বিচারাধীন বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে অপ্রয়োজনীয় ও অহেতুক মন্তব্য করায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামকে সতর্ক করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) মাওলানা আবুল কালাম আযাদের আপিল-সংক্রান্ত শুনানির সময় তাকে সতর্ক করা হয় বলে আদালতকক্ষে উপস্থিত একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
একই সঙ্গে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আবুল কালাম আযাদের আপিল-সংক্রান্ত আবেদন শুনানি আরও কয়েক সপ্তাহের জন্য মুলতবি করেছেন আপিল বিভাগ।
মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি মো. রেজাউল হকের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদালতে আযাদের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ব্যারিস্টার এহসান এ সিদ্দিক। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
আদালতে উপস্থিত একাধিক সূত্র জানায়, বিচারাধীন মামলা নিয়ে গণমাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় ও অহেতুক মন্তব্যের প্রসঙ্গ উঠলে শুনানির সময় চিফ প্রসিকিউটরকে সতর্ক করেন আপিল বিভাগের বিচারপতিরা।
এর আগে সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আযাদের আপিল নিয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে আপিল না করলে পরে আর আপিল করার সুযোগ থাকে না। এই বিধান সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য; আসামি শেখ হাসিনা হোন কিংবা অন্য কেউ।
চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, কিছুদিন আগে আপিল বিভাগে মাওলানা আযাদের মামলা নিয়ে শুনানি হয়েছিল। সেখানে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে তিনি আপিলের সময়সীমা-সংক্রান্ত আইনটি তুলে ধরেছিলেন। তার দাবি, আযাদের আপিল এখনো আপিল বিভাগ গ্রহণ করেনি। ফলে এ বিষয়ে আপিল বিভাগের সামনে কোনো বিচারাধীন কার্যক্রমও নেই।
তার মতে, আযাদের আইনজীবীরাও বিষয়টি আইনগতভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছেন এবং এ কারণেই তারা এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ আর নেননি।
তবে বর্তমানে আপিল বিভাগে আযাদের করা আবেদন বিচারাধীন। ওই আবেদনে বিলম্ব মার্জনা এবং আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ডের সাজা স্থগিত রাখার আবেদন করা হয়েছে।
আরও পড়ুন
আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলায় আপিলের রায় যে কোনো দিন
পলাতক অবস্থায় মৃত্যুদণ্ড
মাওলানা আযাদকে ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল তাকে ফরিদপুর অঞ্চলে ১৯৭১ সালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেন।
রায় ঘোষণার আগেই তিনি আত্মগোপনে চলে যান। পরে তার অনুপস্থিতিতেই বিচার শেষ করে রায় ঘোষণা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এটি ছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায়।
টেলিভিশনে ইসলামবিষয়ক অনুষ্ঠান উপস্থাপনার মাধ্যমে মাওলানা আযাদ দেশব্যাপী পরিচিতি লাভ করেন।
দীর্ঘ সময় পলাতক থাকার পর গত বছর তিনি প্রকাশ্যে আসেন। পরে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করলে আত্মসমর্পণ করে আপিল দায়েরের শর্তে তার মৃত্যুদণ্ড এক বছরের জন্য স্থগিত করা হয়। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত বছরের ২২ অক্টোবর প্রজ্ঞাপন জারি করে।
আত্মসমর্পণের পর আপিলের উদ্যোগ
এর ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ আত্মসমর্পণ করেন মাওলানা আযাদ। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল তার আত্মসমর্পণ গ্রহণ করেন এবং আপিল দায়েরের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র সরবরাহ করতে রেজিস্ট্রার কার্যালয়কে নির্দেশ দেন।
রাষ্ট্রপতির আদেশে সাজা স্থগিত থাকায় সেদিন তাকে কারাগারে পাঠানো হয়নি।
শুনানি শেষে তার আইনজীবী মশিউল আলম সাংবাদিকদের বলেন, রাষ্ট্রপতির আদেশ অনুযায়ী আত্মসমর্পণ করে আপিল করার শর্ত পূরণ করেছেন মাওলানা আযাদ। আদালত তার আত্মসমর্পণ গ্রহণ করেছেন এবং আপিলের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
মঙ্গলবারের শুনানি শেষে আইনজীবীরা জানান, সুপ্রিম কোর্টের অবকাশ শেষে ২৪ অক্টোবর থেকে পরবর্তী চার সপ্তাহ পর্যন্ত মামলাটির শুনানি মুলতবি রাখা হয়েছে।
এফএইচ/একিউএফ