তানজিলা দীবা
গ্রামবাংলার চিরায়ত প্রকৃতি, ক্রমবর্ধমান কলকাতার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের যাপিত জীবন, আবার কখনোবা তৎকালীন ভারতীয় প্রবাসী বাঙালি জীবন। সবকিছু মিলে এক অদ্ভুত আশ্চর্যে মোড়ানো একটি অনুভূতিপ্রবণ উপন্যাস ‘নৌকাডুবি’। ঘরানার দিক থেকে নৌকাডুবি রোমান্টিক ধাঁচের উপন্যাস হলেও এর চিরায়ত বৈশিষ্ট্যের কারণে এটিকে সামাজিক উপন্যাসও বলা হয়ে থাকে। মনের কুটিলতা, ষড়যন্ত্র, হিংসা-বিদ্বেষের জায়গায় ফুটে উঠেছে মানব-মানবীর মনের আদিম এবং সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো। উপন্যাসটির বিষয়বস্তু মূলত জটিল পারিবারিক সমস্যাগুলোকে কেন্দ্র করে।
রমেশ এবং হেমনলিনীর তীব্র প্রেম দিয়েই উপন্যাসের সূচনা করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। উপন্যাসের শুরুটা যতটা সহজ স্বাভাবিক ভাবে হয়েছে; পর্যায়ক্রমে ততটাই গভীর থেকে গভীরতর দিকে অগ্রসর হতে থাকে। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র রমেশ পেশায় আইনজীবী। কলকাতায় বন্ধু যোগেন্দ্রের বাড়িতে তার অবাধ চলাচলে সে যেন অনায়াসেই হয়ে উঠেছিল বাড়ির একজন। অন্নদা বাবু এবং তার মেয়ে হেমনলিনীর সাথে তার গড়ে ওঠে তীব্র সখ্য।
আরও পড়ুন
পদে পদে মৃত্যুফাঁদ অতিক্রম করে কি পাওয়া যাবে ‘যকের ধন’
শিক্ষিত মার্জিত লোকের সাথে শিক্ষিতদেরই মেলে। অন্নদাবাবুর আরেকজন পারিবারিক বন্ধু হলেন অক্ষয়। রমেশ এবং হেমনলিনীর এমন প্রেমের সম্পর্ক তিনি কিছুতেই মানতে পারছিলেন না। কেননা হেমনলিনীর প্রতি তিনিও ছিলেন বিশেষ দুর্বল! রমেশ এবং হেমনলিনীর এরূপ মেলামেশায় সমাজে এক বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়ার ধারণা থেকে অন্নদাবাবু ঠিক করেন, তিনি রমেশ এবং হেমনলিনীর বিবাহ দেবেন। সেখানেই ঘটে এক বিপত্তি। রমেশের বাড়ি থেকে খবর আসে। তাকে অবশ্যই সেখানে যেতে হবে অতীব জরুরি কারণে! এমন অবস্থায় রমেশ কূল না ভেবে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। সেখানেই ঘটে বিপত্তি।
অপরদিকে কমলা ও নলিনাক্ষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নৌকাডুবি’ উপন্যাসের দুটি প্রধান চরিত্র। কমলা নৌকাডুবি উপন্যাসের কেন্দ্রীয় নারী চরিত্র। ঝড়ের রাতে নৌকাডুবির পর ভুলবশত সে রমেশের আশ্রয়ে আসে এবং নিজেকে রমেশের স্ত্রী বলে মনে করে কিছুদিন সংসার করে। নলিনাক্ষ রংপুরের এক ডাক্তার এবং উদার মনের একনিষ্ঠ ব্যক্তি। উপন্যাসের শেষভাগে কমলার প্রকৃত স্বামী হিসেবে নলিনাক্ষের পরিচয় প্রকাশ পায়।
আরও পড়ুন
বই আলোচনা / বিষণ্ণ সন্ধ্যা কিংবা বিভ্রম: সংকট-সম্ভাবনা মিলেমিশে একাকার
কমলা ও নলিনাক্ষের সুখের দিনের সূচনা ঘটিয়ে লেখক তার উপন্যাসের ইতি ঘটান। রবিঠাকুরের কিছু উপন্যাসের সমালোচনা করা গেলেও এ বইয়ের সমালোচনা করার কোনো কারণ দেখি না। ঘটনাক্রমে এত এত ধাক্কা খাইতে খাইতে যখন নলিনাক্ষ কমলার সঙ্গে মিলিত হলো; তখন এক আনন্দের আন্দোলন ঘটতে থাকলো আমার মনে। এটাই বোধহয় উপন্যাস এবং ঔপন্যাসিকের সার্থকতা।
বই: নৌকাডুবিলেখক: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরধরন: উপন্যাসপ্রকাশক: দূরবীণমূল্য: ২৫০ টাকা।
এসইউ