
দেশের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ও মাঠপর্যায়ে বিরাজমান তীব্র জনবলসংকট কাটাতে কাজ শুরু করেছে সরকার। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়। এই বিশাল নিয়োগ কার্যক্রম মোট তিনটি ধাপে সম্পন্ন করা হবে। এর মধ্যে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষেই প্রথম ধাপে ৪৫ হাজার ৭০০ জন কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রান্তিক পর্যায়ে সেবা ত্বরান্বিত করতে বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হবে।
স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ এবং স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। বর্তমানে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীদের পদমর্যাদা, গ্রেডেশন নির্ধারণ ও কর্মপরিধি কেমন হবে, তা নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর।
সরকার স্বাস্থ্য খাতে এক লাখ কর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে, যার মধ্যে চলতি অর্থবছরে ৪৫ হাজার ৭০০ জন নিয়োগ পাবেন। তীব্র জনবলসংকট নিরসনে কার্যক্রম দ্রুত করতে সরকার সক্রিয়।
সমন্বিত পদক্ষেপ ও প্রথম ধাপের প্রস্তুতি
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, এই বৃহৎ নিয়োগপ্রক্রিয়ার সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের একাধিক বিভাগ ও অধিদপ্তর যুক্ত। প্রতিটি ক্ষেত্রে কাজের গতি বাড়াতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে ৪৫ হাজার ৭০০ জন কর্মী নিয়োগের লক্ষ্য নির্ধারণ করে প্রাথমিক কাজ এগোচ্ছে।
এর অংশ হিসেবে অতি সম্প্রতি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে ১৩ থেকে ১৬তম গ্রেডের শূন্য পদে জরুরি ভিত্তিতে সরাসরি নিয়োগ ও পদোন্নতির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমীর স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জানানো হয়, ২০১৮ সালের নন-মেডিক্যাল কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালা অনুসরণ করে এসব পদে দ্রুত জনবল নেওয়া হবে।
যেসব প্রতিষ্ঠানে আগে বিজ্ঞপ্তি দিয়েও মামলা বা প্রশাসনিক জটিলতায় নিয়োগ শেষ করা যায়নি, সেসব পদের ছাড়পত্র নিয়ে আবার সমন্বিত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনো জটিলতা থাকলে তা দ্রুত নিষ্পত্তির তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
মাঠপর্যায়ে তীব্র সংকট ও অতীত অভিজ্ঞতা
বর্তমানে দেশে অনুমোদিত ৬৫ হাজার ২৩০টি মাঠপর্যায়ের পদের বিপরীতে ১৮ হাজার ৯৪৭টি পদই শূন্য। এর মধ্যে অতিগুরুত্বপূর্ণ ‘স্বাস্থ্য সহকারী’ পদের ৬ হাজার ৯৫৩টি এবং পরিবারকল্যাণ সহকারীর ৮ হাজার ২৯৩টি পদ খালি রয়েছে। লালমনিরহাটে চিকিৎসকদের ৫০ শতাংশ পদ এবং ঢাকার সিএমএসডির ২৩০টি পদের মধ্যে ১৬০টি পদই ফাঁকা। কর্মীসংকটের কারণে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে দৈনিক স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য গবেষকদের মতে, এ বিশাল নিয়োগে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ মনে করেন, কেবল তিন মাসের প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মী নিয়োগ না করে বেকার থাকা প্রায় ৪০ হাজার নার্স, ৮ হাজার মিডওয়াইফ ও ডিপ্লোমাধারী হেলথ টেকনোলজিস্টদের প্রাধান্য দেওয়া যুক্তিসংগত হবে। এতে সেবার মান বাড়ার পাশাপাশি সরকারের ব্যয়ও সাশ্রয় হবে।
দীর্ঘসূত্রতার শঙ্কা চাকরিপ্রার্থীদের
বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে রেকর্ড ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা এবং নিয়োগের ৮০ শতাংশ পদে নারী কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সাধারণ মানুষ। তবে চাকরিপ্রার্থীরা আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি নিয়ে এখনো শঙ্কিত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন চাকরিপ্রার্থী জানান, সরকারি যেকোনো নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি থেকে পদায়ন পর্যন্ত বছরের পর বছর কেটে যায়। এই বিশাল নিয়োগে যাতে মামলা বা প্রশাসনিক জটিলতায় দীর্ঘসূত্রতা তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সরকারকে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। জনস্বার্থ ও চিকিৎসাসেবার জরুরি তাগিদ বিবেচনা করে এই ধাপে ধাপে নিয়োগপ্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও দ্রুততম সময়ে শেষ করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।