আয়োজিত ‘এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড প্ল্যাটফর্মে আর্থিক ডেরিভেটিভস প্রবর্তন বিষয়ে অংশীজনদের সঙ্গে সচেতনতা ও পরামর্শমূলক কর্মসূচিতে এ তথ্য জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কমিশনার মো. নাফিজ আল তারেক, নির্বাহী পরিচালক মো. আবুল কালাম, ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার এবং মার্কেট ডেভেলপমেন্ট ডিভিশনের জেনারেল ম্যানেজার সাইয়িদ মাহমুদ জুবায়ের উপস্থিত ছিলেন। এতে শীর্ষ ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান, মার্চেন্ট ব্যাংক, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অংশীজনরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে বিএসইসি কমিশনার নাফিজ আল তারেক বলেন, দেশের পুঁজিবাজারে ডেরিভেটিভ চালুর বিষয়ে কমিশন ইতিবাচক। তবে এর আগে বাজারের প্রস্তুতি, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। ডেরিভেটিভ একদিকে নতুন বিনিয়োগ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া এটি বাজারে অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তিনি বলেন, ২০২৮ সালের মধ্যে ডেরিভেটিভ চালুর লক্ষ্য সামনে রেখে এরই মধ্যে একটি সময়ভিত্তিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য বিদ্যমান বিধিমালার প্রয়োজনীয় সংশোধন, সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি (সিসিপি) ব্যবস্থা কার্যকর করা এবং সিসিবিএলের প্রযুক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নাফিজ আল তারেক বলেন, সিসিপি কার্যকর না হলে ডেরিভেটিভ কার্যক্রম চালু করা কঠিন হবে। একই সঙ্গে ব্রোকার, ট্রেডার ও অন্যান্য বাজার অংশীজনের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় ফিউচারস মার্কেট বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিওর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও হেজিংয়ের সুযোগ তৈরি করে। বিশেষ করে বাজারের তারল্য ও অস্থিরতার ঝুঁকি মোকাবিলায় ডেরিভেটিভ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ বাজার চালুর ক্ষেত্রে বিএসইসি, এক্সচেঞ্জ, সিসিবিএল ও অন্যান্য অংশীজনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার বলেন, এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড প্ল্যাটফর্মে নতুন আর্থিক পণ্য প্রবর্তনের উদ্যোগ দেশের পুঁজিবাজারের উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
তিনি বলেন, ডিএসই ও কমিশনের সমন্বয়ে একটি নির্দিষ্ট রোডম্যাপ ও সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে উদ্যোগটি ধাপে ধাপে এগিয়ে নেওয়া হবে। এ বিষয়ে ভবিষ্যতে আরও বিস্তারিত কর্মশালা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম আয়োজন করা হবে।
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক মো. আবুল কালাম বলেন, ফাইন্যান্সিয়াল ডেরিভেটিভস, বিশেষ করে ইনডেক্স ডেরিভেটিভস, ক্যাশ সেটেলমেন্টের মাধ্যমে তুলনামূলকভাবে সহজে চালু করা সম্ভব। তবে এর সফল বাস্তবায়নে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক, প্রযুক্তিগত, ক্লিয়ারিং, সেটেলমেন্ট ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রয়োজন।
তিনি জানান, বিদ্যমান এক্সচেঞ্জ ডেরিভেটিভস বিধিমালা যুগোপযোগী করে প্রয়োজনীয় রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক প্রণয়ন করা হবে। পাশাপাশি ডেরিভেটিভ ট্রেডিংয়ের উপযোগী প্ল্যাটফর্ম, সিসিপি, রিয়েল-টাইম মার্জিনিং, পজিশন মনিটরিং ও মার্ক-টু-মার্কেট ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।
ডিএসইর মার্কেট ডেভেলপমেন্ট ডিভিশনের জেনারেল ম্যানেজার সাইয়িদ মাহমুদ জুবায়ের বলেন, দেশের পুঁজিবাজারে আধুনিক আর্থিক পণ্য প্রবর্তন ও বাজারের গভীরতা বাড়াতে ডিএসই ২০২৮ সালের জানুয়ারিতে ডেরিভেটিভ পণ্য চালুর পরিকল্পনা করছে এবং বিএসইসি তা অনুমোদন করেছে।
তিনি বলেন, ডেরিভেটিভ চালুর জন্য প্রয়োজনীয় রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও অংশীজনদের প্রস্তুত করতে ডিএসই কৌশল ও অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করে বিএসইসির কাছে জমা দিয়েছে। কমিশনের সহযোগিতায় প্রস্তুতি কার্যক্রম এগিয়ে চলছে।
ডিএসইর পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে নিজস্ব সূচকভিত্তিক স্টক ইনডেক্স ফিউচারস চালু করা হবে। পরবর্তী ধাপে সিঙ্গেল স্টক ডেলিভারেবল ফিউচারস এবং দীর্ঘমেয়াদে অপশনস মার্কেট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
কর্মসূচিতে ডেরিভেটিভস পণ্য সম্পর্কে বাজার অংশগ্রহণকারীদের সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি এ ধরনের পণ্য চালুর সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি বিষয়ে অংশীজনদের মতামত নেওয়া হয়।
এমএএস/এমএএইচ/