
গত দুই সপ্তাহে পাকিস্তান দলের ইংল্যান্ড সফর যেন এক কমেডি নাটকে রূপ নিয়েছে। আর তা দেখে যদি জেসন গিলেস্পির মুখে একটা তিক্ত হাসির ঝিলিক ফুটে উঠছে। পাকিস্তান ক্রিকেটের ভেতরে কী চরম বিশৃঙ্খলা বাসা বেঁধে থাকে, তা তো আর অস্ট্রেলীয় এই কিংবদন্তির অজানা নয়।
২০২৪ সালের এপ্রিলে পাকিস্তান টেস্ট দলের হেড কোচ হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন গিলেস্পি। কিন্তু মাত্র আট মাস পর, ডিসেম্বরেই তিনি পদত্যাগ করেন। সেই ক্ষত আজও তরতাজা। ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে গিলেস্পি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) ওপর ক্ষোভ তো উগড়ে দিয়েছেনই, দলটির প্রধান নির্বাচক আকিব জাভেদকে নিয়ে তাঁর তিক্ত অভিজ্ঞতার কথাও বলেছেন।
ইংল্যান্ড সফরে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক কাণ্ডকারখানা নিয়ে গিলেস্পির কোনো বিস্ময় নেই। হেডিংলি ও লর্ডসে টানা দুই হারের পর সাতজন খেলোয়াড় ও বেশ কয়েকজন কোচকে একঝটকায় ছেঁটে ফেলেছে পাকিস্তান। বোর্ডের সম্ভাব্য লজ্জা এড়াতে বাধ্য হয়ে বরখাস্ত হওয়া সেই খেলোয়াড়দের কয়েকজনকে আবার রাজপরিবারের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য ক্ল্যারেন্স হাউসে পাঠানো হয়, যাতে সেখানে উপস্থিতি কম না দেখায়।

পাকিস্তান ক্রিকেটের এই অদ্ভুত গল্প নতুন নয়। তবে গিলেস্পি স্বীকার করলেন, চোখ-কান খোলা রেখেই তিনি এই চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন, ‘পাকিস্তান দলের দায়িত্ব নেওয়ার আগে এই চরম অস্থিরতা আর বিশৃঙ্খলা সম্পর্কে আমাকে নিশ্চিতভাবেই সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু একটা বড় আন্তর্জাতিক টেস্ট দলের কোচ হওয়াটা আমার ক্যারিয়ারের অন্যতম হাইলাইট হতে পারত। পাকিস্তান ক্রিকেটের ঐতিহ্য সমৃদ্ধ, সেখানকার মানুষ ক্রিকেট নিয়ে বাঁচে ও শ্বাস নেয়। এমন দেশের দায়িত্ব পাওয়ার সুযোগটা আমি হাতছাড়া করতে চাইনি। আমি দারুণ সম্মানিত ও কৃতজ্ঞ বোধ করেছিলাম। জানতাম পরিবেশটা উত্তপ্ত আর বিশৃঙ্খল। তবে ক্যারিয়ারের ওই সময়ে দাঁড়িয়ে আমি নতুন চ্যালেঞ্জের খোঁজে ছিলাম। হুট করেই সুযোগটা আসে, মনে হয়েছিল তা আঁকড়ে ধরা উচিত। ভেবেছিলাম পাকিস্তান টেস্ট দলকে হয়তো আরও উন্নত করতে পারব।’
দায়িত্ব নেওয়ার আগে পিসিবির পক্ষ থেকে গিলেস্পিকে যে ভিশন দেখানো হয়েছিল, তা ছিল বেশ রোমাঞ্চকর। তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল পাকিস্তানি পেস বোলিংয়ের সেই পুরোনো ঐতিহ্য আবার ফিরিয়ে আনার। কিন্তু আকিব জাভেদ প্রধান নির্বাচক হয়ে আসার পর দৃশ্যপট একেবারেই বদলে যায় বলে অভিযোগ গিলেস্পির, ‘আমি যখন এলাম, তারা চেয়েছিল ফাস্ট বোলিং পুনরুজ্জীবিত করতে। আমাকে এই প্রতিশ্রুতিই দেওয়া হয়েছিল। তারা এমন পিচ বানাতে চেয়েছিল, যেখানে বাউন্স ও ক্যারি থাকবে, যা পেসারদের অনুপ্রাণিত করবে। কারণ, তাদের ধারণা ছিল ফাস্ট বোলিং শিল্পটা সেখানে মরে যাচ্ছে। সিদ্ধান্তটা শুনে ভেবেছিলাম, দারুণ ব্যাপার হবে তো!’

কিন্তু এরপরই ঘটে ছন্দপতন। গিলেস্পি বললেন, ‘আকিব জাভেদের আগমন সম্পূর্ণ চিত্রপট বদলে দেয়। সেই মুহূর্ত থেকেই পাকিস্তান ক্রিকেটের সঙ্গে আমার সম্পর্ক অন্য মোড় নেয়। আকিব এসে সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। আমার মনে হতো উনিই যেন সর্বেসর্বা। টেস্ট দল সামলানো, খেলোয়াড় ও স্টাফদের দেখাশোনা এবং দল নির্বাচনে ভূমিকা রাখা—এসব থেকে রাতারাতি আমাকে সরিয়ে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করে ফেলা হলো। কোনো বিষয়েই আমার কোনো মতামত নেওয়া হতো না।’
পিসিবির এই অভিজ্ঞতার পর নিজের কোচিং ক্যারিয়ার নিয়েই সংশয়ে পড়ে গিয়েছিলেন ৫১ বছর বয়সী এই অস্ট্রেলিয়ান পেসার। মন থেকে মুছে যেতে বসেছিল কোচিং করানোর উৎসাহ। ক্ষোভ প্রকাশ করে গিলেস্পি বলেন, ‘পুরো অভিজ্ঞতাটা আমাকে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছিল। কোচিংয়ের প্রতি অনীহা চলে এসেছিল। নিজের ওপর সন্দেহ জাগতে শুরু করেছিল—আমি কি আদৌ আর এই খেলাটার সঙ্গে যুক্ত থাকতে চাই? আমাকে পুরোপুরি অশ্রদ্ধা ও অপমান করা হয়েছে। আর এর পুরোটাই করেছেন আকিব জাভেদ। আমাদের প্রথম সাক্ষাতেই উনি আত্মম্ভরিতা, বাহাদুরি আর তর্জন-গর্জন নিয়ে উপস্থিত হলেন। বোঝাতে চাইলেন উনিই ক্ষমতার কেন্দ্রে। বললেন, “আমাদের এভাবে কাজ করতে হবে।” আমি চুপচাপ শুনলাম, সম্মতি দিলাম। কিন্তু এটা চলতেই থাকল। যখন দু-একটি মন্তব্যে আপত্তি জানালাম, বুঝলাম এভাবে কাজ হবে না। উনি আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন, কী করবেন। সেখানে কোনো যৌথ আলোচনার সুযোগই ছিল না।’

পিসিবি চেয়ারম্যান ও বোর্ডের পূর্ণ সমর্থন ছিল বলেই আকিব নিজেকে ‘অস্পৃশ্য’ মনে করতেন বলে মনে করেন গিলেস্পি, ‘একজন কোচ হিসেবে প্রতিদিন আপস করতে হতো। উনি সমঝোতায় বিশ্বাসী কোনো নির্বাচক ছিলেন না। অন্যের চিন্তা, মতামত বা আইডিয়া গ্রাহ্য করতেন না। মনে করতে পারেন উনি শোনেন, কিন্তু আসলে শোনেন না। ওনার নীতি ছিল একটাই—আমার কথা মেনে নাও, নয়তো পথ মাপো। চেয়ারম্যানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণেই নিজের ইচ্ছামতো সব করতে পেরেছেন। এমন পরিবেশে কোনো আত্মসম্মানবোধ থাকা মানুষ কাজ করতে চাইবে বলে আমার মনে হয় না।’
গিলেস্পি ও সাদা বলের সাবেক কোচ গ্যারি কারস্টেন পাকিস্তানে পর্যাপ্ত সময় কাটাননি বলে আকিব জাভেদ যে সমালোচনা করেছিলেন, তা-ও সপাটে উড়িয়ে দিয়েছেন তিনি, ‘আমি জানি আকিব আমাদের চুক্তি আর পাকিস্তানে সময় না দেওয়া নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন। তাকে শুধু এতটুকুই বলতে চাই, পিসিবির সঙ্গে আমাদের চুক্তিতে কী ছিল না ছিল, তা নিয়ে নাক গলানো তার কাজ নয়। এটা তার অনধিকার চর্চার আরেকটি উদাহরণ মাত্র। আমি আর গ্যারি দুজনই পাকিস্তানে ট্রেনিং ক্যাম্প করা, ঘরোয়া ক্রিকেট দেখা ও সিরিজের প্রস্তুতি নিয়ে সময় কাটাতে পুরোপুরি প্রস্তুত ছিলাম। যখন দুজন আলাদা কোচ থাকে এবং খেলায় বিরতি থাকে, তখন বিদেশি কোচরা কিছুদিন নিজের বাড়ি যাবে—এটাই তো স্বাভাবিক নিয়ম, বিশেষ করে যখন কোনো ক্রিকেট ম্যাচই নেই।’
আকিব জাভেদের প্রতি খেলোয়াড়ি জীবনের যে শ্রদ্ধা ছিল, তা যে নষ্ট হয়ে গেছে, সে কথাও আক্ষেপের সঙ্গে জানান গিলেস্পি, ‘বড় হওয়ার পথে আমি পাকিস্তানের পেসারদের দেখে মুগ্ধ হতাম। ওয়াসিম, ওয়াকার, আকিব—সবাইকে ভালোবাসতাম। একটা কথা আছে না—নিজের নায়কদের সঙ্গে বাস্তবে কখনো দেখা করতে নেই! আকিব জাভেদ আমার জন্য তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ওয়াসিম ও ওয়াকারের সঙ্গে দেখা হয়ে ভীষণ ভালো লেগেছিল। কিন্তু আকিবকে কাছ থেকে দেখে সেই শ্রদ্ধা আর বজায় থাকেনি।’
এজবাস্টন টেস্টের জন্য সরফরাজ আহমেদের পরিবর্তে সাময়িকভাবে দায়িত্ব পাওয়া বর্তমান সাদা বলের কোচ মাইক হেসনকেও সতর্কবার্তা দিয়েছেন গিলেস্পি। পরামর্শ দিয়েছেন নিজের আদর্শের সঙ্গে আপস না করার, ‘মাইককে বলব, নিজের অনুভূতিকে বিশ্বাস করো, কখনো হ্যাঁ-জি হুজুর টাইপ লোক হয়ো না। ও দারুণ মানুষ এবং অসাধারণ একজন কোচ। আশা করি নিছক বেতনের চেক পাওয়ার লোভে এই নোংরা চক্রে নিজেকে জড়িয়ে ফেলবে না।’

পিসিবির কাছে এখনো তার বড় অঙ্কের পাওনা বাকি রয়েছে বলে জানান গিলেস্পি। তবে পাওনার খাতিরেও তোষামোদকারীর খাতায় নাম লেখাননি বলে দাবি তাঁর, ‘পিসিবি এখনো আমার হাজার হাজার ডলার আটকে রেখেছে। কিন্তু আমি কখনোই চাটুকার হতে পারব না। ক্যারিয়ারে কোনো দিন নিজের নীতির সঙ্গে আপস করিনি, এখানেও করার প্রশ্ন ছিল না। চুপ থেকে, সব মেনে নিয়ে মাস শেষে বেতনটা পকেটে পুরতে পারতাম। কিন্তু জেসন গিলেস্পি সেই লোক নয়। তা ছাড়া মনের কোণে জানতামই, মাস কয়েকের মধ্যে আমাকে হয়তো বরখাস্তই করা হবে।’
দায়িত্বে থাকা আট মাসের বেশির ভাগ সময়ই তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত চলছিল বলে অভিযোগ এনে গিলেস্পি যোগ করেন, ‘আমি জানতাম পেছনে পেছনে আকিব কলকাঠি নাড়ছেন। এটা ওনার চরিত্র ও কাজ করার ধরন। পাকিস্তানের ক্রিকেট মহলের মানুষই আমাকে বলেছিল, আকিব আড়ালে আমার পেছনে ছুরি মারছেন। আমাকে নিয়ে ওনার বিষোদ্গারে আমি ক্লান্ত। এটা না থামালে আমি এবার আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবব।’
পাকিস্তান ক্রিকেট যে ধ্বংসাত্মক এক চক্রে আটকা পড়েছে, তার জন্য আকিব জাভেদকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন গিলেস্পি, ‘এই সংকটের মূল হোতা আকিব জাভেদ। উনি যতক্ষণ থাকবেন, পাকিস্তান ক্রিকেট তত দিন পেছনেই হাঁটবে। পাকিস্তান ক্রিকেটের এখন শক্ত ক্রিকেট মস্তিষ্কের নেতৃত্ব প্রয়োজন। সঠিক কোচ নিয়ে আসুন, নেতৃত্ব কারা দেবে, সেই সিদ্ধান্ত তাঁদের নিতে দিন। ডেস্কে বসে বোর্ডের কর্তারা আর চেয়ারম্যান মিলে অধিনায়ক নির্বাচন করছেন—এর চেয়ে হাস্যকর আর কিছু হতে পারে না! যোগ্য কোচ আনুন, তাঁকে পরিবেশ গুছিয়ে নেওয়ার সময় দিন। এরপর কোচকে অধিনায়ক বাছাইয়ের ক্ষমতা দিয়ে ক্রিকেটটা পুনর্গঠন করতে দিন। কারণ, বর্তমানে পাকিস্তান ক্রিকেট কোনো ভবিষ্যতের দিকে যাচ্ছে না, কেবল অতলেই তলিয়ে যাচ্ছে।’
তবে গিলেস্পির এসব অভিযোগের জবাবে আকিব জাভেদ কিংবা পিসিবির পক্ষ থেকে এখনো কোনো মন্তব্য পায়নি দ্য টেলিগ্রাফ।