বাড়ির ভেতরে সার্বক্ষণিক সিসিটিভি নজরদারি, রাতে পার্টিতে যাওয়া নিয়ে আপত্তি এবং ছোটখাটো খরচের জন্যও শ্বশুরের কাছে টাকা চাইতে হওয়াকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ জমেছিল এক ধনী পরিবারের পুত্রবধূর মনে। তদন্তকারীদের দাবি, সেই ক্ষোভ থেকেই শেষ পর্যন্ত নিজের শ্বশুরকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তিনি।
ভারতের উত্তর প্রদেশের কানপুরে গত শনিবার রাতে নিজ ফ্ল্যাটে খুন হন ৬৩ বছর বয়সী ওষুধ ব্যবসায়ী বিনীত মিনোচা। তার শরীরে ছুরির ২৬টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
তদন্তে পুলিশ সন্দেহ করছে, মিনোচার ৩৬ বছর বয়সী পুত্রবধূ শালু হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করেন এবং পরিবারের সাবেক এক কর্মীকে ভাড়া করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটান।
সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার পর পুলিশের সন্দেহ যায় পরিবারের সাবেক কর্মী ৩০ বছর বয়সী বিশালের দিকে। পরে তার সহযোগী রাজ কিশোরকেও সন্দেহ করা হয়। পুলিশের সঙ্গে এক অভিযানের পর রোববার রাতে দুজনকে গ্রেফতার করা হয়।
তদন্তে মোড় আসে যখন বিশাল অভিযোগ করেন, শালুর নির্দেশেই তিনি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। পুলিশের দাবি, হত্যার বিনিময়ে শালু তাকে ৬ লাখ রুপি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এরপর শালুকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শালু প্রথমে পুলিশকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করলেও পরে জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার পরিকল্পনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন।
ছোট খরচের জন্যও টাকা চাইতে হতো
শালু পুলিশকে জানিয়েছেন, তার শ্বশুর বাড়ির ভেতরের কার্যক্রম সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। তিনি রাতে পার্টিতে যাওয়া বা দেরিতে বাড়ি ফেরা নিয়েও আপত্তি করতেন।
শালুর অভিযোগ ছিল, ধনী পরিবারের সদস্য হয়েও তিনি ও তার স্বামীর ছোটখাটো খরচের জন্যও শ্বশুরের কাছে টাকা চাইতে বাধ্য হতেন।
তদন্তে জানা গেছে, গত ২৮ জুলাই রাতে একটি পার্টি থেকে দেরিতে বাড়ি ফেরাকে কেন্দ্র করে শালুর সঙ্গে তার শ্বশুরের তীব্র বাগ্বিতণ্ডা হয়। পুলিশ মনে করছে, ওই ঘটনার পর থেকেই দুজনের সম্পর্ক আরও খারাপ হয়ে যায়।
তদন্তকারীদের অভিযোগ, এরপর শালু পরিবারের সাবেক কর্মী বিশালের সঙ্গে যোগাযোগ করে শ্বশুরকে হত্যার প্রস্তাব দেন। এ জন্য তাকে ৬ লাখ রুপি দেওয়ার কথা বলা হয়।
তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ সেপ্টেম্বর বিশালকে ২ লাখ রুপি দেওয়ার কথা ছিল এবং বাকি ৪ লাখ রুপি ১৫ দিন পর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
পুলিশের দাবি, শালু ফ্ল্যাটের একটি নকল চাবি সংগ্রহ করে বিশালের হাতে তুলে দেন। জন্মাষ্টমীর দিন, গত ৪ সেপ্টেম্বর, কিছু জিনিস দেওয়ার কথা বলে তাকে ডেকে হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয় বলেও তদন্তকারীদের দাবি।
পরিকল্পনা ছিল শ্বাসরোধ করে হত্যার
তদন্ত অনুযায়ী, শনিবার রাতে শালু তার স্বামী সুব্রত ও সন্তানকে নিয়ে একটি পার্টিতে যান। তারা বাড়ি থেকে বের হওয়ার কয়েক মিনিট পর বিশাল ও রাজ কিশোর ফ্ল্যাটে পৌঁছান।
নিরাপত্তারক্ষী মদন তাদের থামানোর চেষ্টা করলে বিশাল ফোনে শালুর সঙ্গে তাকে কথা বলান বলে পুলিশ জানিয়েছে। শালু নিরাপত্তারক্ষীকে বলেন, তারা ওষুধ পৌঁছে দিতে এসেছে এবং তাদের ভেতরে যেতে দেওয়া উচিত।
তদন্তকারীদের দাবি, প্রথমে বালিশ দিয়ে শ্বাসরোধ করে মিনোচাকে হত্যা করার পরিকল্পনা ছিল, যাতে ঘটনাটি হৃদ্রোগে মৃত্যুর মতো মনে হয়।
হামলার পর দুজন ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান বলে অভিযোগ।
রাত প্রায় ৩টার দিকে শালু ও তার স্বামী পার্টি থেকে ফিরে শোবার ঘরে রক্তাক্ত অবস্থায় মিনোচাকে দেখতে পান। পরে তারা পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে খবর দেন।
পুলিশ ফ্ল্যাট তল্লাশি করে দেখতে পায়, কোনো মূল্যবান জিনিসপত্র খোয়া যায়নি। এ থেকেই তদন্তকারীদের প্রাথমিকভাবে ধারণা হয়, ঘটনাটি ডাকাতির জন্য নয়; বরং ব্যক্তিগত বিরোধের জের ধরে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।
বর্তমানে শালু কারাগারে রয়েছেন। অন্যদিকে, নিহতের ছেলে সুব্রত এই হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে আগে থেকে জানতেন কি না বা এতে তার কোনো ভূমিকা ছিল কি না, তা জানতে তার ফোনের কথোপকথনের তথ্যসহ অন্যান্য বিষয় খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
সূত্র: এনডিটিভি
এমএসএম