দেশে সার নিয়ে হট্টগোল, গুদামে আক্রমণ, লুট থামছে না। সারের প্রাপ্যতা ও দাম নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই কৃষকের। এমন পরিস্থিতিতেও সরকার বলছে, দেশে সারের সংকট নেই, পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। এছাড়া প্রচুর সার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যাতে আসন্ন বোরো মৌসুমেও কোনো ঘাটতি না হয়।
গত সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) কুড়িগ্রামে রৌমারী উপজেলায় স্থানীয় কৃষক ডিলারের গুদামের বেড়া ভেঙে শতাধিক বস্তা সার নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে কৃষকের বিরুদ্ধে। একই দিনে লালমনিরহাটে পর্যাপ্ত সার সরবরাহের দাবিতে কৃষকরা সড়ক অবরোধ করেন। সার নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড চলছেই।
আরও পড়ুন
সার না পেয়ে কৃষকদের হট্টগোল, ভাঙচুর
পাশাপাশি প্রতিদিনই গণমাধ্যমে শিরোনাম হচ্ছে সারের সংকট। গত মাসেও কুড়িগ্রামে গুদাম থেকে একশ বস্তা সার লুট হয়। কোথাও কৃষক সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার পাচ্ছেন না, বাধ্য হয়ে বেশি দাম দিয়ে সার কিনছেন। কোথাও কোথাও আবার সরবরাহ ঘাটতির কারণে হচ্ছে সংকট। যে কারণে সারাদেশেই কৃষকের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ।
তবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশ্লেষণে সারের কোনো সংকট নেই আসন্ন ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। মন্ত্রণালয় বলছে, চলতি আমনসহ আসন্ন বোরো পর্যন্ত সারের কোনো সংকট হবে না। বরং ভরা মৌসুম শেষ করে ১৪ লাখ টন সার উদ্বৃত্ত থাকবে।
মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, অক্টোবর থেকে আসন্ন ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৪০ লাখ ২৯ হাজার টন সারের চাহিদার বিপরীতে জোগান হবে ৫৩ লাখ ৭১ হাজার টন। দেশে উৎপাদন ও আমদানির মাধ্যমে এ জোগান নিশ্চিত করছে সরকার।
আরও পড়ুন
সার না পেয়ে গুদাম লুট, বাস্তবে সংকট কতটা?
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, আগামী পাঁচ মাসে ইউরিয়ার চাহিদা ১৭ লাখ ২২ হাজার টন। এছাড়া ডিএপির চাহিদা ১১ লাখ ২৩ হাজার, এমওপির ৬ লাখ ৬৯ হাজার এবং টিএসপির ৫ লাখ ১৫ হাজার টন। সেখানে সরকারি মজুত ও সরকারি-বেসরকারি আমদানি মিলিয়ে সরবরাহ হবে ইউরিয়ার ২০ লাখ ৭ হাজার টন, ডিএপি ১৩ লাখ ৪৮ হাজার, এমওপি ১০ লাখ ৮২ হাজার এবং টিএসপি ৯ লাখ ৩২ হাজার টন।
সরকারের কাছে গত ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মজুত রয়েছে মোট ১২ লাখ ২২ হাজার টন। এর মধ্যে ইউরিয়া ৪ লাখ ২৭ হাজার টন, ডিএপি ৩ লাখ ৩২ হাজার, এমওপি ১ লাখ ১৭ হাজার এবং টিএসপি ৩ লাখ ৫২ হাজার টন।
এছাড়া বর্তমানে আমদানি করা সার পরিবহনাধীন (বিদেশ থেকে আসছে) ৪ লাখ ৫৯ হাজার টন। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরকারি পর্যায়ে আমদানি (জিটুজি) ও বেসরকারি আমদানির আনুমতি দেওয়া রয়েছে ৩৬ লাখ ৮৩ হাজার টন সারের।
প্রকৃতপক্ষে সারের মজুত ও আমদানি নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। সার নিয়ে যা হচ্ছে সেটা করছে পুরোনো ডিলাররা। যে পরিমাণ সার আমাদের রয়েছে ও বরাদ্দ দিয়েছি তাতে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সমস্যা হবে না। সবাই সার পাবে।-কৃষি সচিব মো. সেলিম খান
এসব বিষয়ে কৃষি সচিব মো. সেলিম খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে সারের মজুত ও আমদানি নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। সার নিয়ে যা হচ্ছে সেটা করছে পুরোনো ডিলাররা। যে পরিমাণ সার আমাদের রয়েছে ও বরাদ্দ দিয়েছি তাতে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সমস্যা হবে না। সবাই সার পাবে।’
যা বলছেন কৃষক
সার নিয়ে বেশি হট্টগোল হয়েছে উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামে। জেলার চর যাত্রাপুরের কৃষক আজগার আলী জাগো নিউজকে বলেন, দ্বিতীয় দফায় ধানক্ষেতে সার দিতে হবে। কিন্তু সরকারি দামে সার পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে খোলাবাজার থেকে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। এতে বেড়ে যাচ্ছে উৎপাদন খরচ। আবার ডিলারের কাছ থেকেও প্রয়োজনের সময় সার পাওয়া যায় না।
আরও পড়ুন
কুড়িগ্রামে সার লুটের ঘটনায় ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি, ১০০ বস্তা উদ্ধার
ভূরুঙ্গামারীর পাটেশ্বরী ব্রিজ পাড় এলাকার কৃষক তোফাজ্জল হক বলেন, সারের জন্য দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। এরপরও অনেক সময় সার পাওয়া যায় না। সার নিতে গেলে একদিন চলে যায়। এ সময় একজন শ্রমিকের পারিশ্রমিক ৭শ টাকা।
ফলে সার কিনতে গিয়ে একদিকে সময়, অন্যদিকে শ্রমের মজুরি দুদিক থেকেই ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের।
আমি পাঁচ দোন জমিতে ধান চাষ করেছি। স্বাভাবিকভাবেই পাঁচ দোন জমির জন্য আমার বেশি পরিমাণে সার প্রয়োজন। কিন্তু দোকানে সার কিনতে গেলে চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছি না। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর যখন আমার সিরিয়াল আসে, তখন অনেক সময় দোকানে আর সার মজুত থাকে না।-কৃষক মামুন বাদশা
লালমনিরহাটের দুর্গাপুর ইউনিয়নের কৃষক মামুন বাদশা জাগো নিউজকে বলেন, আমি পাঁচ দোন জমিতে ধান চাষ করেছি। স্বাভাবিকভাবেই পাঁচ দোন জমির জন্য আমার বেশি পরিমাণে সার প্রয়োজন। কিন্তু দোকানে সার কিনতে গেলে চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছি না। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর যখন আমার সিরিয়াল আসে, তখন অনেক সময় দোকানে আর সার মজুত থাকে না।
কৃষকরা যেন চাহিদামতো এবং প্রয়োজনের সময় সার কিনতে পারেন, সরকারের কাছে সে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান।
আরও পড়ুন
লুটের অভিযোগ / কুড়িগ্রামে সার নিয়ে উত্তেজনা, গুদাম ভাঙচুর-সড়ক অবরোধ
মেহেরপুরের কৃষক ফিরোজ আলী এ বছর সাত বিঘা জমিতে পেঁয়াজ ও পাঁচ বিঘা জমিতে কপি চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। জমি প্রস্তুতের সময় প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি সমস্যায় পড়েছেন বলে জানান।
তার অভিযোগ, ডিলারদের কাছে গেলে চাহিদামতো সার পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে খোলাবাজার থেকে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে। এতে ফসল উৎপাদনের আগেই বেড়ে যাচ্ছে খরচ।
কৃষকদের আশঙ্কা, এভাবে সার কিনতে হলে শেষ পর্যন্ত উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
একই জেলার কৃষক মেগা খান বলেন, ডিলারের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সার না পাওয়ায় খোলাবাজার থেকে সার কিনতে হয়েছে। সেখানে প্রতি বস্তা সারের জন্য অতিরিক্ত তিন থেকে চারশ টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে হয়েছে।
আরও পড়ুন
সবজি চাষের ভরা মৌসুমে মেহেরপুরে সার সংকট
তবে ডিলারদের দাবি, নীতিমালার পরে কিছু সমস্যা থাকলেও বাস্তবে সারের সরবরাহ ও বরাদ্দ কম। কুড়িগ্রাম ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সার ডিলার শামসুল ইসলাম মন্ডল সম্প্রতি জাগো নিউজকে বলেন, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া ময়মনসিংহ জেলা ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এম এম বাবুল বলেন, সারের সরবরাহ ও বরাদ্দ কম। সবমিলে উৎপাদন মৌসুমে এ নীতিমালা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত ও অপ্রতুল বরাদ্দ সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে সার পরিস্থিতি তদারকিতে কৃষি মন্ত্রণালয় ও প্রাধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আলাদা দুটি কমিটি করা হয়েছিল গত মাসে। ওইসব কমিটি সারাদেশের সার পরিস্থিতি তদারকি করছে।
এ কমিটির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সার নিয়ে আওয়ামী লীগ আমলে ডিলারদের একটি সিন্ডিকেট সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে সারাদেশে আরও বেশি অস্থিরতা উসকে দিচ্ছে। এছাড়া কোনো সমস্যা নেই।’
কৃষি মন্ত্রণালয়েরও একটি পক্ষ বিগত সময় সার আমদানির সিদ্ধান্ত নানাভাবে প্রভাবিত করে কালক্ষেপণ করিয়েছে, যারা ছিল পতিত সরকারের আমলা-কর্মকর্তা। যে কারণে সারের সংকট তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, গত আগস্টে দেওয়া দরপত্রে চূড়ান্ত অনুমোদন না পাওয়া বেসরকারি খাতের আমদানিকারকরা ডিএপি, এমওপি ও টিএসপি আমদানির এলসি খোলা শুরু করতে পারেনি। বেসরকারি আমদানি প্রক্রিয়া শুরু করতে অনেক দেরি হয়েছে। এর আগে প্রতি বছর এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যে এই আমদানির দরপত্র আহ্বান এবং জুনের মধ্যে কার্যাদেশ দেওয়ার রীতি ছিল। এবার ইচ্ছা করে সেটা দেরি করানো হয়েছে।
তবে এসব বিষয়ে কৃষি সচিবের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
এনএইচ/এএসএ/ এমএফএ