জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা মো. শফিকুর রহমান বলেছেন, তীব্র বিদ্যুৎ সংকটে দেশ আজ ‘পাওয়ারলেস’ হয়ে পড়েছে। দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিদ্যুতের সংকটে তাদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। কোথাও কোথাও ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ‘তীব্র জ্বালানি ও গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে বেকারত্ব সৃষ্টি এবং দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে মারাত্মক বিপর্যয় রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ’ শীর্ষক নিজের প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
শফিকুর রহমান বলেন, লংমার্চের সময় বিভিন্ন জেলা ও বাজারে থামার সুযোগ হয়েছে। সেখানে প্রথমে বিদ্যুৎ দেখেছেন, এরপর সীতাকুণ্ডে পৌঁছানোর পর আবার বিদ্যুতের দেখা পেয়েছেন। মাঝের পুরো পথেই বিদ্যুৎ ছিল না। এটাই সারা দেশের চিত্র বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, একটি দেশ যখন বিদ্যুৎ সংকটে ভোগে, তখন দেশ ‘পাওয়ারলেস’ হয়ে যায়। আমরা চাই না আমাদের জাতি পাওয়ারলেস হোক; আমরা চাই জাতি ‘পাওয়ারফুল’ হোক।’
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সমাধানে সরকারের কাছে কোনো ‘ক্রেডিট’ না চেয়ে নিঃস্বার্থভাবে টেকনিক্যাল এক্সপার্ট টিমের সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে বিরোধী দল। পাশাপাশি, এই সংকট কাটাতে মুখে আশ্বাস না দিয়ে বাস্তবসম্মত ও সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ জাতির সামনে তুলে ধরার দাবি জানিয়েছেন বিরোধী দলীয় নেতা।’
সংসদে দেওয়া সরকারের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবের মিল না থাকার অভিযোগ করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা সরকারের পদক্ষেপে আশাবাদী। তবে কনফিউশন তৈরি হয় যখন দেখি সংসদে দেওয়া খোলামেলা আশ্বাস বাস্তবায়ন হচ্ছে না। যেমন— বলা হয়েছিল মিটার চার্জ, ডিমান্ড চার্জ আর নেওয়া হবে না, কিন্তু ঠিকই নেওয়া হচ্ছে। ভুতুড়ে বিলের সমাধানের কথাও বলা হয়েছিল, কিন্তু তা কন্টিনিউ করছে। জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে না পারলে আমাদের প্ল্যান যত সুন্দরই হোক, সব ব্যর্থ হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতে ক্যাপাসিটি চার্জের টাকা দিয়ে মূলত জনগণের টাকা ডাকাতি হয়ে যাচ্ছে। আমরা কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চাই না, কিন্তু এর সমাধান হওয়া উচিত। এই দুষ্ট চক্র থেকে জাতি বের হতে না পারলে কোনো নিস্তার নেই।’
লোডশেডিংয়ের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘মহান সংসদে দাঁড়িয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকেরা বলেছেন, কোনো সংকট নেই! এসব হাস্যকর কথা বলে জাতির সাথে তামাশা করা উচিত নয়। আমাদের কী আছে আর কী নেই, তা জাতিকে বলে দেওয়া উচিত। তাহলে জাতি মানসিকভাবে প্রস্তুত হবে।’
তোষামোদি রাজনীতির সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সাদামাটা জীবনযাপন দেখে আমরা অনুপ্রাণিত হই। কিন্তু যারা তাকে আইকন বলেন, তারা তাকে ফলো করেন না। আমরা শুধু রিভার্সটাই (উল্টো) দেখি। তেল নিয়ে দেশে সংকট চলছে, কিন্তু মুখের তেল (তোষামোদ) বন্ধ হলে দেশের তেলের সংকট আর হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা যখন ক্ষমতায় ছিলেন, সবাই বলত নেত্রী পবিত্র, আশপাশের লোকেরা খারাপ। এখন নেত্রী চলে যাওয়ায় বলা হচ্ছে, আশপাশের লোকেরা ভালো ছিল, নেত্রীর জন্যই দেশ ধ্বংস হয়েছে। এই সংস্কৃতি বদলাতে হবে। ক্ষমতা কারো জন্য চিরস্থায়ী নয়।’
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে সরকারকে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘সরকার যদি সহযোগিতা চায়, তাহলে আমরা আমাদের টেকনিক্যাল এক্সপার্ট টিমকে সরকারের সাথে যুক্ত করে দিতে পারি। একসঙ্গে দেশের জন্য, মানুষের জন্য কাজ করব। এখানে ক্রেডিট বা ডিসক্রেডিটের কোনো ব্যাপার নেই। সব ক্রেডিট সরকার নিয়ে নিক, আমাদের আপত্তি নেই। আমরা শুধু সমাধান চাই।’
এমওএস/এমএএইচ/