চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে শিপইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে ১০ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় পরীক্ষা ছাড়াই বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সনদ দেওয়া এবং কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতির তথ্য উঠে এসেছে বুয়েট ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে।
মোট ৪৪টি সুপারিশ সম্বলিত এই পৃথক প্রতিবেদন সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে জমা দিয়েছেন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড (বিএসআরবি) এর মহাপরিচালক (ডিজি) শফিউল আলম তালুকদার। মুঠোফোনে জাগো নিউজের প্রতিবেদককে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
স্ক্র্যাপ জাহাজে ব্যাল্লাস্ট ওয়ার ট্যাংকে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার ঘটনা আগে কখনো হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এরকম দুর্ঘটনা যাতে আর না ঘটে সংশ্লিষ্ট দপ্তর তা খতিয়ে দেখছে। দুটি তদন্ত টিমের ৪৪ সুপারিশ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ইয়ার্ড মালিকের গাফিলতি বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দুর্ঘটনার পর ইয়ার্ডের ৩০০ শ্রমিক বেকার হয়ে আছে। তাদেরও কর্মসংস্থানের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও খতিয়ে দেখবে মন্ত্রণালয়।
বুয়েটের তদন্ত প্রতিবেদনে দুর্ঘটনায় জাহাজের ওয়াটার ব্যালেন্স ট্যাংকে হাইড্রোজেন সালফাইড বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি নিশ্চিত বলে উঠে আসে। এমটি রাশি জাহাজ পরীক্ষা না করে বিস্ফোরক অধিদপ্তর সার্টিফিকেট দিয়েছেন। গ্যাস পরিমাপের মনিটর থাকলেও তা ব্যবহার করা হয়নি।
আর শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে মালিক বা কর্তৃপক্ষের গাফিলতি। গ্যাস পরীক্ষা ছাড়া ছুটির দিনে কাটা হচ্ছিল জাহাজ। শুক্রবারে বন্ধের দিন কাজ করা ঠিক হয়নি। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না রেখে ব্যাল্লাস্ট ট্যাংক কাটার সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ছিলো না।
চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তর পরিচালক জমির উদ্দিন জানান, দুটি প্রতিবেদনে ৩৫ ও ৯টি সুপারিশ দেয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে বিষাক্ত গ্যাসজনিত দুর্ঘটনা প্রতিরোধে জাহাজ ভাঙা শিল্পে কাজভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়ন, নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত ডি-ব্যাল্লাস্টিং পদ্ধতি এবং Permit-to-Work (PTW) ব্যবস্থা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। ব্যালাস্ট ট্যাংকের বায়ু, বিভিন্ন স্তরের পানি ও sediment/sludge পরীক্ষা করে H₂S-সহ সম্ভাব্য বিষাক্ত গ্যাসের ঝুঁকি নিরূপণ এবং কাজ চলাকালে নিয়মিত ও নিরবচ্ছিন্ন gas monitoring নিশ্চিত করতে হবে। গ্যাস মনিটর ও গ্যাস অ্যালার্ট ব্যবহার করতে হবে। ইয়ার্ডে আধুনিকায়নের ঘাটতি ছাড়াও ইয়ার্ড মালিকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে সুপারিশ প্রতিবেদনে।
শিপ রিসাইক্লিং গবেষক ও ইপসার কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী শাহীন বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি হয়। কমিটির প্রতিবেদনে উঠে আসা সুপারিশগুলো ঠিকমতো বাস্তবায়ন বা মনিটরিং করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা কমে আসবে। প্রতিবেদন গুলোর ফলো-আপ করা না হলে দুর্ঘটনা রোধ করা না।’
গত ১৪ আগস্ট ফেরদৌস স্টিল শিপইয়ার্ডের এলএনজি স্ক্র্যাপ জাহাজে ওয়াটার ব্যাল্লাস্ট ট্যাংকে হাইড্রোজেন সালফাইড বিষাক্ত গ্যাস আক্রান্তের ঘটনায় মোট ১০ জন মারা যান। এ ঘটনায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ইয়ার্ডটির সকল কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ওই ইয়ার্ডে তিন শতাধিক শ্রমিক কাজ করতো। ইয়ার্ড বন্ধ হওয়ার পর তারা এখন কর্মহীন।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ইয়ার্ড গেটে হাবিব, সাইমন ও প্রদীপসহ দেখা হয় ২০-২৫ জন শ্রমিকের সঙ্গে। তারা বলেন, ইয়ার্ড বন্ধ থাকার কারণে খুবই কষ্টে জীবন চলছে। অনেক সময় পরিবার নিয়ে না খেয়েও দিন কাটছে। শ্রমিকরা নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে ইয়ার্ডটি চালু করার দাবি করেন মালিকপক্ষের কাছে।
এম মাঈন উদ্দিন/কেজে/জেআইএম