বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের নবনির্বাচিত সভাপতি ড. খলিলুর রহমান।
সেই সঙ্গে তার অগ্রাধিকারে থাকবে বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা জোরদার, টেকসই উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, মানবাধিকার সুরক্ষা ও প্রযুক্তিগত রূপান্তরের সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে দেওয়া ভাষণে তিনি এ ঘোষণা দেন।
দায়িত্ব গ্রহণের ভাষণে খলিলুর রহমান বলেন, বর্তমান বিশ্বে জাতিসংঘের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। সংঘাত অব্যাহত রয়েছে, উন্নয়ন অর্জন দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। এ অবস্থায় জাতিসংঘকে শুধু রক্ষা নয়, বরং আরও কার্যকর ও মানুষের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে।
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— ‘রিস্টোরিং ট্রাস্ট, ম্যানেজিং ট্রান্সফরমেশন: এ ইউনাইটেড নেশনস দ্যাট ডেলিভার্স ফর অল’। অর্থাৎ, আস্থা পুনরুদ্ধার ও পরিবর্তন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হবে।
নতুন সভাপতি বলেন, জাতিসংঘের প্রতি আস্থা শুধু বক্তব্য বা প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে ফিরবে না; প্রতিদিনের কাজ, সিদ্ধান্ত, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং মানুষের জন্য দৃশ্যমান ফলাফলের মাধ্যমে সেই আস্থা অর্জন করতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য তিন বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব
সাধারণ পরিষদের নতুন সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বিষয় উঠে এসেছে— রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু ঝুঁকি এবং উন্নয়ন অর্থায়ন।
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অবস্থানকে তিনি জাতিসংঘের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক মঞ্চে তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশের স্বার্থও তার জলবায়ু অভিযোজন, ক্ষয়ক্ষতি তহবিল ও জলবায়ু অর্থায়নসংক্রান্ত অগ্রাধিকারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
অন্যদিকে স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণ, উন্নয়ন অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামো সংস্কারের ওপর তার জোর বাংলাদেশের মতো অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নিলেন খলিলুর রহমান
ছয় অগ্রাধিকার
দায়িত্বের প্রথম বছরে সাধারণ পরিষদের কাজকে ছয়টি অগ্রাধিকারের ওপর কেন্দ্রীভূত করার ঘোষণা দিয়েছেন খলিলুর রহমান।
প্রথম অগ্রাধিকার হিসেবে তিনি শান্তি ও নিরাপত্তা জোরদারের কথা বলেন। জাতিসংঘ সনদের ‘পরবর্তী প্রজন্মকে যুদ্ধের অভিশাপ থেকে রক্ষা করার’ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সংঘাত প্রতিরোধ, রাজনৈতিক সমাধান, শান্তিরক্ষা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি।
এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবদানের কথাও বিশেষভাবে তুলে ধরেন। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দুই লাখের বেশি বাংলাদেশি দায়িত্ব পালন করেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে মানুষের জন্য শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
দ্বিতীয় অগ্রাধিকার টেকসই উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা এবং কোনো দেশকে পিছিয়ে না রাখা। ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের জন্য হাতে আর মাত্র চার বছর রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসডিজির মাত্র ৩৬ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা সঠিক পথে রয়েছে বা মাঝারি অগ্রগতি অর্জন করছে। ফলে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
২০২৭ সালের এসডিজি সম্মেলন সামনে রেখে উন্নয়ন অর্থায়নের ঘাটতি কমানো, ঋণের টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামো সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি। বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশ, স্থলবেষ্টিত উন্নয়নশীল দেশ এবং ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দেন।
তৃতীয় অগ্রাধিকার জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, অভিযোজন ও সহনশীলতা বৃদ্ধি। আসন্ন কপ-৩১ সম্মেলনের আগে জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় তহবিল কার্যকর করা এবং জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য আরও বেশি জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়ার কথা জানান তিনি।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিকে ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র ও নিচু উপকূলীয় দেশগুলোর জন্য অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে উল্লেখ করে এ বিষয়ে জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক আয়োজনের কথাও জানান তিনি। সমুদ্র, জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু সংকটকে পরস্পর সম্পর্কিত হিসেবে বিবেচনা করে বৈজ্ঞানিকভিত্তিক পদক্ষেপের ওপরও গুরুত্ব দেন।
চতুর্থ অগ্রাধিকার মানবাধিকার ও মানবিক সহায়তা জোরদার করা। শরণার্থী, অভিবাসী ও বাস্তুচ্যুত মানুষের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় জাতিসংঘকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশ মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানবাধিকারের প্রকৃত মূল্যায়ন শুধু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেওয়া প্রতিশ্রুতিতে নয়, বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে তাদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে হতে হবে।
সবার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির সুফল
পঞ্চম অগ্রাধিকার হিসেবে প্রযুক্তিগত রূপান্তরকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর কথা বলেন খলিলুর রহমান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)সহ নতুন প্রযুক্তি দ্রুত মানুষের কাজ, শিক্ষা, যোগাযোগ ও সমস্যা সমাধানের ধরন পরিবর্তন করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দায়িত্বশীলভাবে এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে উন্নয়ন ত্বরান্বিত, সরকারি সেবা উন্নত এবং জ্ঞান ও সুযোগের প্রবেশাধিকার বাড়ানো সম্ভব।
তবে ডিজিটাল বৈষম্য দূর করা, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং জনআস্থা বজায় রাখার জন্য কার্যকর প্রযুক্তি শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও জোর দেন তিনি।
ষষ্ঠ এবং সব অগ্রাধিকারের ভিত্তি হিসেবে তিনি বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধারের কথা বলেন। জাতিসংঘকে ভবিষ্যতের উপযোগী এবং সবার জন্য কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে সংস্কার প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করার ঘোষণা দেন তিনি।
আরও পড়ুন
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী / সময়ের সঙ্গে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা বেড়েছে
জাতিসংঘ সংস্কারে বিশেষ নজর
জাতিসংঘের আর্থিক স্থিতিশীলতা জোরদারের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেন সাধারণ পরিষদের নতুন সভাপতি। সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে নির্ধারিত চাঁদা পূর্ণাঙ্গভাবে, সময়মতো এবং কোনো শর্ত ছাড়া পরিশোধ করার আহ্বান জানান তিনি।
একই সঙ্গে জাতিসংঘের ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তার ভাষায়, জাতিসংঘের অর্থ শুধু ধনী দেশগুলোর নয়; বিশ্বের দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কঠোর পরিশ্রম ও ত্যাগের সঙ্গেও এসব সম্পদের সম্পর্ক রয়েছে। তাই প্রতিটি অর্থ যথাযথ, স্বচ্ছ ও কার্যকরভাবে ব্যবহার করার দায়িত্ব রয়েছে।
তিনি তরুণদের জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় আরও বেশি সম্পৃক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেন। তার মতে, বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী তরুণ হলেও নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকার নিশ্চিত করা
সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়কে ভৌগোলিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ, লিঙ্গসমতাভিত্তিক এবং ভাষাগতভাবে বৈচিত্র্যময় করার প্রতিশ্রুতির কথাও তুলে ধরেন খলিলুর রহমান।
ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিশেষ কণ্ঠস্বর ও সহায়তা নিশ্চিত করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এসব দেশের উদ্বেগকে জাতিসংঘের মূল আলোচনার বাইরে রাখা যাবে না। বরং বৈশ্বিক এজেন্ডার কেন্দ্রে তাদের উদ্বেগ ও অভিজ্ঞতাকে স্থান দিতে হবে।
তিনি জানান, তার কার্যালয়ের মন্ত্রিসদস্যদের ৬০ শতাংশ নারী। এর মাধ্যমে জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে নারীর নেতৃত্ব ও দক্ষতার গুরুত্ব তুলে ধরেন তিনি।
ভাষণের শেষদিকে তিনি বলেন, জাতিসংঘের প্রতি আস্থা শুধু চাওয়া যায় না, তা অর্জন করতে হয়—সিদ্ধান্ত, প্রতিশ্রুতি পালন এবং জনগণের জন্য বাস্তব ফলাফল নিশ্চিত করার মাধ্যমে।
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনকে এমন একটি অধিবেশনে পরিণত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এই অধিবেশন যেন সংস্থাটির জন্য পরিবর্তনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে এবং নতুন আত্মবিশ্বাস, উদ্দেশ্য ও দৃঢ়তার সঙ্গে জাতিসংঘকে তার নবম দশকে এগিয়ে নিতে পারে।
আইএইচও/একিউএফ