
‘নীরবতা আপনাকে রক্ষা করবে না।’
—অদ্রি লর্ড
যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপনার নীরব ভূমিকা অন্তত দুইভাবে পাঠ করা যেতে পারে। হয় আপনাকে নীরব থাকতে বাধ্য করা হয়েছে, নতুবা আপনি নিজ থেকে নীরব থেকেছেন। সাধারণত আমরা ব্যক্তিস্বার্থ অথবা গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষা করতে নির্দিষ্ট বিষয়ে নীরব থাকি। কোন বিষয়ে আপনি সরব হবেন এবং কোন বিষয়ে নীরব থাকবেন; তা কোনো নিরপেক্ষ অবস্থান নয়। বরং এটি আপনার মানবিক-রাজনৈতিক-সামাজিক অবস্থানকে খোলাসা করে। ইতালিতে অভিনয়শিল্পী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর ঘটে যাওয়া ন্যক্কারজনক হামলার বিষয়ে যাঁরা এখনো পর্যন্ত নীরব থেকেছেন, মূলত তাঁদের উদ্দেশে এই লেখা। বলাবাহুল্য, নীরবতা আপনাকে রক্ষা করবে না।
২
মর্যাদাপূর্ণ ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হওয়া বাংলাদেশি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ (২০২৬)। রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত এ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুবাদে বাঁধন ও তাঁর সহশিল্পীরা বর্তমানে ইতালি ভ্রমণ করছেন। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটের বরাতে জানা গেল চলচ্চিত্রটির সারসংক্ষেপ।
‘In Dhaka, Zaineen prepares for her wedding following beauty rituals and family expectations. However, her body reacts in many unexpected ways. Amongst home remedies, social pressures, and haunting visions, the path to marriage becomes a physical and psychological struggle against what is imposed on her.’
অর্থাৎ প্রথাগত সৌন্দর্য ও সামাজিক প্রত্যাশার চাপে বিয়ের প্রস্তুতিরত এক নারীর শরীরের প্রতিরোধের যাত্রা ঘিরে চলচ্চিত্রটি আবর্তিত হয়েছে। একজন নারীকে সমাজ যেসব ক্যাটাগরি দ্বারা সংজ্ঞায়িত করতে চায়, চলচ্চিত্রটি নিশ্চয় সেসবের একটি সিনেম্যাটিক ক্রিটিক হাজির করেছে। কাকতালীয় হলেও সত্য, বাঁধনের ওপর হামলাটি যেন চলচ্চিত্রটিকে পর্দার দুনিয়া থেকে বাস্তবের দুনিয়ায় নিয়ে এল এবং আমাদের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিল—নারী শরীরের ওপর ঐতিহাসিকভাবে যে নিপীড়ন চলছে সে বিষয়ে নীরবতা কার স্বার্থে? উত্তরটি সহজ, পুঁজিবাদী ব্যাটাতান্ত্রিক ক্ষমতাকাঠামোর স্বার্থে। যাঁরা বাঁধনের ওপর হামলার ব্যাপারে এখনো নীরব, তাঁরা মূলত পুঁজিবাদী ব্যাটাতান্ত্রিক ক্ষমতার পূজারি, সে আপনি যে পরিচয়েরই হোন না কেন! কেননা আপনার নীরবতাই এই নিপীড়নের পক্ষে সম্মতি উৎপাদন করছে।

৩
সামাজিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত কয়েকটি ভিডিও মারফত জানা যায়, ‘জয় বাংলা’ বলতে ‘জুলাই জঙ্গি’ বাঁধনকে বাধ্য করছিল ‘বঙ্গবন্ধুর সৈনিক’ শিরোনামে কয়েকজন বাংলাদেশি প্রবাসী পুরুষ। তখন বাঁধনের সঙ্গে তার পরিবার ছিল, শিশু কোলে। ভয়ে শিশুটি কান্না করছিল, তবু বঙ্গবন্ধুর সৈনিকেরা তাদের নিপীড়ন থামাতে নারাজ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট গভীর রাতে নিষ্পাপ শিশু শেখ রাসেলকে হত্যা আজও আমাদের ব্যথিত করে; অথচ বঙ্গবন্ধুর সৈনিকেরা আজ শিশুটির সামনে যা করে দেখাল, তা ঐতিহাসিকভাবে শেখ মুজিবুর রহমান পরিবারকে আরও কয়েক দফা খুন করল যেন! মনে রাখবেন, ইতিহাস শিশু নিপীড়নকারীদের কখনো শাস্তি থেকে রেহাই দেয়নি। এ কথা দুই হাজার বছর পূর্বের গ্রিস নগরী থেকে বর্তমানের ফিলিস্তিনের গাজা নগরী পর্যন্ত সত্য। অতএব অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরবতা আপনাকে রক্ষা করবে না।
৪
শ্রেণিসমাজের শোষণের অন্যতম হাতিয়ার ভয়ের সংস্কৃতি ও স্বার্থের লোভ দিয়ে মুখ বন্ধ করে রাখা, যাতে প্রজন্মান্তরে আপনাকে এবং আপনার চিন্তাকে বন্দী করে রাখা যায়, অন্ধ করে রাখা যায়, বধির করে রাখা যায়; তদুপরি আপনি বোবা থাকেন। কিন্তু নিপীড়িত মানুষ মুখ বন্ধ রাখে না, তাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতেই হয়। তাই তো ইতিহাসের পাতা খুললে আমরা দেখতে পাই, আধুনিক ও ঔপনিবেশিক ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ প্রথম সেন্সরশিপ আইন চালু করতে বাধ্য হয়েছিল দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীল দর্পণ’ (১৮৬০) নাটকের মঞ্চায়ন রুখতে, নিপীড়িত মানুষের প্রতিবাদের ভাষার টুঁটি চেপে ধরতে। অধুনা বাংলাদেশ এখনো সেই কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক আইনের পরাকাষ্ঠা পার হতে পারেনি। তবু কালে কালে অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরবতা ভেঙে সেই আন্তিগোনে থেকে হালের বাঁধনেরা কথা বলে চলেছেন। নিপীড়িত মানুষ কথা বলবেই, কেননা মানুষ ভাষার প্রাণী এবং ‘নীরবতাই ফ্যাসিস্টের ভাষা’। *(উদ্ধৃতিটি হাসান রোবায়েতের কবিতার অংশ)
৫
কেন আজমেরী হক বাঁধন এই হামলার শিকার হলেন? প্রথমত, বাঁধন জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে স্বৈরাচারী হাসিনা রেজিমের সব অন্যায় ও হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত, বাঁধন জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে সংঘটিত মব জাস্টিস শিরোনামে ভিন্নমতের ওপর হামলা, মানবাধিকার হরণ, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। তৃতীয়ত, বাঁধন মহান মুক্তিযুদ্ধের মূলনীতি—সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের বৈষম্যবিরোধিতা ও ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা বিলোপের মধ্য দিয়ে একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে বিশ্বাস করেন। শেষতক এবং সবচেয়ে জরুরিভাবে, বাঁধন ব্যাটাতান্ত্রিক সমাজের তৈরি করে দেওয়া ‘নারী’ পরিচয়কে লাথি মেরে ভেঙে দিতে চান এবং চিৎকার করে বলতে চান, ‘নীরবতা আপনাকে রক্ষা করবে না’।
জাহিন ফারুক আমিন
লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা