২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের কথা মাথায় রেখেই হাবিবুর রহমান সোহানকে ঘষে-মেজে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য উপযোগী করে তোলার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে তাকে দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়া সফরে পাঠানো হয়েছিল।
কিন্তু কঠিন সত্য হলো, উদ্বোধনী ব্যাটার হাবিবুর রহমান সোহান নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি। বাংলাদেশ ইমার্জিং দলের হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় ওয়ানডে টুর্নামেন্টে সে অর্থে সুযোগই পাননি। একটি মাত্র ম্যাচে মাঠে নেমে ফিরেছেন কোনো রান না করেই।
আর অস্ট্রেলিয়ায় টপ এন্ড টি-টোয়েন্টি আসরে বাংলাদেশ হাই পারফরম্যান্স ইউনিটের হয়ে ৭টি ম্যাচ খেললেও নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি সোহান। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এখনো সেভাবে সুযোগ না পেলেও ঘরোয়া ক্রিকেটে হাবিবুর রহমান সোহান মানেই ‘ঝোড়ো উইলোবাজি’। সবাই তাকে যে রূপে চেনে, সেই আক্রমণাত্মক রূপটাই দেখা যায়নি দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ায়।
দক্ষিণ আফ্রিকায় সব মিলিয়ে একটি মাত্র ম্যাচে তাকে নামানো হয়। তাতে রান পাননি দেখে আর খেলানোই হয়নি। অস্ট্রেলিয়ার টপ এন্ড টি-টোয়েন্টি আসরে ৭ ম্যাচে (৭, ৪, ০, ২৩, ২৬, ২২, ৩) মাত্র ৮৫ রান করেছেন সোহান।
আগামী বছর দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে ওয়ানডে বিশ্বকাপ। সেই দেশের মাটিতে এই গত মাসে (আগস্টে) ওয়ানডে টুর্নামেন্টে ৫ ম্যাচের মাত্র একটি ম্যাচ (ফাইনাল বৃষ্টির জন্য মাঠে গড়ায়নি। প্রবল বৃষ্টিতে টসই হয়নি। তাই একাদশ তৈরি হয়নি) খেলেছেন হাবিবুর রহমান সোহান।
আর অস্ট্রেলিয়ায় হাই পারফরম্যান্স ইউনিটের হয়ে টপ এন্ড টি-টোয়েন্টি আসরেও নিজের স্বাভাবিক খেলা সম্ভব হয়নি। এক কথায় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন হাবিবুর রহমান সোহান।
অথচ এই হাবিবুর রহমান সোহানই গত বছর নভেম্বরে কাতারের দোহায় রাইজিং স্টার্স এশিয়া কাপ ক্রিকেটে হংকংয়ের বিপক্ষে ৩৫ বলে সেঞ্চুরি করে হয়েছিলেন যে কোনো স্বীকৃত টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে দ্রুততম সেঞ্চুরিয়ান। ৮টি বাউন্ডারি ও ১০টি ছক্কার মার মেরেছিলেন তিনি।
যাকে নিয়ে এতটা প্রত্যাশার জাল তৈরি হয়েছে, সেই সোহান কেন এতটা খারাপ খেললেন? কী কারণে নিজেকে খুঁজেই পেলেন না? সে সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তার সাথে কথা বললো জাগোনিউজ।
আজ ৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে জাগো নিউজের সাথে ইমার্জিং দলের হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা সফর ও এইচপির হয়ে অস্ট্রেলিয়া ট্যুর নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন সোহান। অকপটে স্বীকার করেছেন, ‘হ্যাঁ, আমি ভালো করতে পারিনি। ভালো খেলা বহুদূরে, নিজের স্বাভাবিক খেলাটাও খেলা সম্ভব হয়নি। আমি ফেইল করেছি। ফ্লপ মেরেছি।’
কেন পারফরম্যান্স এত খারাপ হলো? একটি ম্যাচেও সোহান ‘সোহানে’র মতো আলো ছড়াতে পারলেন না, চার-ছক্কার ফুলঝুরিতে মাঠ মাতানো সম্ভব হলো না?
এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে ২৬ বছরের সোহান অনেক কথা বলেছেন। তার সারমর্ম হলো, মূলত দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ান কন্ডিশনের সাথে মিল রেখে ব্যাট করতে না পারার কারণেই তার ব্যাট কথা বলেনি।
বলার অপেক্ষা রাখে না, ক্যারিয়ারে সোহান কখনোই এশিয়ার বাইরে খেলেননি। তাই দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার উইকেট সম্পর্কে কোনোই ধারণা ছিল না। ওই কন্ডিশনে তার নিজের স্বাভাবিক যে ব্যাটিং স্টাইল, টেকনিক ও অ্যাপ্রোচ, সেটা কতটা কার্যকর- তা জানা ছিল না একদমই।
সোহান স্বীকার করেছেন, ‘ওসব উইকেটে কিভাবে খেলতে হয়, কোন বল সোজা ব্যাটে আর কোন বলকে ক্রস ব্যাটে মারতে হয়, এসব কিছুই জানতাম না আমি। অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার পর যখন আমি অল্প সময়ের মধ্যে আউট হয়ে যাচ্ছিলাম, তখন রিয়াদ ভাই (মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ)-এর কাছে গিয়ে বললাম, রিয়াদ ভাই, আমার সমস্যা হচ্ছে। আমি দেশে যেভাবে যে বলগুলোকে অনায়াসে বাতাসে ভাসিয়ে ছক্কা কিংবা বাউন্ডারি হাঁকাই, এখানে তা হচ্ছে না। কেন?’
‘রিয়াদ ভাই আমাকে বললেন, শোন সোহান, তুই দেশে বলের নিচে হিট করিস, সেটা বাতাসে ভেসে এক, দুই বা তিন ড্রপে সীমানার ওপারে চলে যায়। না হয় বাতাসে ভেসে সীমানার ওপারে গিয়ে আছড়ে পড়ে। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় তা হবে না। কারণ তুই বলের নিচে হিট করছিস। আর এখানে বল পিচ পড়ে আমাদের দেশের উইকেটের তুলনায় বাড়তি বাউন্স নেয়। কাজেই বলের নিচে আঘাত করলে হবে না। করতে হবে মাঝখানে বা পেটে। তাহলেই বল অনেক দূর যাবে। আর এখানে মাঠ অনেক বড়। কাজেই জায়গামতো হিট করতে না পারলে বল বেশি দূর যাবে না। আকাশে উঠে যাবে।’
‘এছাড়া রিয়াদ ভাই আরও একটা পরামর্শ দিয়েছেন। তাহলো, ওসব কন্ডিশনে বাতাসের বিপক্ষে গিয়ে ক্রস ব্যাটে খেললে সফল হওয়া যাবে না। বাতাসের দিকেই খেলতে হবে এবং সেটা যতটা সম্ভব সোজা ব্যাটে।’
‘এই অ্যাডজাস্টমেন্টটা আমি একটু দেরিতে করতে পেরেছি। দক্ষিণ আফ্রিকায় ওয়ানডেতে যদি ওই টিপসটা পেতাম, তাহলে আমি আগে থেকেই নিজেকে তৈরি করতে পারতাম। কিন্তু তা আর পাইনি।’
এক বা দুই নম্বর ওপেনার হিসেবে দলে জায়গা পেয়েও কেন দক্ষিণ আফ্রিকায় একটি মাত্র ৫০ ওভারের ম্যাচে খেলার সুযোগ পেয়েছেন, কেনই বা তার ব্যাটিং নিয়ে কোচরা কথা বলেননি?
এ প্রশ্নের উত্তরে নিশ্চুপ সোহান। শুধু বলেছেন, ‘রিয়াদ ভাই তো দক্ষিণ আফ্রিকায় ছিলেন না। তিনি হাই পারফরম্যান্স ইউনিটের ব্যাটিং কোচ হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় ছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রধান কোচ ছিলেন সালাউদ্দীন স্যার। তিনি ভিসা সমস্যায় দেরিতে দক্ষিণ আফ্রিকা গেছেন। তখন আসলে ব্যাটিং নিয়ে কাজ করার কেউ ছিলেন না। সালাউদ্দীন স্যার দলের সাথে দক্ষিণ আফ্রিকায় যোগ দেওয়ার আগে কোরে কোলিমোরই প্রধান কোচের দায়িত্ব পালন করেছেন।’
এটুকু বলে আর কোনো কথা বলেননি সোহান। বোঝাই গেল, কোলিমোর তার সমস্যা নিয়ে কিছুই বলেননি এবং সোহানকে যে সম্ভাবনাময় ওপেনার হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকা পাঠানো হয়েছে, তার দিকে বিশেষ মনোযোগী হওয়ার প্রয়োজনটাও তিনি অনুভব করেননি। উল্টো এক ম্যাচে শূন্য রানে আউট হতেই তাকে বাদ দিয়ে দিয়েছেন।
নিজের ব্যর্থতা অকপটে স্বীকার করার পাশাপাশি সোহান আরও একটি কথা বলেছেন। তার উপলব্ধি, এই সফরে আমি পুরোপুরি ফ্লপ। কিন্তু হতাশ নই। কেন?
‘আমি রান করতে না পারলেও বুঝতে পেরেছি কন্ডিশনটা কেমন? এই কন্ডিশন, উইকেটে কেমনে খেলতে হয়, কিভাবে বিগ হিট নিতে হয়, কোন বলকে সোজা ব্যাটে কোথা দিয়ে মারতে হবে আর কোন বলকে ক্রস ব্যাটে খেলা যাবে? এই ধারণাগুলো জন্মেছে আমার।’
এআরবি/আইএইচএস