ফরিদপুরে প্রতিটি প্রসাধনী পণ্যের দাম ব্যাপক হারে বেড়েছে। কোনো কোনো পণ্যের দাম চার থেকে পাঁচগুণ পর্যন্ত বেড়েছে। চড়া দামে দিশাহারা ক্রেতারা। ব্যবসায়ীদের বেচাকেনাতেও ভাটা পড়েছে।
অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় কম প্রসাধনী সামগ্রী কিনছেন। দোকানদাররা বলছেন, তাদের দোকান ভাড়া, কর্মচারীর বেতন, বিদ্যুৎ খরচই উঠছে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মানুষের সৌন্দর্য সচেতনতা বাড়ার কারণে বাড়ছে প্রসাধনী সামগ্রীর ব্যবহার। এতে প্রসাধনী পণ্যের চাহিদাও বাড়ছে। তবে মূল্যবৃদ্ধির কারণে আগের তুলনায় ব্যবহার কমেছে। গত এক বছরে প্রায় প্রতিটি প্রসাধনী পণ্যের দাম দেড় থেকে অন্তত পাঁচগুণ বেশি বেড়েছে বলে অভিযোগ ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) ফরিদপুর নিউ মার্কেটসহ বিভিন্ন উপজেলা সদরে খোঁজ নিয়ে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বিভিন্ন দোকান ঘুরে দেখা গেছে, দোকানে আগের মতো ক্রেতাদের আনাগোনা নেই। অনেকটা অলস সময় পার করছেন দোকানিরা। তারা বলছেন, ছয় মাস আগেও ৩৪০ মিলি পেনটেইন শ্যাম্পুর দাম ছিল ৪৫০ টাকা, এখন দাম ৭০০ টাকা। ওআইসি মিল্ক হোয়াইটেনিং ফেসওয়াশ ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৩৮০ টাকা হয়েছে। বডি স্প্রে ফগ ১২০ এমএলের দাম ৩৩০ টাকা থেকে বেড়ে ৪৩৫ টাকা, কিউট বডি স্প্রে ২৭৫ থেকে ৫০০ টাকায় পৌঁছেছে।
প্যারাসুট নারিকেল তেল (২০০ এমএল) ১৭০ থেকে দাম বেড়ে ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বেবি লোশন (২০০ এমএল) ২৮০ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৬০ টাকা। বেবিওয়াশ ৩২৫ থেকে ৩৫০ টাকা, নেভিয়া ক্রিম (৫০ গ্রাম) ২০০ থেকে বেড়ে ২৫০ টাকা, গ্লো অ্যান্ড লাভলী (৪৭ গ্রাম) ১৫৫ থেকে ১৭০ টাকা এবং লিপস্টিক বক্স (২৪ পিস) এক হাজার টাকা থেকে বেড়ে এক হাজার ২৫০ টাকায় পৌঁছেছে। ৯০ টাকার ডাব সাবান দাম বেড়ে হয়েছে ২০০ টাকা।
আগে ৩৩০ এমএল যে শ্যাম্পুর দাম ছিল ৩৮০ টাকা, তা এখন ৪৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ২০০ এমএল রিভাইভ লোশনের দাম ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২৭০ দাম হয়েছে। পন্ডস ক্রিম ২২০ থেকে ২৮০, গৌরি (পাকিস্তানি) ৪০০ টাকা থেকে দাম বেড়ে ৫৫০ টাকা এবং নাইট ক্রিম ফ্রেশ অ্যান্ড হোয়াইট (২০ মিলি) ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
আরও পড়ুন
ক্রেতার ক্ষোভ / ‘একটার দাম কমলে অন্য পাঁচটা জিনিসের দাম বেড়ে যায়’
সালথা উপজেলা সদরের বাসিন্দা গণি মিয়া দুই মেয়ের বাবা। তিনি পেশায় একজন কৃষক। প্রসাধনী সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘মেয়েদের জন্য আগে প্যারাসুট নারিকেল তেল, সাবান, শ্যাম্পু, ফেসওয়াশ কিনতে হতো। এখন এসব পণ্যের যে পরিমাণ দাম বেড়েছে, তারা বায়না করলেও এত দাম দিয়ে কেনা সম্ভব না। বলতে গেলে নিম্নআয়ের মানুষেরা এগুলো ব্যবহার করা প্রায় ছেড়েই দিয়েছে।’
ফরিদপুর শহরের ব্যাংক কর্মকর্তা হারুন অর রশীদের ভাষ্য, ‘প্রতিটি প্রসাধনী সামগ্রীর দাম দ্বিগুণ থেকে চারগুণ পর্যন্ত বেড়েছে। যে টাকা বেতন পাই তা দিয়ে সংসার চালাতে কষ্ট হয়। সংসার না চললে বিলাসিতা করবো কীভাবে? তারপরও স্ত্রী ও মেয়ের জন্য কিনতে হয়। তবে আগের তুলনায় কেনার ফর্দ ছোট করে ফেলেছি। ব্যবহারের মাত্রাও কমে গেছে। একেবারে যা না কিনলে হয় না, তাই কিনতে হয়। এ বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত বাজার মনিটরিং করা দরকার বলে আমি মনে করি।’
আরও পড়ুন
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি / দোকানে মেলে না ৫ টাকার পেনসিল, আকার কমেছে রাবারের
গৃহবধূ সাথী আক্তার বলেন, ‘সব ধরনের প্রসাধনীর দাম ব্যাপক হারে বেড়েছে। নারিকেল তেল, সাবান, শ্যাম্পু ছাড়া আর তেমন কিছু কেনা হয় না। ব্যবহারের পরিমাণও কমিয়ে দিয়েছি।’
ফরিদপুর নিউমার্কেটের মুসলিম ট্রেডার্সের মালিক ফরহাদ শেখ। প্রায় ৩৫ বছর ধরে প্রসাধনী সামগ্রীর ব্যবসা করছেন। তিনিও জানান, প্রতিটি প্রসাধনী সামগ্রীর দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে।
আরও পড়ুন
মূল্যস্ফীতির প্রভাবে হাঁসফাঁস শিক্ষাজীবন, খাবারে পুষ্টির ঘাটতি
ফরহাদ শেখ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আগের তুলনায় অনেক বেশি দামে পণ্য কিনতে হয়। সামান্য লাভে বিক্রি করি। তারপরও ক্রেতা নেই। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া অনেকেই অনেক ধরনের প্রসাধনী ব্যবহার ও কেনা ছেড়ে দিয়েছে। এখন লাভ তো দূরে থাক, দোকান-কর্মচারীর খরচই ওঠে না।’
তিনি বলেন, ‘ছয়মাস আগেও প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা বিক্রি হতো। এখন গড়ে ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকার মতো বিক্রি হয়।’
আরও পড়ুন
কসমেটিকস শিল্পে সেরা কোম্পানির স্বীকৃতি রিমার্ক-হারল্যানের
আরেক ব্যবসায়ী টুম্পা ট্রেডার্সের মালিক বায়েজিদ মোল্লা জাগো নিউজকে বলেন, নিউমার্কেটে শতাধিক প্রসাধনী সামগ্রীর দোকান রয়েছে। সব ব্যবসায়ী বর্তমানে লোকসানে আছেন।
তিনি বলেন, ‘এখানে নকল পণ্য চালানো যায় না। তাছাড়া অনলাইনে কম দামে ভেজাল পণ্য বিক্রি করার কারণে আমাদের মতো পুরোনো ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হচ্ছে। কিছু ক্রেতা বুঝে না বুঝে কম দাম পেয়ে অনলাইনে অর্ডার করে কিনছেন। প্রকৃতপক্ষে তারা প্রতারিত হচ্ছেন।’
আরও পড়ুন
কসমেটিকোরেক্সিয়া: অল্প বয়সে নিখুঁত ত্বক পাওয়ার নেশায় বুঁদ কিশোরীরা
বায়েজিদ মোল্লার ভাষ্য, ‘প্রতিটি পণ্যের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে। ছয় মাস আগের ৫০০ টাকার পণ্য এখন ৭০০ থেকে ৮৫০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। দাম বাড়ায় ক্রেতা কমে গেছে। আমরা নিজেরাও সমস্যায় পড়েছি। ক্রেতা কম, বিক্রি নেই। এভাবে চললে হয়তো এ ব্যবসা ছেড়ে বিকল্প পথ দেখতে হবে।’
এ বিষয়ে ফরিদপুর জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, প্রসাধনী পণ্যের দাম বেড়েছে, এটা ঠিক। বিদেশি পণ্যের ক্ষেত্রে আমদানিকারকের তথ্য ও দাম যাচাই করা হচ্ছে। দেশি পণ্যের ক্ষেত্রে অবশ্যই এমআরপি উল্লেখ করে বাজারজাত করতে হবে।
তিনি বলেন, খুচরা বিক্রেতা যদি দাম বেশি রাখেন এবং ভোক্তা প্রতারিত হন, অভিযোগ পেলে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেবো। তাছাড়া আমাদের পক্ষ থেকে নিয়মিত বাজার মনিটরিং করা হচ্ছে।
এসআর/জেআইএম