ব্যালন ডি’অর নিয়ে সরাসরি কোনো প্রচারণায় যেতে চান না লামিনে ইয়ামাল। নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হলেও বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কারটি জিততে কারও কাছে ভোট চাওয়া কিংবা নিজের পক্ষে প্রচারণা চালানোর প্রয়োজন দেখছেন না বার্সেলোনার এই স্প্যানিশ তারকা।
বরং কিলিয়ান এমবাপের মতো নিজের নাম সামনে এনে ব্যালন ডি’অরের দাবিদার হিসেবে প্রচারণা চালানোর পথে হাঁটতে নারাজ ইয়ামাল। তার স্পষ্ট কথা, ‘এটা আপনাদের কাজ, আমি কোনো কিছুর জন্য অনুরোধ করব না।’
ফেইনুর্দের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগের ম্যাচ সামনে রেখে সংবাদ সম্মেলনে নিজের বর্তমান সময়, বার্সেলোনার লক্ষ্য, অধিনায়কত্ব এবং ব্যালন ডি’অর নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন ইয়ামাল। সেখানে নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সুখের সময় কাটানোর কথাও জানিয়েছেন ১৯ বছর বয়সী এই ফুটবলার।
‘জীবনে কখনো এত সুখী ছিলাম না’
নিজের বর্তমান সময় নিয়ে ইয়ামালের কণ্ঠে আত্মবিশ্বাসের পাশাপাশি তৃপ্তিও ঝরে পড়েছে। ছুটি এবং মাঠের পারফরম্যান্স- সব মিলিয়ে জীবন নিয়ে দারুণ খুশি তিনি। ‘আমি খুবই খুশি। সত্যি বলতে, জীবনে কখনো এত সুখী ছিলাম না। জানি না কেন আমাকে নিয়ে এত কথা হয়েছে। আমি জীবনের সেরা ছুটি কাটিয়েছি। এখনকার চেয়ে সুখী আমি কখনোই ছিলাম না।’
মাঠের বাইরে সমালোচনা বা নানা ধরনের আলোচনাকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতে চান না ইয়ামাল। তার মনোযোগ এখন বার্সেলোনার হয়ে দলীয় সাফল্যের দিকে।
চ্যাম্পিয়নস লিগই সবচেয়ে বড় লক্ষ্য
বার্সেলোনার হয়ে এবারের মৌসুমে ইয়ামালের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়। তার মতে, ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই প্রতিযোগিতার চেয়ে বড় অনুপ্রেরণা আর কিছু হতে পারে না।
‘এটাই বড় লক্ষ্য। এর চেয়ে বড় কোনো অনুপ্রেরণা নেই। আমরা সবাই খুবই অনুপ্রাণিত। এটা আমাদের মাথায় আছে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ সবচেয়ে বিশেষ টুর্নামেন্ট।’
বার্সেলোনার দলে নতুন খেলোয়াড়দের আগমনও দলকে আরও শক্তিশালী করেছে বলে মনে করেন তিনি। অ্যান্থোনি গর্ডন, রদ্রি, কারিম আদেয়েমি, হোয়াওদের মতো খেলোয়াড়দের আগমনে এবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের স্বপ্ন আরও বড় হয়েছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ইয়ামাল।
ব্যালন ডি’অরের জন্য প্রচারণা চালাব না
ব্যালন ডি’অর নিয়ে ইয়ামালের বক্তব্যই সংবাদ সম্মেলনের সবচেয়ে আলোচিত অংশ। পুরস্কারটি জেতার সুযোগ আছে বলে স্বীকার করেছেন তিনি। তবে সেটি তার হাতে নেই বলেও মনে করেন স্প্যানিশ তারকা।
‘এটা আমার ওপর নির্ভর করে না, এটা আপনাদের ওপর নির্ভর করে। বার্সেলোনা ও জাতীয় দলের হয়ে আমার কাজ অবিশ্বাস্য ছিল। আমার সুযোগ আছে। আমি দারুণ একটি বছর কাটিয়েছি। তবে দেখা যাক কী হয়।’
এরপরই আসে কিলিয়ান এমবাপের প্রসঙ্গ। রিয়াল মাদ্রিদের ফরাসি তারকা সম্প্রতি নিজের ব্যালন ডি’অর সম্ভাবনার কথা বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। কিন্তু ইয়ামাল সেই পথে হাঁটতে চান না।
‘আমার মনে হয় না আমাকে প্রচারণা চালাতে হবে। সবাই যা ইচ্ছা ভাবতে পারে। আমি যা করেছি, তা নিয়ে গর্বিত এবং এর চেয়ে বেশি কিছু চাইতে পারি না। এটা আপনাদের কাজ। আমি কোনো কিছুর জন্য অনুরোধ করব না।’ অর্থাৎ, নিজের পারফরম্যান্সকে ভোটারদের সামনে তুলে ধরার কাজটা তিনি তাদের ওপরই ছেড়ে দিতে চান।
দেম্বেলের তালিকায় না থাকলেও চিন্তিত নন
বর্তমান ব্যালন ডি’অরজয়ী উসমান দেম্বেলে সম্ভাব্য সেরা তিন প্রার্থীর নাম বলতে গিয়ে ইয়ামালকে রাখেননি। বিষয়টি নিয়ে ইয়ামালকে প্রশ্ন করা হলে তাতেও খুব একটা বিচলিত হননি তিনি।
আরও পড়ুন
দেম্বেলের চোখে ব্যালন ডি’অরের দাবিদার হ্যারি কেইন!
‘সে কিলিয়ানের বন্ধু..., এতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি যে বছর কাটিয়েছি, তাতে আমি খুব খুশি। যখন তাদের দুজনের বিপক্ষে খেলেছি, আমি জিতেছি। উসমানের সঙ্গে আমার খুব ভালো সম্পর্ক। সবাই আমার বছরটা দেখেছে। যদি সে না দেখে থাকে...।’
দেম্বেলের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভালো থাকার কথাও জানিয়েছেন ইয়ামাল। তবে ব্যালন ডি’অর নিয়ে কারও মতামতকে নিজের আত্মবিশ্বাসের ওপর প্রভাব ফেলতে দিতে চান না তিনি।
চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদ নিয়েও কথা বলেছেন ইয়ামাল। রিয়াল মাদ্রিদ গত দুই বছর বড় কোনো শিরোপা জিততে পারেনি- এমন প্রসঙ্গে কাতালান এই তারকার জবাব বেশ ঠান্ডা। ‘তারা যদি দুই বছর শিরোপা না জিতে থাকে, সেটা তাদের সমস্যা। আমরা খুশি। রেফারিং নিয়েও আমরা খুশি। এটা তাদের বিষয়। আমি তাদের খুশিই দেখছি।’
চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবকে নিয়ে এমন মন্তব্য যে দুই দলের পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে, সেটি বলাই যায়।
মাত্র ১৯ বছর বয়সে বার্সেলোনার অধিনায়ক হওয়ার সুযোগ পাওয়া ইয়ামালের জন্য গর্বের বিষয়। সতীর্থদের কাছ থেকে পাওয়া এই আস্থার জন্য কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেছেন তিনি।
‘১৯ বছর বয়সে বার্সার অধিনায়ক হওয়া গর্বের বিষয়। সতীর্থরা আমাকে বেছে নিয়েছে, এজন্য আমি কৃতজ্ঞ। আমার বয়স ১৯, কিন্তু আমি এই দায়িত্বের মর্যাদা রাখতে চাই। আমি খুশি। এটি আমাকে দায়িত্বশীল করে তোলে। দলের জন্য আমি নিজের সেরাটা দেব।’
অধিনায়ক হিসেবে অবশ্য নিজেকে একা দেখছেন না ইয়ামাল। রাফিনহা, এরিক গার্সিয়া ও পেদ্রির মতো সতীর্থদের কাছ থেকেও নেতৃত্বের শিক্ষা নিচ্ছেন তিনি। ‘রাফা অবিশ্বাস্য একজন অধিনায়ক। এরিক, পেদ্রিও তাই। আমি তাদের কাছ থেকে শিখি- কিভাবে সবসময় দলের জন্য সবচেয়ে ভালোটা চাওয়া যায়।’
বেঞ্চে বসতেও ভয় নেই
বার্সেলোনার মতো দলে জায়গা ধরে রাখার প্রতিযোগিতা সবসময়ই তীব্র। তবে নিজের জায়গা হারানোর ভয় নেই ইয়ামালের। ‘এটা আমাকে ভয় দেখায় না। দলে দুর্দান্ত খেলোয়াড় আছে। আমি বেঞ্চে বসার জন্যও প্রস্তুত। এতে আমার ভয় নেই।’
নিজেকে এখনো তরুণ হিসেবেই দেখেন ইয়ামাল। দ্রুত বেড়ে ওঠার কারণে নিজের পরিবর্তনটা সবসময় বুঝতে পারেন না বলেও জানিয়েছেন। ‘আপনি যখন বড় হতে থাকেন, তখন সেটা বুঝতে পারেন না। আমি একজন বাচ্চা এবং বেড়ে উঠছি। কিন্তু আমি দুই মিটার লম্বা নই। কুবার্সি বা বের্নালের চেয়েও আমি খাটো। আমি সবার মতোই।’
ফারমিন লোপেজ ও দানি ওলমোর সঙ্গেও নিজের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেছেন ইয়ামাল। দুজনকেই অসাধারণ খেলোয়াড় হিসেবে উল্লেখ করে তাদের সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যে খেলতে পারেন বলে জানিয়েছেন তিনি। ‘তারা দুর্দান্ত খেলোয়াড়। আমি তাদের সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি এবং আমাদের খুব ভালো সম্পর্ক। তবে তারা দুজনই আলাদা ধরনের খেলোয়াড়।’
দলে তার চেয়ে বেশি অভিজ্ঞ ও বেশি অর্জন করা অনেক খেলোয়াড় আছেন। তাই ক্লাবের ড্রেসিংরুমে সিনিয়রদের কাছ থেকে শেখার চেষ্টা করেন ইয়ামাল। ‘আমি এমন একটি ড্রেসিংরুমে আছি, যেখানে এমন মানুষ আছে যারা আমার চেয়ে অনেক বেশি কিছু অর্জন করেছে। এরপর পরিবারের সঙ্গে থাকি। তারা আমাকে সবসময় মাটিতে পা রাখতে সাহায্য করে।’
জাভির জন্য শুভকামনা, তবে স্পেনের বিপক্ষে নয়
বার্সেলোনার সাবেক কোচ জাভি হার্নান্দেজ নেদারল্যান্ডস জাতীয় দলের কোচ হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। নানা সময় হয়তো নেদারল্যান্ডসের মুখোমুখি হতে হবে স্পেনকে। যে কারণে জাভির প্রতি নিজের ভালোবাসার কথা জানিয়েছেন ইয়ামাল। ‘তিনি একজন দুর্দান্ত কোচ। তার প্রতি আমার অনেক ভালোবাসা আছে। আমি আশা করি তার সবকিছু ভালো হবে- স্পেনের বিপক্ষে ছাড়া।’
সব মিলিয়ে ইয়ামালের কথায় পরিষ্কার, ব্যালন ডি’অর নিয়ে তার আত্মবিশ্বাস যথেষ্ট, কিন্তু নিজের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে পুরস্কার আদায় করতে চান না তিনি। তার কাছে ব্যক্তিগত স্বীকৃতির চেয়ে এখন বড় হয়ে উঠেছে বার্সেলোনার হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের স্বপ্ন। আর ব্যালন ডি’অর? সেটির সিদ্ধান্ত তিনি ছেড়ে দিয়েছেন ভোটারদের ওপর।
আইএইচএস/