হৃদরোগ চিকিৎসায় মৃত্যুঝুঁকি কমাতে ফিজিওথেরাপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও আইসিইউ সুবিধা না থাকায় মফস্বল শহর পাবনায় সীমাবদ্ধ এই সেবা। স্ট্রোক, দুর্ঘটনাজনিত আঘাত কিংবা শারীরিক প্রতিবন্ধীদের চিকিৎসায় ফিজিওথেরাপির প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়লেও সরকারি হাসপাতালেও মিলছে না পর্যাপ্ত সুবিধা। ফলে বাধ্য হয়ে সাধারণ মানুষকে যেতে হচ্ছে বেসরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রে। সিআরপিসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সেবার মান ভালো হলেও যাতায়াত ভোগান্তি ও অতিরিক্ত খরচের চাপে চিকিৎসা চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট পাবনা জেনারেল হাসপাতালে এখনো গড়ে ওঠেনি কার্যকর কোনো ফিজিওথেরাপি সেন্টার। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কেবল স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কয়েকজন কর্মী সেখানে প্রাথমিক থেরাপি সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।
আরও পড়ুন
লোডশেডিং-জ্বালানি সংকটে শেবাচিমে কমেছে অস্ত্রোপচার
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, এখানে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৮ থেকে ১০ জন রোগীকে সেবা দেওয়া সম্ভব হয়। ফ্রোজেন শোল্ডার, কোমর ও ঘাড় ব্যথা, অস্টিওআর্থ্রাইটিস এবং মুখ বাঁকা হওয়া (বেলস পালসি) রোগীদের বাইরে নতুন কোনো সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। ইনফ্রারেড রেডিয়েশন (IRR), আল্ট্রাসাউন্ড কিংবা আল্ট্রাসাউন্ড থেরাপির (UST) মতো আধুনিক যন্ত্রপাতির ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি স্পিচ কিংবা অকুপেশনাল থেরাপির জন্য নেই কোনো আলাদা দক্ষ জনবল। ফলে গুরুতর রোগীদের নির্ভর করতে হচ্ছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর।
বিশেষ করে হৃদরোগীদের ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে ফিজিওথেরাপি বড় ভূমিকা রাখে। কিন্তু পাবনায় কার্ডিয়াক আইসিইউসহ কোনো বিশেষায়িত ব্যবস্থা না থাকায় হৃদরোগে আক্রান্ত স্থানীয় রোগীরা পুরোপুরি এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
পাবনা জেনারেল হাসপাতালের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শাহরিয়ার কবির বলেন, হৃদরোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগীর শারীরিক পুনর্বাসনে ফিজিওথেরাপি অত্যন্ত কার্যকরী। কিন্তু পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও আইসিইউ সুবিধা না থাকলে আশঙ্কাজনক রোগীদের এই সেবা দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। বিশেষায়িত ইউনিট ও কার্ডিয়াক আইসিইউ চালু করা গেলে স্থানীয় পর্যায়েই অনেক রোগীর মৃত্যুঝুঁকি কমিয়ে আনা সম্ভব হতো।
এদিকে সরকারি পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় বেসরকারি সেন্টারগুলোই এখন রোগীদের একমাত্র ভরসা। জেলায় বেসরকারি কেন্দ্রগুলোতে যেকোনো ধরনের ব্যথা, ফ্রোজেন শোল্ডার, নিউরোলজিক্যাল স্ট্রোকজনিত শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, মুখ বাঁকা হওয়া (বেল্স পালসি) রোগের চিকিৎসাসহ অকুপেশনাল থেরাপি, স্পিচ ও ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপির মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা মিলছে। তবে প্রতিনিয়ত দূরদূরান্ত থেকে এসে এসব সেন্টার থেকে সেবা নেওয়া রোগীদের জন্য এক চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরও পড়ুন
টানা-হ্যাঁচড়ায় চলছে খুলনা সদর হাসপাতাল
পাবনার বেড়া উপজেলার বনগ্রামের গৃহবধূ সাদিয়া সেলিনা দোলা বছরখানেক আগে স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। স্ট্রোকের পর তার শরীরের বাম পাশ অবস হয়ে যায়। চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্য প্যারালাইজড (সিআরপি) ফিজিওথেরাপি সেন্টার থেকে নিয়মিত থেরাপি নেওয়া শুরু করেন। দীর্ঘ চিকিৎসার পর তিনি এখন অনেকটাই সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরছেন।
তবে চিকিৎসার এই যাত্রা সহজ ছিল না জানিয়ে সাদিয়া সেলিনা দোলা বলেন, থেরাপি নিয়ে আমি এখন ভালো আছি ঠিকই, কিন্তু প্রতিদিন প্রায় ১০০ কিলোমিটার পথ যাতায়াত করতে হয়েছে। একদিকে দূরপথের ধকল ও শারীরিক কষ্ট, অন্যদিকে প্রতিদিনের অতিরিক্ত যাতায়াত ভাড়া- সব মিলিয়ে বাড়তি খরচের জোগান দিতে আমাদের হিমশিম খেতে হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে এই সুবিধা থাকলে আমাদের মতো সাধারণ রোগীদের এত ভোগান্তি হতো না।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান থেরাপি নিতে আসা আরও অনেক ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবার। তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি থেরাপি সেবার জন্য প্রতিদিন দূর থেকে যাতায়াত করা কেবল শারীরিক কষ্টেরই নয়, আর্থিকভাবেও অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
আটঘরিয়ার অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক আব্দুল মান্নান জানান, তিন বছর আগে স্ট্রোকে আক্রান্তের পর পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে বাম হাত অকেজো হয়ে পড়ে। সরকারি হাসপাতালে ফিজিওথেরাপি না পেয়ে চিকিৎসা নেন সিআরপিতে। এখন অনেকটা সুস্থ হলেও বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে গিয়ে চিকিৎসা ব্যয়ের কয়েকগুণ বেশি টাকা তাকে গুণতে হয়েছে। এসব সামর্থ্য যাদের নেই, তারা থেরাপি নিতে না পেরে আরও অসুস্থই থেকে যান।
সিআরপির পাবনা সেন্টার ম্যানেজার মো. শরিফুল ইসলাম খান জানান, তাদের কেন্দ্রে দৈনিক প্রায় ৫০ থেকে ১০০ জন রোগী থেরাপি সেবা নিচ্ছেন। হৃদরোগীদের ক্ষেত্রে আইসিইউ এর প্রয়োজন হয়। যেটি তাদের এখানে নেই। তবে এর বাইরে এখানে নিউরোলজিক্যাল, মাসকিউলোস্কেলিটাল, অকুপেশনাল এবং স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিসহ প্রায় সব ধরনের থেরাপির সুব্যবস্থা রয়েছে। এক ঘণ্টার থেরাপি সেশনের জন্য ৪০০ টাকা এবং আধা ঘণ্টার জন্য ৩০০ টাকা ফি নেওয়া হয়। তবে দরিদ্র ও অসচ্ছল রোগীদের ক্ষেত্রে খরচে ছাড় দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
আরও পড়ুন
নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে ভোগান্তির অপর নাম ‘সিট খালি নাই’
তিনি আরও জানান, আবাসন ব্যবস্থা না থাকায় দূর-দূরান্তের রোগীদের কিছুটা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। দূর থেকে আসা দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের শহরে অবস্থান বা প্রতিদিন আসা-যাওয়ার পেছনে থেরাপি খরচের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি অর্থ ব্যয় হয়ে যায়। এক্ষেত্রে বেশকিছু সেশনের পর অনেকেই চিকিৎসাটা অব্যাহত রাখতে পারেন না।
মফস্বল পর্যায়ে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা সহজলভ্য ও সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনতে দ্রুত সরকারি হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক ফিজিওথেরাপি ইউনিট চালুর দাবি জানিয়েছেন পাবনার বাসিন্দারা। পাশাপাশি দূরদূরান্ত থেকে আসা দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের খরচ ও যাতায়াত ভোগান্তি কমাতে থেরাপি কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
এ ব্যাপারে পাবনার সিভিল সার্জন আবুল কালাম আজাদ বলেন, পাবনায় প্রতিবন্ধী সেবা কেন্দ্র নামে সরকারি এ ধরনের একটি চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র চালু রয়েছে। সময়ের সঙ্গে থেরাপি চিকিৎসা সেবার প্রয়োজনীয়তা ও জনপ্রিয়তা বাড়ছে। এক্ষেত্রে সরকারিভাবে রোগীদের বিনামূল্যে এই চিকিৎসা সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি ঊর্ধ্বতনদের অবগত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এফএ