জাতিসংঘের প্রকাশ করা বিশ্বের নতুন মানচিত্রে অরুণাচল প্রদেশ ও আকসাই চিনকে ভারত ও চীনের দাবির মধ্যবর্তী ‘পৃথক অঞ্চল’ (Separate Region) হিসেবে দেখানো হয়েছে। ভারত দীর্ঘদিন ধরে অরুণাচল প্রদেশকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করে। একইভাবে, আকসাই চিনকে লাদাখের অংশ বলে দাবি করে নয়াদিল্লি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, জাতিসংঘের নতুন মানচিত্রে অরুণাচল প্রদেশের সঙ্গে নাগাল্যান্ডের সীমান্ত দেখানো হয়নি। বরং অরুণাচলকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন এটি আসামের উত্তরে এবং চীনের সীমান্তসংলগ্ন একটি পৃথক অঞ্চল।
আরও পড়ুন
ভারতের ক্ষোভ / অরুণাচলের পর কাশ্মীরের শাক্সগামকেও ‘নিজেদের ভূখণ্ড’ দাবি চীনের
আকসাই চিনকেও পৃথক একটি অঞ্চল হিসেবে দেখানো হয়েছে। এর পশ্চিমে ভারতের সঙ্গে এবং পূর্বে চীনের সঙ্গে সীমান্ত দেখানো হয়েছে।
তবে মানচিত্রে এই পরিবর্তনের কারণ সম্পর্কে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
কবে প্রকাশ করা হয় নতুন মানচিত্র
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলার সময় গত ১ জুলাই প্রথম নতুন মানচিত্রটি প্রকাশ করা হয়। এরপর মানচিত্রের উপস্থাপন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
আরও পড়ুন
অরুণাচলের ‘বিতর্কিত’ এলাকায় রাস্তা বাড়াচ্ছে চীন, বলছে স্যাটেলাইট চিত্র
বিশেষ করে ভারত ও চীনের মধ্যে বিতর্কিত সীমান্ত এলাকাগুলো কীভাবে দেখানো হয়েছে, তা নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে মানচিত্রটি।
জম্মু ও কাশ্মীরের ক্ষেত্রেও মানচিত্রে একটি ডটেড বা বিন্দু রেখা ব্যবহার করা হয়েছে। এই রেখাটি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নিয়ন্ত্রণরেখা বা লাইন অব কন্ট্রোল (এলওসি) বোঝাচ্ছে।
মানচিত্রের পাদটীকায় জাতিসংঘ বলেছে, বিন্দু রেখাটি জম্মু ও কাশ্মীরে ভারত ও পাকিস্তানের সম্মত আনুমানিক নিয়ন্ত্রণরেখা নির্দেশ করে।
আরও পড়ুন
পেন্টাগনের প্রতিবেদন / অরুণাচলকে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করতে চায় চীন
সেখানে আরও বলা হয়েছে, জম্মু ও কাশ্মীরের চূড়ান্ত মর্যাদা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে এখনো সমঝোতা হয়নি।
‘করেক্ট দ্য ম্যাপ’ প্রস্তাব কী
গত সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ আফ্রিকান ইউনিয়নের সমর্থিত ‘করেক্ট দ্য ম্যাপ’ শীর্ষক একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছে।
প্রস্তাবটির লক্ষ্য বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মানচিত্রে আরও সঠিক ও ন্যায্য কার্টোগ্রাফিক উপস্থাপন নিশ্চিত করা। বিশেষ করে আফ্রিকার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের মানচিত্রগত বৈষম্য দূর করার বিষয়টি এতে গুরুত্ব পেয়েছে।
আরও পড়ুন
অরুণাচলকে ভারতের অংশ বলায় চীনে ভারতীয় ইউটিউবার আটক, দেয়নি খাবারও
প্রস্তাবটি বাধ্যতামূলক নয়। তবে ধারণা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মানচিত্রে এর ভিত্তিতে পরিবর্তন আসতে পারে।
প্রস্তাবে সমর্থন দিয়েছিল ভারত
টোগোর নেতৃত্বে আফ্রিকান দেশগুলোর পক্ষ থেকে প্রস্তাবটি জাতিসংঘে উত্থাপন করা হয়। ভারতও প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেয়।
তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তখন স্পষ্ট করে জানিয়েছিল, তাদের সমর্থন ছিল সমান-আয়তনভিত্তিক মানচিত্র উপস্থাপনের নীতির প্রতি।
কোনো নির্দিষ্ট মানচিত্র, প্রক্ষেপণ বা জাতীয় সীমান্তের নির্দিষ্ট উপস্থাপনাকে সমর্থন করার জন্য ভারত ভোট দেয়নি বলে জানায় নয়াদিল্লি।
আরও পড়ুন
অরুণাচলের কাছে ৩৬টি বিমান বাংকার বানিয়েছে চীন, চরম উদ্বেগে ভারত
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও বলেছিল, জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখসহ ভারতের সার্বভৌম ভূখণ্ডকে ভারতের সরকারি মানচিত্র অনুযায়ী দেখাতে হবে।
ভারতের অবস্থান অনুযায়ী, দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিয়ে কোনো ভুল বা বিভ্রান্তিকর উপস্থাপন গ্রহণযোগ্য নয়।
অরুণাচল ও আকসাই চিন নিয়ে ভারত-চীনের অবস্থান
অরুণাচল প্রদেশকে ভারত দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করে আসছে। অঞ্চলটিকে নিজেদের বলে মনে করে চীনও।
অন্যদিকে, আকসাই চিন বর্তমানে চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে ভারত একে লাদাখের অংশ হিসেবে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে।
আরও পড়ুন
অরুণাচলকে আবারও নিজেদের ভূখণ্ড দাবি করলো চীন
নয়াদিল্লির অবস্থান হলো, জম্মু ও কাশ্মীর এবং আকসাই চিনসহ লাদাখের পুরো অঞ্চল অতীতে ভারতের অংশ ছিল, তাই সবসময় ভারতের অংশই থাকবে। অরুণাচল প্রদেশের ক্ষেত্রেও ভারতের অবস্থান একই।
এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেয়নি ভারত
জাতিসংঘের নতুন মানচিত্রে অরুণাচল প্রদেশ ও আকসাই চিনের উপস্থাপন নিয়ে এখন পর্যন্ত নয়াদিল্লির আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
তবে বিষয়টি ভারত-চীন সীমান্ত বিরোধের প্রেক্ষাপটে নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।
দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত নিয়ে বিরোধ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মানচিত্রে বিতর্কিত অঞ্চলগুলোর উপস্থাপন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: জাতিসংঘ, এনডিটিভিকেএএ/