আনোয়ার আল শামীম, গাইবান্ধা
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার পার্শ্ববর্তী চর বিরহিমের সাতালস্কর গ্রামের সেলিম মিয়া। তিস্তার ভাঙনে ভিটেমাটি হারান তিনি। বসবাস শুরু করেন সুন্দরগঞ্জ উপজেলা সদরে ভাড়া বাসায়। জীবিকার তাগিদে একটি এনজিওতে চাকরি নেন। বছর খানেক পর বন্ধ হয়ে যায় সেটিও।
কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে শুরু করেন মামলার এজাহার লেখালেখির কাজ। আর এজাহার লিখতে গিয়ে তিনি দেখেন, অধিকাংশ মামলাই ভূমি নিয়ে। চিন্তায় পড়েন সেলিম। সব প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে খুঁজতে থাকেন ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন জটিলতা থেকে মুক্তির উপায়। গড়ে তোলেন ‘ভূমি গবেষণাগার।’
আরও পড়ুন
কলকাতায় হোটেল পেতে সমস্যা, তবু নিউমার্কেটে বাংলাদেশিদের উপচেপড়া ভিড়
নিজের কোনো জমি নেই। নেই নিজের বাসস্থান। থাকেন ভাড়া বাসায়। নিজের জমিজমা না থাকলেও কী হবে, ভূমিসংক্রান্ত নানা জটিলতাগুলো খুব ভাবায় সেলিম মিয়াকে। প্রতিনিয়ত ভাবেন, কেন বাড়ছে জমিজমা নিয়ে খুনখারাবি ও মারামারি? নারীরা কেন বঞ্চিত হচ্ছেন তাদের অধিকার থেকে?
ভূমি সংক্রান্ত এসব নানা জটিলতা দূর করতে বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন খবরের কাগজে আসা হাজার হাজার খবর সংগ্রহ করে সেঁটে দিয়েছেন ঘরের চার দেয়ালজুড়ে। নাম দিয়েছেন ‘ভূমি গবেষণাগার ও তথ্য ভাণ্ডার।’ তার উদ্ভাবিত ‘ডিজিটাল ভূমি কার্ড’ চালু হলে অবসান হবে ‘জোর যার, মুলুক তার’ নীতি।
আরও পড়ুন
সার নিয়ে ‘তুলকালাম’, সরকার বলছে ‘সংকট নেই’
সেলিমের গবেষণাগারে দেখা যায়, ‘২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে আজ পর্যন্ত ভূমি নিয়ে সংঘটিত বিভিন্ন সংঘর্ষে নিহত-আহত, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাবলি নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবর সংগ্রহ করে ঘরের চার দেয়ালে আটা দিয়ে সেঁটে রেখেছেন তিনি।
এছাড়া স্ট্যাম্প খরচের হিসাব, ভূমি জরিপের ভুল-ত্রুটি, জাল-দলিল তৈরির কারখানা, ভূমি জবরদখল ও ভূমিদস্যুতা, অফিসে ছেঁড়াফাটা গায়েব, সাবেক ছিটমহলে ভূমি সমস্যা, রেলওয়ের জমি জবরদখল, আদিবাসীদের ভূমি সমস্যা, ভূমি অধিগ্রহণ সমস্যা, সাবরেজিট্রার অফিসে সমস্যা, সমাজের কুচক্রী মানুষ কর্তৃক বিভিন্ন জাল জালিয়াতির মতো বিষয়গুলোর হাজার হাজার পত্রিকা কাটিং সাঁটিয়েছেন স্বাধীন এ গবেষক।
হিসাব রেখেছেন, জানুয়ারি ২০১৩ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত দেশে ভূমি সংক্রান্ত বিষয়ে খুনের সংখ্যা। তার সংরক্ষিত হিসাবমতে, এই ১৩ বছরে দেশে মানুষ খুন হয়েছেন ২৪০২ জনের বেশি।
আরও পড়ুন
রাজধানীমুখী রোগীর চাপ কমাতে বিভাগীয় সাত হাসপাতালে আসছে আধুনিক যন্ত্র
এ রমধ্যে রংপুর বিভাগে ৪৭৭ জন, রাজশাহী বিভাগে ৪৩৪ জন, খুলনা বিভাগে ২৩৪ জন, বরিশাল বিভাগে ১১৮ জন, ঢাকা বিভাগে ৪০৮ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ২১৭জন, সিলেট বিভাগে ১৮৬ জন ও চট্টগ্রাম বিভাগে ৩২৬ জন এবং আহত হয়েছেন কয়েক হাজার। এতেই খান্ত দেননি তিনি। সমাধানকল্পে তৈরি করেছেন একটি ‘ডিজিটাল ভূমি কার্ড।’
সেলিম মিয়ার দাবি, প্রত্যেক ভূমি মালিকদের কাছে থাকবে এই ডিজিটাল কার্ড। যেখানে থাকবে প্রত্যেকের মৃত্যু তারিখ ও মোট জমির পরিমাণ। থাকবে ওয়ারিশের তালিকা। থাকবে জমি বেচা-কেনার কলাম। কিনলে যোগ হবে, বিক্রি করলে বিয়োগ হবে। সরকারিভাবে এই কার্ডের ব্যবস্থা করতে পারলে কেউ কাউকে আর জমি থেকে বঞ্চিত করতে পারবে না। দূর হবে ‘জোর যার, মুলুক তার’ ও ‘লাঠি যার, জমি তার’ নীতি। বন্ধ হবে ভূমি নিয়ে দাঙ্গা-হাঙ্গামার মতো ঘটনা, কমবে অনাকাঙ্ক্ষিত এই মৃত্যু।
তিনি আরও বলেন, দশবারের চেষ্টায় তিনি ইন্টারমেডিয়েট পাশ করেন। সাতবার নদী ভাঙনে ভিটামাটি হারিয়ে নি:স্ব হয়ে যান। তার পর থেকেই তিনি ভূমি গবেষণাগার ও তথ্য ভান্ডার গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন।
এমআরএম