সমুদ্রের মাঝখানে ছোট্ট একটি দ্বীপ। সেখানে হাঁটতে গেলে মানুষের চেয়ে বেশি চোখে পড়ে খরগোশ। রাস্তা, ঘাসের মাঠ, জঙ্গলের ধারে—প্রায় সর্বত্রই দেখা মেলে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ানো অসংখ্য তুলতুলে প্রাণীর। পর্যটকের পায়ের কাছে এসে খাবার চায়, আবার কেউ কেউ ক্যামেরার সামনে বসেও পড়ে।
জাপানের ওকুনোশিমা (Okunoshima) দ্বীপকে তাই বলা হয় ‘র্যাবিট আইল্যান্ড’ বা খরগোশের দ্বীপ। কিন্তু প্রশ্ন হলো—একটি ছোট দ্বীপে এত খরগোশ এলো কোথা থেকে? আর কীভাবেই বা তারা মানুষের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেল?
জাপানের সেই ‘র্যাবিট আইল্যান্ড’
ওকুনোশিমা জাপানের হিরোশিমা প্রিফেকচারের সেতো অভ্যন্তরীণ সাগরে অবস্থিত একটি ছোট দ্বীপ। দ্বীপটির পরিধি মাত্র প্রায় ৪ কিলোমিটার। অথচ এখানে একসময় প্রায় এক হাজার বন্যভাবে ঘুরে বেড়ানো খরগোশের উপস্থিতির কথা জাপানের পর্যটন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে—এগুলো জাপানের স্থানীয় বন্য খরগোশ নয়। জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দ্বীপের খরগোশগুলো ইউরোপীয় গৃহপালিত খরগোশ থেকে আসা এবং বর্তমানে তারা আধা-বন্য অবস্থায় বসবাস করছে।
তাহলে এত খরগোশ এলো কীভাবে?
এখানেই গল্পের সবচেয়ে মজার অংশ।
জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ওকুনোশিমা ভিজিটর সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পালন করা আটটি ইউরোপীয় খরগোশকে দ্বীপে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল—এমন ঘটনাকেই বর্তমান খরগোশের বংশবিস্তারের সূচনা হিসেবে ধরা হয়। তবে খরগোশগুলো কীভাবে দ্বীপে প্রথম এসেছিল, তা নিয়ে একাধিক গল্প প্রচলিত রয়েছে। জাপানের সরকারি পর্যটন সংস্থাও উল্লেখ করেছে, কেউ ১৯৭১ সালের আটটি খরগোশের গল্পকে সত্য বলে মনে করেন, আবার কেউ মনে করেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরীক্ষামূলক কাজে ব্যবহৃত খরগোশ সেখানে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।
অর্থাৎ, উৎপত্তি নিয়ে কিছু বিতর্ক থাকলেও আটটি খরগোশের গল্পটিই সরকারি পরিবেশ দপ্তরের সবচেয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা।
কেন এত দ্রুত বংশবিস্তার?
খরগোশের দ্রুত বংশবৃদ্ধির ক্ষমতা তো আছেই। তার সঙ্গে ওকুনোশিমার পরিবেশও তাদের জন্য বেশ সুবিধাজনক হয়ে ওঠে। দ্বীপে বিড়াল ও কুকুরের মতো কিছু সম্ভাব্য শিকারি প্রাণী প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। ফলে খরগোশগুলো তুলনামূলক নিরাপদ পরিবেশে বংশবিস্তার করতে পেরেছে। জাপানের সরকারি পর্যটন সংস্থাও জানিয়েছে, দ্বীপে প্রাকৃতিক শিকারির অভাব খরগোশের টিকে থাকার অন্যতম কারণ।
এরপর শুরু হয় আরেক অধ্যায়—পর্যটন।
পর্যটকরাই কি খরগোশের সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছেন? অনেকাংশে, হ্যাঁ—সাম্প্রতিক গবেষণায় এমন একটি চিত্রই উঠে এসেছে।
২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যটকদের দেওয়া খাবার ও পর্যটনের সঙ্গে খরগোশের সংখ্যা ওঠানামার সম্পর্ক রয়েছে। গবেষকদের হিসাবে, দ্বীপের স্বাভাবিক উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্য বছরে আনুমানিক ১৭৫ থেকে ২৮৭টি খরগোশ টিকিয়ে রাখার মতো ছিল। কিন্তু পর্যটকদের নিয়ে আসা খাবারের পরিমাণ ২০১৩ সালে প্রায় ৮.৩ টন এবং ২০১৭ সালে পর্যটনের সর্বোচ্চ সময়ে প্রায় ২৭ টন পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
অর্থাৎ, দ্বীপে খরগোশের ‘স্বর্গ’ শুধু প্রকৃতির তৈরি নয়—এর পেছনে মানুষের দেওয়া খাবারেরও বড় ভূমিকা রয়েছে।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, পর্যটন কমে গেলে খরগোশের সংখ্যাও কমেছিল। কোভিড-১৯ মহামারির সময় পর্যটক কমে যাওয়ার সঙ্গে খরগোশের সংখ্যাও হ্রাস পাওয়ার বিষয়টি এই নির্ভরতার ইঙ্গিত দেয়।
কিন্তু ‘খরগোশের স্বর্গে’ তৈরি হয়েছে নতুন সমস্যা
দূর থেকে দেখলে ওকুনোশিমা যেন খরগোশের স্বর্গ। কিন্তু বাস্তবতা এতটা সরল নয়।
অতিরিক্ত খাওয়ানোর কারণে খরগোশের সংখ্যা দ্বীপের প্রাকৃতিক ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি হয়ে যেতে পারে। এতে উদ্ভিদের ওপর চাপ পড়ে এবং পুরো পরিবেশব্যবস্থায় পরিবর্তন আসে। ২০২৬ সালের গবেষণায় এমনকি বুনো শূকরের সঙ্গে খরগোশের নতুন ধরনের সম্পর্কও পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। গবেষকরা পর্যটকদের দেওয়া খাবার খেতে বুনো শূকরকে দেখেছেন এবং কিছু ক্ষেত্রে খরগোশ শিকার করার ঘটনাও নথিবদ্ধ করেছেন। তবে গবেষকরা স্পষ্ট করেছেন, পর্যটকদের খাওয়ানোই বুনো শূকরের এমন আচরণের সরাসরি কারণ—এটি এখনও প্রমাণিত নয়। জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ও পর্যটকদের সতর্ক করেছে—খরগোশকে ধাওয়া করা, কোলে তোলা বা দ্বীপে নতুন খরগোশ ছেড়ে দেওয়া যাবে না।
খাবার দিলেই কি খরগোশ খুশি?
এখানেও রয়েছে একটি ভুল ধারণা।
ওকুনোশিমায় খরগোশকে খাবার দেওয়া পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ হলেও যেকোনো খাবার দেওয়া বিপজ্জনক। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রুটি, মিষ্টি, মানুষের স্ন্যাকস কিংবা পেঁয়াজজাতীয় সবজি খরগোশকে দেওয়া উচিত নয়। খাবার পড়ে থাকলে তা বুনো শূকর ও অন্য প্রাণীকেও আকৃষ্ট করতে পারে। আর খরগোশকে কোলে তোলা বা ধাওয়া করাও নিষেধ। কারণ আধা-বন্য এই প্রাণীগুলো সহজেই আহত হতে পারে।
খরগোশের দ্বীপের রয়েছে ভয়ংকর অতীতও
আজকের হাসিমুখের খরগোশের ছবি দেখে ওকুনোশিমার অতীত কল্পনা করা কঠিন।
১৯২৯ সালে এখানে জাপানি সামরিক বাহিনী একটি গোপন রাসায়নিক অস্ত্র কারখানা স্থাপন করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সেখানে বিষাক্ত গ্যাস উৎপাদন করা হতো। গোপনীয়তা এতটাই কঠোর ছিল যে দ্বীপটিকে কিছু মানচিত্র থেকেও বাদ দেওয়া হয়েছিল। আজও দ্বীপে সেই সময়ের পরিত্যক্ত স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। ১৯৮৮ সালে সেখানে Poison Gas Museum চালু করা হয়, যাতে দ্বীপটির অন্ধকার ইতিহাস মানুষ জানতে পারে।
অর্থাৎ, যে দ্বীপ আজ হাজারো খরগোশের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত, সেটিই একসময় ছিল যুদ্ধের ভয়ংকর এক গোপন কেন্দ্র।
তাহলে সত্যিই কি মানুষের চেয়ে খরগোশ বেশি?
শিরোনামের ভাষায় বলা যায়—হ্যাঁ, দ্বীপটিতে মানুষের তুলনায় খরগোশের সংখ্যা অনেক বেশি। কিন্তু নির্দিষ্ট অনুপাত বলা ঠিক হবে না। কারণ খরগোশের সঠিক বর্তমান সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন এবং সময়ের সঙ্গে তা পরিবর্তিত হয়। সরকারি জাপানি সূত্রে বিভিন্ন সময়ে প্রায় ৭০০ থেকে ১,০০০ বা তার বেশি খরগোশের কথা পাওয়া যায়। আর মজার বিষয় হলো, এই খরগোশগুলো আসলে মানুষের তৈরি পরিবেশেরই এক অদ্ভুত ফল।
কয়েকটি খরগোশকে দ্বীপে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল—প্রকৃতি তাদের বাঁচিয়ে রাখল, শিকারির অভাব তাদের বাড়তে দিল, আর পর্যটকদের খাবার তাদের সংখ্যা আরও বাড়িয়ে দিল।
তাই ওকুনোশিমার গল্প শুধু ‘খরগোশের দ্বীপের’ গল্প নয়। এটি দেখায়, মানুষের একটি ছোট সিদ্ধান্ত কীভাবে কয়েক দশকের মধ্যে একটি পুরো দ্বীপের পরিবেশ ও পরিচয় বদলে দিতে পারে।
সূত্র: জাপান ট্রাভেল, tandfonline