আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস আজ। বর্তমান পৃথিবীতে প্রযুক্তির আধুনিকায়ন মানুষের শিক্ষিত হওয়ার সুযোগকে বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকাংশেই। ১৯৪৮ সালে ঘোষিত জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণার ২৬ নম্বর ধারায় সুস্পষ্টভাবে সাক্ষরতার কথাটি উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ৪ নম্বর লক্ষ্যমাত্রায় ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের সব পূর্ণবয়স্ক নারী-পুরুষ এবং প্রবীণ জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশের সাক্ষরতা ও হিসাবনিকাশে দক্ষতা অর্জনের কথা বলা হয়েছে।
অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা থেকে মুক্তির অন্যতম উপায় হলো সাক্ষরতা অর্জন করা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই সাক্ষরতার সংজ্ঞায় ভিন্নতা থাকলেও, ১৯৬৭ সালে ইউনেস্কো সর্বজনীন একটা সংজ্ঞা নির্ধারণ করে। তখন শুধু কেউ নাম লিখতে পারলেই তাকে সাক্ষর বলা হতো।
পরবর্তীতে প্রায় প্রতি দশকেই এই সংজ্ঞায় পরিবর্তন এসেছে এবং ১৯৯৩ সালের একটি সংজ্ঞায় ব্যক্তিকে সাক্ষর হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত পূরণ করতে হয়। শর্ত তিনটি হচ্ছে-১. ব্যক্তি নিজ ভাষায় সহজ ও ছোট বাক্য পড়তে পারবে, ২. ব্যক্তি নিজ ভাষায় সহজ ও ছোট বাক্য লিখতে পারবে ও ৩. ব্যক্তি দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ হিসাব-নিকাশ করতে পারবে।
আরও পড়ুন
আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস / দেশে নিরক্ষর প্রায় পৌনে ৪ কোটি মানুষ
স্বাধীন বাংলাদেশে মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য জাতিকে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে অবৈতনিক বাধ্যতামূলক শিক্ষার অধিকার সন্নিবেশিত হয়েছে। সাক্ষরতা ও উন্নয়ন একই সূত্রে গাঁথা। নিরক্ষরতা উন্নয়নের অন্তরায়। টেকসই সমাজ গঠনের জন্য যে জ্ঞান ও দক্ষতা প্রয়োজন, তা সাক্ষরতার মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসার মতো শিক্ষাও মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে একটি। যা মানুষের সুকোমল বৃত্তিগুলোকে বিকশিত করে প্রস্ফুটিত করে। শিক্ষা গ্রহণের প্রাথমিক পর্যায় হলো সাক্ষরতা, যা ব্যক্তির ক্ষমতায়ন, সামাজিক ও মানবীয় উন্নয়নের অন্যতম হাতিয়ারও বটে।
জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকোর উদ্যোগে ১৯৬৫ সালে ইরানের রাজধানী তেহরানে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ব সাক্ষরতা সম্মেলন। পরে ১৯৬৫ সালে ইউনেসকো প্রতি বছরের ৮ সেপ্টেম্বরকে বিশ্ব সাক্ষরতা দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয় এবং ১৯৬৬ সালে ইউনেসকো প্রথমবারের মতো বিশ্বে দিবসটি পালন করে। স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশও দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করছে। আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস এ বছরে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস-২০২৬ এর প্রতিপাদ্য বিষয় ‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’।
বিশ্বায়নের এ যুগে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাক্ষরতা এবং শিক্ষার হার বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী ১৯৭৬ সালে পৃথিবীতে সাক্ষরতার হার ছিল ৬৭ শতাংশ, যা ২০০১ সালে ৮১ শতাংশে উন্নীত হয়। সর্বশেষ ২০২০ সালে বিশ্বের সাক্ষরতার হার এসে দাঁড়িয়েছে ৮৭ শতাংশ, যেখানে বিশ্বে পুরুষের সাক্ষরতার হার ৯০ শতাংশ এবং নারী সাক্ষরতার হার ৮৩ শতাংশ। ২০২০ সাল পর্যন্ত বিশ্বে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের সাক্ষরতার হার ৯৮ শতাংশ, যার মধ্যে পুরুষদের সাক্ষরতার হার ৯৩ শতাংশ এবং নারীর সাক্ষরতার হার ৯১ শতাংশ।
সিআইএর ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুক অনুসারে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৭৫০ মিলিয়ন পূর্ণবয়স্ক নিরক্ষর মানুষ দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার সাব-সাহারান এলাকায় বাস করছে, যা বিশ্বের মোট পূর্ণবয়স্ক নিরক্ষর জনসংখ্যার তিন-চতুর্থাংশ। জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী দেশে সাক্ষরতার হার ৭৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ। অপরদিকে পরিসংখ্যানব্যুরোর ‘রিপোর্ট অন বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস অনুযায়ী দেশের স্বাক্ষরতার হার ৭৫ দশমিক ৬ শতাংশ (১৫ বছর +)। আর নিরক্ষরতার হার ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ (১৫ বছর+)।
আরও পড়ুন
বিশ্ব ডুচেন সচেতনতা দিবস / যে রোগটি শিশুর পায়ের শক্তি কেড়ে নেয়
একটি দেশের ধারাবাহিক উন্নয়নের মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করে সাক্ষরতা। উন্নয়ন ও সাক্ষরতা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে চলে। যে দেশে সাক্ষরতার হার বেশি, সে দেশ তত উন্নত। ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, লুক্সেমবার্গের মতো ইউরোপের দেশগুলো আয়তনে ছোট হলেও সাক্ষরতার হার শতভাগ হওয়ায় তাদের জনগণ উন্নয়নের সুফল ভোগ করছে। অন্যদিকে মালি, নাইজার, সোমালিয়ার মতো তুলনামূলক বৃহদায়তনের আফ্রিকান দেশগুলোতে সাক্ষরতার হার অনেক কম হওয়ায় তারা ক্ষুধা, দারিদ্র্যসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যায় জর্জরিত। অর্থনীতি ও জনসংখ্যায় বৃহৎ দেশগুলো তাদের সাক্ষরতার হার বৃদ্ধির জন্য নানামুখী কর্মসূচি গ্রহণ করছে। বৃহৎ জনসংখ্যার দেশ ভারত ও সাক্ষরতার হার শতভাগে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
শিক্ষার সুযোগবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে সাক্ষরতা দান, জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টিকরণ, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান, দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর প্রভৃতি লক্ষ্যে ২০১৪ সালে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা আইন প্রণীত হয়েছে এবং উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা বোর্ড গঠন করা হয়েছে। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো দেশে নিরক্ষরতা দূরীকরণে ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সি প্রায় ৪৫ লাখ লোককে সাক্ষরতাজ্ঞান প্রদান করছে। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষা নিশ্চিতকরণে চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিডিইপি-৪) চলমান।
নিরক্ষরতা দূরীকরণে শিশুদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার শতভাগে উন্নীতকরণ, ঝরে পড়া রোধ ও মানসম্মত শিক্ষা প্রদানে বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ, উপবৃত্তি প্রদান, মিড-ডে মিল, বিদ্যালয়সমূহের অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে। এসডিজি-৪-এর লক্ষ্য ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমতাপূর্ণ ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং সবার জন্য জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি’ অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দেশের সাক্ষরতা বৃদ্ধি ও শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারি কর্মসূচিগুলোর পাশাপাশি বেশ কিছু বেসরকারি সংস্থা, এনজিও এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন
মানুষ না খেয়ে কতদিন বাঁচে?
বর্তমান বিশ্ব প্রযুক্তিগতভাবে অনেক এগিয়ে গেছে। এ সময় শুধু অক্ষর বা বাক্য লিখতে, পড়তে পাড়া ও গণিতের জ্ঞানসম্পন্ন প্রচলিত সাক্ষরতার গুরুত্বও কমে এসেছে। ব্যবহারিক ও প্রযুক্তিগত সাক্ষরতা না থাকলে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা ও শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব। দারিদ্র্য হ্রাস, শিশুমৃত্যুর হার রোধসহ সুষম উন্নয়নের মাধ্যমে শান্তি ও সমৃদ্ধি বিকশিতকরণের ক্ষেত্রে সাক্ষরতা বড় প্রভাবকের কাজ করে। বর্তমানের এ পরিস্থিতিতে আমাদের নতুন নতুন প্রযুক্তি ও পদ্ধতি প্রয়োগ করে শিক্ষাব্যবস্থাকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে এবং প্রান্তিক মানুষের কাছে সাক্ষরতার উপযোগিতা বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে পৌঁছে দিতে হবে।
কেএসকে