তিন দিন ধরে কক্ষটি তালাবদ্ধ ছিল। সেই ঘর থেকে চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছিল পচা গন্ধ। প্রথমে বিড়াল মারা গিয়ে পচে গন্ধ ছড়াচ্ছে বলে ধারণা করেছিল সবাই। পরে গন্ধ তীব্র হওয়ায় কক্ষটির তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে দেখে, সেখানে খাটের ওপর স্বামী-স্ত্রীর মরদেহ পড়ে আছে। তাঁদের পাশেই পড়ে আছে তাঁদের অনাগত সন্তানের মৃত ভ্রূণ। অর্থাৎ মাকে এতটাই নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে যে তাঁর পেটে থাকা পাঁচ মাসের ভ্রূণটি বেরিয়ে এসেছে। এই নির্মম ঘটনার কথা কল্পনা করাও অসম্ভব, অথচ তাই ঘটেছে এই দেশে।
এই একটি নয়, এরকম বহু ঘটনা ক্রমাগত ঘটেই যাচ্ছে। বন্ধ ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসে দুর্গন্ধ, দরজা ভেঙে দেখা যায় ভেতরে পড়ে আছে বিকৃত মরদেহ। কাকে, কখন, কে এবং কেন হত্যা করেছে, সেটা উদ্ধার করাও কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে কখনো কখনো। শুধু এলোমেলো পড়ে থাকা প্রাণহীন দেহগুলোই যেন সত্য। প্রায় প্রতিদিন দুই-তিনটি মরদেহ উদ্ধার করার ঘটনা যেন আমাদের কাছে নিয়মিত হয়ে গেছে।
এ ছাড়া পথের ধারে, নদীতে বা পুকুরে, জঙ্গলে, পার্কে বা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপরেও মরদেহ পড়ে থাকার ব্যাপারটাও খুব স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর তাই তো ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে দেশে খুনের ঘটনায় মোট ২,০৭৬টি মামলা হয়েছে। প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২৯৬টি হত্যার মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। মামলার বাইরেও রয়ে যাচ্ছে আরও বহু হত্যার ঘটনা। মোট নিহতের সংখ্যা জানাও যায় না সবসময়।
এইসব হত্যাযজ্ঞ দেখে দেখে ভয় হচ্ছে যে ধীরে ধীরে সহিংসতা যেন মানুষের কাছে ‘অস্বাভাবিক ঘটনা’ না হয়ে পরিচিত সামাজিক আচরণে পরিণত হয়। চলমান অপরাধ আমাদের মধ্যে এক ধরনের ‘নেতিবাচক সহ্যক্ষমতা’ তৈরি করেছে, যার প্রভাব খুবই খারাপ। অপরাধপ্রবণতায় যে অতিরিক্ত হিংস্রতা যুক্ত হয়েছে, তাতে অপরাধীদের আচরণে মানসিক বিকৃতির লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
দেশের বিভিন্ন জায়গায় একই পরিবারের একাধিক সদস্য খুন হওয়ার ১৮টি ঘটনা পাওয়া গেছে গত ছয় মাসে (ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট)। এসব ঘটনায় অন্তত ৪৭ জন নিহত হয়েছেন। কোনো ক্ষেত্রে এক পরিবারের দুজন, কোনো ক্ষেত্রে তিনজন, কোনো ক্ষেত্রে চারজন এবং পাঁচজনও নিহত হয়েছেন। (প্রথম আলো)
মানুষগুলো কেন নিহত হচ্ছেন, এর চেয়েও প্রশ্ন—কতজন অপরাধী ধরা পড়ছে? কতটি মামলার সুরাহা হচ্ছে? কতজন বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াচ্ছে? রংপুরের গণপতি চক্রবর্তী পরিবারের ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ এটা নিয়ে যত ধরনের বয়ান দিয়েছে, এর প্রতিটিই আজ প্রশ্নের মুখে। অন্যান্য মামলার ক্ষেত্রেও কম-বেশি একই কথা প্রযোজ্য। উপর্যুপরি অপরাধ ঘটছে, কিন্তু অপরাধীরা কই?
সাধারণত হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পেছনে থাকে সম্পত্তি বা জমি নিয়ে বিরোধ, মাদক, দাম্পত্য ও পারিবারিক কলহ, লোভ, অনৈতিক সম্পর্ক, হিংসা, রাগ ও প্রেম বা আরও কোনো তুচ্ছ ঘটনা।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়ার বড় কারণ মব সন্ত্রাস, অর্থাৎ যখন মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেয়। কেন মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, এ প্রসঙ্গে অপরাধবিষয়ক বিশ্লেষকেরা বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হলে মানুষ আইন হাতে তুলে নেয়।
খুন-খারাবি সমাজে সবসময়ই ছিল, তবে এত বেশি হারে কি ছিল? অপরাধী নেটওয়ার্কগুলোও হঠাৎ তৈরি হয় না। এগুলো সাধারণত দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হয়। সময়-সুযোগমতো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। রাজনৈতিক অস্থিরতা বা প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগে এগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে।
আশঙ্কার ব্যাপার হলো, যারা হত্যার মতো ভয়ংকর অপরাধগুলো করছে, তাদের মধ্যে একধরনের বেপরোয়া ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। তারা ভাবছে, যাকে যেভাবে খুশি, যখন ইচ্ছা হত্যা করা যায়। এরপরও অপরাধী ধরা পড়বে না, ধরা পড়লেও বিচার হবে না।
ফলে এরা পুলিশকে পিটিয়ে মারছে, প্রকাশ্য দিবালোকে দা হাতে ঘরে ঢুকে কুপিয়ে চলে যাচ্ছে, কারও মাথা ফাটিয়ে দিচ্ছে, ঘরের ভেতরে থাকার পরও জানালা দিয়ে গুলি করে মারছে। ১৮টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনার মধ্যে অন্তত ১৪টি ঘটনা নিজের গৃহে বা বসতঘরে ঘটেছে। প্রশ্ন উঠেছে, ঘরেও কি তাহলে মানুষ নিরাপদ নন?
এইভাবে একের পর এক, একাধিক খুনের ঘটনা মানুষের মনে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে। কেন মানুষ এখন বেশি আতঙ্কিত? কারণ এখন বাস্তব ক্ষেত্রে অপরাধ যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে এর দৃশ্যমানতাও। ফলে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি দ্রুত বাড়ছে।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো বিভিন্ন এলাকায় ঘটছে, বিভিন্ন কায়দায় ঘটছে। তবে এসব ঘটনার একটির সঙ্গে অন্যটির মিল আছে। সব হত্যাকাণ্ডই খুব নৃশংস কায়দায় হচ্ছে। শুধু হত্যা করেই হত্যাকারী ক্ষান্ত হচ্ছে না, হত্যা করার পর সেই মরদেহকে নানাভাবে বিকৃত করছে। দেখে মনে হচ্ছে, যেন জিঘাংসা মেটাচ্ছে।
অপরাধ নিয়ে গবেষণাকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেছেন, “একেক ঘটনার কারণ একেক রকম। তবে প্রতিটির পেছনে সামাজিক ও কাঠামোগত নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি রয়েছে। পারিবারিক বিরোধ, সম্পদ, প্রভাব ও প্রতিশোধের প্রবণতার সঙ্গে অপরাধের ঘটনার দ্রুত তদন্ত এবং বিচার না হওয়াও এ ধরনের সহিংসতার অন্যতম কারণ।” (প্রথম আলো)
ঠিক এই আলোচনাটাই এখন দরকার যে অপরাধের ঘটনার দ্রুত তদন্ত হচ্ছে না কেন? কেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একধরনের দায়সারা ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে? কেন রাষ্ট্র এমন পরিবেশ তৈরি করতে পারছে না, যেখানে মানুষ সব জায়গায় নিরাপদ বোধ করতে পারেন?
একই কথা বলেছেন পুলিশের সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন। তিনি বলেছেন, “নিরাপত্তাবোধ আসলে রাষ্ট্র ও নাগরিকের পারস্পরিক আস্থার প্রশ্ন। নিরাপত্তা শুধু রাস্তায় পুলিশের উপস্থিতির বিষয় নয়; একজন মানুষ যখন নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করেও নিরাপদ বোধ করেন, তখনই প্রকৃত অর্থে আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়।” কিন্তু সেই কথার বাস্তবায়ন কোথায়?
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়ার আরেকটি বড় কারণ মব সন্ত্রাস, অর্থাৎ যখন মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেয়। কেন মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, এ প্রসঙ্গে অপরাধবিষয়ক বিশ্লেষকেরা বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হলে মানুষ আইন হাতে তুলে নেয়।
‘হত্যা মামলার সাজার হার কম হওয়ার কারণ অনুসন্ধান’ শীর্ষক এক গবেষণায় ২৩৮টি মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) গত বছর মে মাসে জানিয়েছিল, ৫২ শতাংশ মামলায় সব আসামি খালাস পেয়েছে।
এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতি হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পুলিশ বাহিনীর অনেক স্তরে, বিশেষ করে মাঠপর্যায়ে পুলিশের মনোবল, সক্ষমতা ও জনআস্থার ঘাটতি অপরাধ নিয়ন্ত্রণকে দুর্বল করেছে। অনেক হত্যাকাণ্ডের পেছনে আছে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, স্থানীয় আধিপত্যের লড়াই এবং দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল।
রাজনৈতিক বিরোধ যখন অস্ত্রধারী গোষ্ঠীর মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তখন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অস্থিরতার সুযোগে পুরোনো অপরাধী নেটওয়ার্ক সক্রিয় হয়েছে। তাছাড়া সবচেয়ে কঠিন পেশাদার অপরাধী চক্রের নিয়ন্ত্রকদের বিচারের আওতায় আনা।
প্রকাশ্যে হামলা, গুলি এবং সহিংসতার ঘটনা মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি করে। বারবার এমন ঘটনা ঘটলে, সহিংসতাকে সমস্যা সমাধানের একটি উপায় বলেও মনে হতে পারে। বিশেষ করে তরুণ ও কিশোররা এমনটা মনে করতেই পারে।
লাগামহীনভাবে অপরাধ ঘটতে থাকলে অপরাধীরা এই অবস্থার সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে। কারণ অপরাধবিজ্ঞান বলে, অপরাধী যদি মনে করে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল, ধরা পড়ার ভয় কম এবং রাজনৈতিক বা স্থানীয় ক্ষমতার পরিচয় তাকে রক্ষা করতে পারে, তাহলে অপরাধের মাত্রা ও ধরন বদলে যায়। অপরাধীরা অধিক মাত্রায় নৃশংস হয়ে ওঠে।
অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ গণমাধ্যমকে বলেছেন, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যখন দুর্বল হয়ে যায়, তখন বিভিন্ন অপরাধ বেড়ে যায়। যেমন শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে এলে জ্বর, সর্দি-কাশিসহ নানা রোগবালাই বাসা বাঁধে। রাষ্ট্রের অবস্থাও একই রকম। রাষ্ট্রের রেজিস্ট্যান্সের ক্ষমতা হচ্ছে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর কাজ এটা।” (প্রেসিডেন্ট, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ)
শুনেছি, প্রয়াত সাংবাদিক নির্মল সেন ১৯৭৩ সালে ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই’ শিরোনামে লিখেছিলেন, “আমি চাই না যে আমাকে পিটিয়ে হত্যা করা হোক। আমি চাই না আমার সেই বিকৃত দেহটা দেখে কাঁদুক আমার স্বজন। অশ্রুর প্লাবন নামুক আমার আপনজনের চোখে।” অপ্রিয় হলেও সত্যি, এতগুলো বছর পর আবার আমরা একই পরিস্থিতি দেখতে পাচ্ছি।
লেখক : যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক।
এইচআর/জেআইএম