আওয়ামী লীগের রাজনীতি এখন ক্ষমতার প্রতিযোগিতা থেকে ব্যক্তিগত শত্রুতায় নেমে এসেছে, দেশের সীমানাও সেই শত্রুতাকে থামাতে পারছে না। ইতালির ভেনিসে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনকে ঘিরে যে হামলা ও হেনস্তার খবর এসেছে, সেটিকে অন্য আট-দশটি বিচ্ছিন্ন প্রবাসী ঘটনার মতো দেখার সুযোগ নেই। বাঁধনের নিজের বক্তব্য, প্রকাশ করা ভিডিও এবং ঘটনাটিকে ঘিরে প্রকাশিত তথ্য এতটাই গুরুতর যে বিষয়টি উপেক্ষা করা যায় না।
অভিযোগ অনুযায়ী, ভেনিসের মেস্ত্রে এলাকায় বাঁধনকে একদল বাংলাদেশি হেনস্তা করেন। তাঁর দাবি, তাঁদের কয়েকজন নিজেদের আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন। জুলাই আন্দোলনে তাঁর অবস্থান নিয়ে তাঁকে কটূক্তি করা হয় এবং ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলার জন্য চাপ দেওয়া হয়। ঘটনাস্থলে তাঁর পরিবারের সদস্যরাও ছিলেন। বাঁধন পরে ইতালির পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছেন।
প্রশ্ন হচ্ছে, একজন শিল্পীর রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে একমত না হওয়ার অধিকার কি অন্য কারও নেই? অবশ্যই আছে। কিন্তু সেই মতবিরোধের জবাব কি বিদেশের মাটিতে হেনস্তা, ভয় দেখানো কিংবা জোর করে স্লোগান আদায়ের মাধ্যমে দিতে হবে?
অভিযোগটি তদন্ত করে সত্যতা নির্ধারণ করা ইতালির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। তবে ঘটনাটি কেবল কয়েকজন ব্যক্তির উচ্ছৃঙ্খল আচরণের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকছে না। প্রশ্ন হচ্ছে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কি ক্ষমতার বাইরে গিয়েও একই রকম রয়ে গেছে?
গত দুই বছরে দেশের বাইরে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের আচরণ নিয়ে একাধিকবার একই চিত্রই দেখা গেছে।
গত বছরের আগস্টে নিউইয়র্কে তৎকালীন তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমকে ঘিরে বাংলাদেশ কনস্যুলেটের সামনে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের বিক্ষোভ, ডিম নিক্ষেপ এবং কনস্যুলেটের দরজার কাচ ভাঙার অভিযোগ ওঠে। পরে ওই ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের কথাও প্রকাশিত প্রতিবেদনে আসে।
এর কয়েক সপ্তাহ পর নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সফরসঙ্গী দলের সদস্যদের লক্ষ্য করে ডিম নিক্ষেপ ও কটূক্তির ঘটনা ঘটে। এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেনের দিকে ডিম ছোড়া হয় এবং তাসনিম জারাকে অশালীন মন্তব্যের শিকার হতে হয়। ওই ঘটনায় একজন যুবলীগ নেতাকে গ্রেপ্তারের কথাও প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসেছে।
বাঁধন জুলাই আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন। তিনি সেটিকে নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ হিসেবে প্রকাশ্যেই ধারণ করেন। প্রকাশিত ভিডিওতে তিনি বলেছেন, তাঁকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ বলা হয়েছে এবং তিনি সেই পরিচয় স্বীকার করেছেন। জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে নাগরিক প্রতিবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি। সেই স্মৃতি অস্বীকার করার কিছু নেই।
লন্ডনেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। ২০২৫ সালে মাহফুজ আলমের উপস্থিতিকে ঘিরে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের বিক্ষোভের সময় বাংলাদেশ হাইকমিশনের গাড়িতে ডিম ছোড়া এবং চলাচলে বাধা দেওয়ার অভিযোগের কথা প্রকাশিত হয়েছে। চলতি বছরের জুনে হোয়াইটচ্যাপেলে এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর একটি অনুষ্ঠানের বাইরেও ডিম ছোড়ার ঘটনা নিয়ে অভিযোগ উঠেছে।
বিষয়টি রাজনৈতিক তত্ত্বের সঙ্গে যুক্ত করা যাক। রাজনৈতিক বিজ্ঞানী রওনক জাহান মনে করেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাজনৈতিক দলই নাগরিককে রাজনীতিতে যুক্ত করে, রাজনৈতিক মূল্যবোধ তৈরি করে এবং ক্ষমতার প্রতিযোগিতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। তাঁর ভাষায়, কোনো দল যদি নিজের ভেতরেই গণতান্ত্রিক আচরণ না করে, তাহলে সেই দল সমাজে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করবে, এমন প্রত্যাশার ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়। তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্যতম সংকট হিসেবে ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা, শারীরিক শক্তির প্রদর্শন এবং ‘উইনার টেকস অল’ ধরনের মানসিকতার কথা বলেছেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে গবেষণাতেও একই ধরনের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। রাজনৈতিক বিজ্ঞানী এম. মনিরুজ্জামান দেখিয়েছেন, রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা, প্রতিহিংসা, শত্রুতাপূর্ণ মানসিকতা এবং ক্ষমতার ঔদ্ধত্য রাজনৈতিক সহিংসতার গভীর সাংস্কৃতিক ভিত্তি তৈরি করে। এই ধরনের সংঘাত আবার রাজনৈতিক সহযোগিতাকে দুর্বল করে এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অচলাবস্থার জন্ম দেয়।
গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে একটি প্রতিপক্ষ থাকে। সমালোচক থাকে। শিল্পী, শিক্ষক, সাংবাদিক, নাগরিক সমাজের মানুষ এবং সাধারণ ভোটার নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করেন। কোনো রাজনৈতিক দলই প্রত্যেক নাগরিকের আনুগত্য দাবি করতে পারে না। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই যে মানুষ একই রাষ্ট্রের নাগরিক হয়েও ভিন্ন রাজনৈতিক মত পোষণ করতে পারে।
তাই আওয়ামী লীগের এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নির্বাচনে ফেরা নয়। তার আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক আচরণের বিশ্বাসযোগ্য পরিবর্তন দেখানো। যে দল আবার জনগণের কাছে রাজনৈতিক বৈধতা চাইবে, তাকে প্রমাণ করতে হবে যে ভিন্নমতাবলম্বী একজন শিল্পীকে বিদেশের রাস্তায় দাঁড় করিয়ে স্লোগান বলানো তার রাজনীতির ভাষা নয়।
এটা উগ্রতা হতে পারে, রাজনীতি হতে পারে না।
বিদেশের মাটিতে এমন ঘটনা বাংলাদেশের ভাবমূর্তির সঙ্গেও যুক্ত। প্রবাসীরা বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধি নন। কিন্তু তাঁদের আচরণ বিদেশি সমাজে বাংলাদেশ সম্পর্কে ধারণা তৈরিতে ভূমিকা রাখে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘিরে বাংলাদেশিরা যদি বিমানবন্দর, দূতাবাস, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা জনসমাগমে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন, তাহলে সেটি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সবচেয়ে বড় কথা, ভয় দেখিয়ে রাজনৈতিক স্মৃতি মুছে ফেলা সম্ভব নয়।
বাঁধন জুলাই আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন। তিনি সেটিকে নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ হিসেবে প্রকাশ্যেই ধারণ করেন। প্রকাশিত ভিডিওতে তিনি বলেছেন, তাঁকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ বলা হয়েছে এবং তিনি সেই পরিচয় স্বীকার করেছেন। জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে নাগরিক প্রতিবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি। সেই স্মৃতি অস্বীকার করার কিছু নেই। কিন্তু একজন নাগরিককে নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাস অস্বীকার করতে বাধ্য করা, স্লোগান দিতে চাপ দেওয়া কিংবা শারীরিকভাবে হেনস্তা করা গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভাষা হতে পারে না।
ইতালির মাটিতে সংঘটিত এই ঘটনাটি আসলে আওয়ামী লীগের জন্য একটি রাজনৈতিক আয়না। ক্ষমতা চলে যেতে পারে, পদ চলে যেতে পারে, অফিস বন্ধ হতে পারে। কিন্তু পুরোনো রাজনৈতিক চরিত্র সঙ্গে করেই তারা রাজনীতি করছে।
লেখক : এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
এইচআর/জেআইএম