বাংলাদেশে এখন তামাক চাষের জমি দিনদিন বাড়ছে। কৃষকেরা তামাক কোম্পানিগুলোর এককালীন আর্থিক সহযোগিতা পেয়ে থাকেন। যাতে তারা তামাক চাষে স্বাছন্দ্যবোধ করেন। এককালীন টাকা পাওয়ার ফলে চাষিরা দিনদিন তামাক চাষ বাড়াচ্ছেন। তামাক চাষের বিস্তার জনস্বাস্থ্যের জন্য গভীর উদ্বেগজনক বিষয়। এটি কেবল ধূমপান বা তামাক সেবনের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে ক্ষতি করে না। চাষের প্রক্রিয়া থেকেই এর নেতিবাচক প্রভাব শুরু হয়।
তামাক চাষ কেন জনস্বাস্থ্যের জন্য ‘অশনিসংকেত’ বা বিপদের পূর্বাভাস, তার প্রধান কারণগুলো নিম্নরূপ:
কৃষকের স্বাস্থ্যঝুঁকি (গ্রিন টোব্যাকো সিকনেস)
তামাক পাতা স্পর্শ করার মাধ্যমে কাঁচা নিকোটিন ত্বকের সাহায্যে সরাসরি কৃষকের রক্তে মিশে যায়। একে ‘গ্রিন টোব্যাকো সিকনেস’ বলা হয়। এর ফলে বমি বমি ভাব, মাথাঘোরা, প্রচণ্ড দুর্বলতা এবং দীর্ঘমেয়াদে শ্বাসকষ্টের মতো জটিল সমস্যা দেখা দেয়। তবে যারা দীর্ঘদিন থেকে চাষ করেন; তাদের সহ্য হয়ে যায়। ফলে ক্ষতি বুঝতে পারেন না। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তারা অসুস্থ হন।
পরিবেশগত বিপর্যয় ও খাদ্য নিরাপত্তা
তামাক চাষে প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিক সার এবং উচ্চমাত্রার কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। এই কীটনাশকগুলো বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে জলাশয়ে মেশে, যা মাছ ও পানীয় জলের উৎসের ক্ষতি করে। ঘাসের সঙ্গে গবাদিপশু খায়।
বন উজাড়
তামাক পাতা শুকানোর (কিউরিং) জন্য হাজার হাজার চুল্লিতে প্রচুর পরিমাণ কাঠ পোড়াতে হয়। এর ফলে বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে এবং বায়ুমণ্ডলে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বৃদ্ধি পায়, যা পরোক্ষভাবে জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে।
খাদ্য সংকট
উর্বর জমিতে তামাক চাষ করায় সেখানে খাদ্যশস্য বা ডাল চাষ বাধাগ্রস্ত হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা বাধাগ্রস্ত করছে।
পরোক্ষ ধূমপান ও ব্যাধি বিস্তার
তামাক চাষ বাড়ার অর্থ হলো বাজারে সস্তা তামাকজাত পণ্যের সরবরাহ বেড়ে যাওয়া। এর ফলে অসংক্রামক ব্যাধি, যেমন- ক্যানসার (ফুসফুস, মুখ গহ্বর); হৃদরোগ (হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক); দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগ হতে পারে।
নারী ও শিশুদের ওপর প্রভাব
তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজে অনেক সময় নারী ও শিশুদের ব্যবহার করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, তামাক চাষ এলাকায় বসবাসরত শিশুদের শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা এবং গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে গর্ভপাতের ঝুঁকি এবং প্রতিবন্ধী শিশু জন্মের হার সাধারণের তুলনায় অনেক বেশি। শস্য চাষ কমিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি এমন বিষাক্ত চক্র তৈরি করে তামাক চাষ; যার মাশুল দিতে হয় জনস্বাস্থ্য দিয়ে। তাই টেকসই জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে তামাকের বদলে বিকল্প খাদ্যশস্য চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করা জরুরি।
বাংলাদেশে তামাকের বিকল্প হিসেবে বিভিন্ন লাভজনক ও পরিবেশবান্ধব শস্য চাষের যথেষ্ট সুযোগ আছে। তামাক চাষ স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। তাই বিকল্প শস্য চাষ কৃষকের দীর্ঘমেয়াদি উন্নতির জন্য অপরিহার্য।
তামাকের বিকল্প হিসেবে চাষযোগ্য কয়েকটি উল্লেখযোগ্য শস্যের তালিকা দেওয়া হলো:
দানাজাতীয় শস্য (গম, ডাল ও তেলজাতীয় শস্য)
তামাক সাধারণত শীতকালে চাষ হয়, যা রবিশস্যের সময়। এই সময়ে তামাকের পরিবর্তে গম, ডাল, তেল মসলাসহ বহু ফসল চাষ করা যায়।
উচ্চমূল্যের মসলাজাতীয় ফসল
তামাক চাষ প্রবণ এলাকাগুলোতে (যেমন- কুষ্টিয়া বা নীলফামারী) মসলা চাষের দারুণ সম্ভাবনা আছে। রসুন ও পেঁয়াজ, শুকনা মরিচ, ডালজাতীয় ফসল এগুলোর চাহিদা সব সময় থাকে এবং সঠিকভাবে সংরক্ষণ করলে কৃষকেরা ভালো দাম পান।
তেলবীজ (সরিষা, সূর্যমুখী ও ডালজাতীয় শস্য)
বর্তমানে দেশে ভোজ্যতেলের ব্যাপক চাহিদা থাকায় সরিষা ও সূর্যমুখী চাষ অত্যন্ত লাভজনক। অল্প সময়ে এবং কম সেচে সরিষা ঘরে তোলা যায়। যা তামাকের তুলনায় কম শ্রমসাধ্য। সরিষার পর আমন ধান চাষ করা হয়। মসুর, মুগ এবং খেসারি ডাল চাষ করলে মাটির উর্বরতা বাড়ে। এটি মাটির নাইট্রোজেন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। কিন্তু তামাক চাষিরা অতিরিক্ত ইউরিয়া এবং এমওপি সার ব্যবহার করে, যা মাটির জন্য ক্ষতিকর।
সবজি চাষ
শীতকালীন আগাম সবজি, যেমন- ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো এবং শিম চাষ করে কৃষকেরা দ্রুত নগদ অর্থ হাতে পেতে পারেন। ডাল, সরিষা, তিল, গম, যব, আলু, পেঁয়াজ বা রসুন, টমেটো, ধনিয়া, কালিজিরা ও ফলবাগান স্থাপনসহ শতাধিক শস্য চাষের সুযোগ আছে। যা কৃষকদের নগদ অর্থ দিতে পারে।
তামাকের প্রচুর রাসায়নিক সার ব্যবহৃত হয়। যা মাটির স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে। মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হচ্ছে এবং কৃষকদের প্রচুর শারীরিক শ্রম দিতে হয়। তামাক চাষে ক্যানসার ও চর্মরোগের ঝুঁকি থাকে দ্বিগুণ। শস্য চাষে কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই। বালি জাতের তামাক খোলা বাতাসে শুকায়। যেখানে শুকায়; সেখানে তামাকের গন্ধে পরিবেশ বিপর্যয় এবং জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি হচ্ছে। সার ও কীটনাশকে প্রচুর ব্যয়; শস্য চাষে খরচ তুলনামূলক কম।
যদি সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে বিকল্প শস্য চাষের জন্য কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ, মানসম্মত বীজ এবং বিপণন সুবিধা নিশ্চিত করা যায়, তবে চাষিরা তামাক চাষ করা অনেকাংশে কমিয়ে দিতে পারেন। তামাক চাষিদের বিকল্প শস্য চাষ করার জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে তারা কিছুটা লাভবান হবেন। কাঁচা তামাক প্রথমে রৌদ্রে শুকিয়ে পরে চুল্লিতে হালকা শুকালে কাঠ পোড়ানো অনেক কমে যাবে। তাদের চাহিদা অনুযায়ী তামাক পাতা প্রস্তুত করা সম্ভব।
তামাক শুকানো, কিউরিং এবং গুদামজাত করার জন্য বসতবাড়ি থেকে দূরে কোম্পানির উদ্যোগে তামাক চাষি সমিতির মাধ্যমে করতে পারলে পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের উপকার হবে। প্রয়োজনে দোতলা বা তিনতলা থ্রেসিং ফ্লোর এবং গুদাম তৈরি করা যেতে পারে। তামাক পাতার মূল্যবৃদ্ধি করা যাবে না, মূল্যবৃদ্ধি করলে বেশি লোক তামাক চাষ করবেন। তামাক কোম্পানি বন্ধ করাও সঠিক হবে না। এতে ধূমপায়ীরা অন্য মাদকের প্রতি আকৃষ্ট হবেন। যা আরও ভয়াবহ অবস্থার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
তামাক চাষে আইপিএম পদ্ধতি অনুসরণ করলে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার এবং কীটনাশক কম লাগবে। সর্বোপরি তামাক একটি নেশাদ্রব্য। এটি খাওয়া কোনো দিনও শরীরের জন্য ভালো নয়। তবে বাহ্যিক ব্যবহারের জন্য তামাক পাতার কিছু উপকারিতার কথা জানা যায়। তামাক পাতার কিছু বৈজ্ঞানিক ও ঔষধি ব্যবহার আছে। তবে তা বাণিজ্যিক বা চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যবহার অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত। এ নিয়ে গবেষণা চলছে।
এসইউ