ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বরিশালে বেড়েছে ডাবের চাহিদা। আর এই সুযোগে নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ডাবের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতাল, বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পাশে প্রতি পিস ডাব ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এতে রোগীর স্বজনসহ সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ।
এদিকে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ডাবের পানির পাশাপাশি অন্যান্য তরল খাবার গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ডাবের দাম বৃদ্ধি করেছেন বলে অভিযোগ সাধারণ ক্রেতাদের।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) হাসপাতালের সামনে স্ত্রীর জন্য ডাব কিনতে আসা বরগুনার বামনা উপজেলার চরকালেখা গ্রামের বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। তিনি জানান, গত চার দিন ধরে স্ত্রীকে নিয়ে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে অবস্থান করছেন। তার স্ত্রী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত।
দেলোয়ার হোসেন বলেন, অনেক ঘোরাঘুরি ও দরদাম করে শেষ পর্যন্ত দুটি ডাব ৩২০ টাকায় কিনেছি। প্রতিটি ১৬০ টাকা করে। তিন-চারজন বিক্রেতার কাছে ঘুরলেও তারা সবাই একই দাম চেয়েছেন। সাইজ অনুযায়ী ১০-২০ টাকা কমবেশি হলেও হাসপাতাল এলাকায় ১৪০, ১৬০ কিংবা ১৮০ টাকার নিচে কোনো ডাব পাওয়া যাচ্ছে না। রোগীর জন্য প্রয়োজন হওয়ায় স্বজনরা বাধ্য হয়েই বেশি দামে কিনছেন।
আরও পড়ুন
ডেঙ্গুতে বছরের সর্বোচ্চ মৃত্যু ও হাসপাতালে ভর্তির রেকর্ড
ঝালকাঠি থেকে আসা মোস্তাফিজুর রহমানও একই অভিযোগ করেন। স্ত্রীকে চিকিৎসার জন্য দুই দিন ধরে শেবাচিম হাসপাতালে আছেন তিনি। রক্তস্বল্পতার কারণে একজন ডোনারের ব্যবস্থা করে তার জন্য হাসপাতালের মাঝের গেটের সামনে থেকে ১৬০ টাকা দিয়ে একটি ডাব কিনেছেন।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কিছুদিন আগেও ডাবের দাম এত বেশি ছিল না। হঠাৎ ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার পর ডাবের চাহিদা বেড়েছে। এই সুযোগে কিছু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। প্রশাসনের উচিত বিষয়টি নজরদারিতে আনা।
তবে বেশি দামে ডাব বিক্রির অভিযোগ মানতে নারাজ বিক্রেতারা। শেবাচিম হাসপাতালের সামনে ডাব বিক্রি করা সবুর হাওলাদার বলেন, আগে কম দামে ডাব কিনতাম, তাই কম দামে বিক্রি করতাম। এখন কেনা দামই বেশি। গাছের মালিকরাও আগের মতো কম দামে ডাব বিক্রি করেন না। পরিবহন ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে একটি ডাব ৮০ থেকে ১১০ টাকার বেশি পড়ে যায়। এরপর বিক্রি করতে হয়।
অপর বিক্রেতা জামাল ফকির জানান, বাবুগঞ্জ, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকারি দরে ডাব সংগ্রহ করে বরিশালে আনেন তারা। গাড়িভাড়া ও শ্রমিকের খরচ যোগ হয়ে প্রতিটি ডাবের ক্রয়মূল্য ১০০ টাকার ওপরে পড়ে।
তিনি বলেন, দিনে চার-পাঁচ ছড়া ডাব বিক্রি করি। একেক ছড়ায় ১৫ থেকে ১৭টি ডাব থাকে। ডাবপ্রতি ২০-৩০ টাকা লাভ থাকে। ডেঙ্গুর কারণে হাসপাতালে ডাবের চাহিদা বেড়েছে। চাহিদা বেশি থাকায় দামও কিছুটা বেড়েছে।
ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের সময় ডাবের চাহিদাকে পুঁজি করে অস্বাভাবিক মূল্য আদায় বন্ধে নিয়মিত বাজার তদারকি ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন রোগীর স্বজন ও সাধারণ ক্রেতারা।
আরও পড়ুন
ফরিদপুরে চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু, তিনদিনে দুই মৃত্যু
শুধু শেবাচিম হাসপাতাল এলাকায় নয়, বরিশাল নগরীর বিভিন্ন স্থানেও একই চিত্র দেখা গেছে। নগরীর সদর রোডের বিবির পুকুর পাড়, নথুল্লাবাদ ও রূপাতলী বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট এবং আদালত চত্বর ঘুরে দেখা যায়, বেশিরভাগ ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা দরে ডাব বিক্রি করছেন। বিবির পুকুর পাড়ে কয়েকজন বিক্রেতাকে প্রতিটি ডাব ১৬০ টাকা করে বিক্রি করতে দেখা যায়।
বেশি দাম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ ক্রেতারাও। বিবির পুকুর পাড়ে ডাব খেতে আসা ইউসিবিএল ব্যাংকের কর্মকর্তা প্রিন্স মাহমুদ বলেন, কিছুদিন আগেও ৮০ থেকে ১০০ টাকায় ডাব খেয়েছি। এখন সেই ডাবের দাম ১৫০-১৮০ টাকা। বাজার মনিটরিং না থাকার কারণে এমনটা হয়েছে বলে জানান এ ব্যাংক কর্মকর্তা।
এদিকে ডাবের অতিরিক্ত দাম নেওয়ার অভিযোগে নজরদারি শুরু করেছেন বলে জানিয়েছেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়।
উপপরিচালক অপূর্ব অধিকারী জাগো নিউজকে বলেন, ডাবের অস্বাভাবিক দাম নেওয়ার খবর পাওয়ার পর আমরা নজরদারি শুরু করেছি। বিভিন্ন এলাকায় ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলেছি। অনেক বিক্রেতাই ডাব কেনার কোনো রসিদ দেখাতে পারেননি। তাদের সতর্ক করা হয়েছে। এরপরও নির্দেশনা না মানলে আইন অনুযায়ী জরিমানা করা হবে।
আরও পড়ুন
নারায়ণগঞ্জে ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি, আগস্টে আক্রান্ত ৭১০ জন
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বহির্বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. জাকির হোসেন বলেন, ডেঙ্গু রোগীর জন্য শুধু ডাবের পানি নয়, পর্যাপ্ত তরল খাবার গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। খাবার স্যালাইন, লেবুর পানি, চিড়ার পানি এবং অন্যান্য তরল খাবারও খাওয়া যেতে পারে। শরীরে পানিশূন্যতা ও তরলের ঘাটতি পূরণে এগুলো সহায়ক।
তিনি আরও বলেন, বিক্রেতাদের নানা ধরনের যুক্তি থাকলেও একটি ডাবের দাম ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা হওয়া অস্বাভাবিক। কারণ বরিশালের আশপাশের গ্রামগুলো থেকে অধিকাংশ ডাব সংগ্রহ করা হয়। তাই যৌক্তিক মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দাম নেওয়া হচ্ছে কি না, তা নজরদারির আওতায় রাখা দরকার।
এফএ