জি বি এম রুবেল আহম্মেদ
স্রোতস্বিনী যমুনা। বর্ষা এলেই চারদিকে নেমে আসে আতঙ্ক। নদীর ফুলে ওঠা জল যেন ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে মানুষের জীবনের দিকে। একেকটি পাড়ভাঙার শব্দ শুনলে মনে হয়, কোনো হিংস্র প্রাণী গর্জন করছে। মুহূর্তে ভেঙে পড়ে জমি, হারিয়ে যায় স্মৃতি, বিলীন হয়ে যায় জীবনের সঞ্চয়।
করিম মিয়ার জীবনও এমনই এক ভাঙনের গল্প। বাপ-দাদার রেখে যাওয়া আবাদি জমি একে একে সব গিলে খেয়েছে যমুনা। এখন বসতভিটাটুকুই শেষ সম্বল। শীতকালে পানি নেমে চর জাগলে সেখানে বাদাম, ভুট্টা আর মরিচের চাষ করেন। সেই সামান্য আয়ে চলে সংসার–অসুস্থ স্ত্রী, এক ছেলে আর দুই মেয়েকে নিয়ে।
সংসারে অভাব যেন নিত্যসঙ্গী। অনেক দিন একবেলা খেয়ে কাটাতে হয়। নুন আনতে পান্তা ফুরায়–কথাটা যেন তাদের জীবনের বাস্তব চিত্র। করিম মিয়ার বড় মেয়ে চারটি গরু আর পাঁচটি ছাগল লালন-পালন করে। আশা ছিল, ছাগলগুলো বিক্রি করে বড় মেয়ের বিয়ের খরচের একটা ব্যবস্থা হবে। ছোট ছেলে রহিম–বয়স কম, কিন্তু দায়িত্ব অনেক। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। তবে নিয়মিত স্কুলে যাওয়া হয় না। বেশিরভাগ দিন গরু-ছাগল চরাতেই কাটে।
আরও পড়ুন
অনুবাদ গল্প / আকাশ ও পানির মধ্যবর্তী নীল
সেদিনও রহিম গরু-ছাগল নিয়ে চরে গিয়েছিল। খালি গায়ে, হাফপ্যান্ট পরে বালুর ওপর বসে ছিল। রোদ, কষ্ট; এগুলো তার কাছে নতুন কিছু নয়। বিকেলের দিকে সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। রহিম গরু-ছাগল নিয়ে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিলো। হঠাৎ সে দেখল, চরজুড়ে বন্যার পানি ঢুকতে শুরু করেছে। ফেরার পথও ডুবে গেছে। রহিম সাঁতার জানে। গরুগুলোও পার হতে পারবে। কিন্তু ছাগল?
সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। ছোট্ট মাথায় বড় সিদ্ধান্ত। শেষ পর্যন্ত ছাগলগুলোকে অগভীর পানিতে রেখে গরুগুলো নিয়ে বাড়ি ফিরল। বাবাকে নিয়ে আবার ছাগল আনতে যাবে। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। দূরে দেখা গেল পাঁচটি ছাগল পানির স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। রহিম চিৎকার করে উঠল। চোখ ভরে পানি নেমে এলো।
করিম মিয়া নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলেন। দুই হাত মাথায় দিয়ে তাকিয়ে রইলেন খোলা আকাশের দিকে। ওই ছাগলগুলো শুধু ছাগল ছিল না; সেগুলো ছিল বড় মেয়ের বিয়ের স্বপ্ন, সংসারের আশ্রয়, ভবিষ্যতের ভরসা। সব ভেসে গেল যমুনার স্রোতে।
আরও পড়ুন
শব্দসীমার খাঁচায় কি মান হারাচ্ছে ছোটগল্প?
রাতে ঘরে খাবার নেই। বড় মেয়ে চুপচাপ চৌকিতে শুয়ে কাঁদছে। ছোট দুই মেয়ে ভাতে দুটি আলু দিয়ে রান্না করছে। সেদিন রাতের খাবার ছিল শুধু আলুভর্তা আর নীরব কান্না। বাইরে তখনো যমুনার পানি বইছে। আর ভেতরে ভেঙে যাচ্ছে তাদের হৃদয়।
সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখা গেল, বন্যার পানি ঘরে ঢুকে পড়েছে। উঠান যেন নদীতে পরিণত হয়েছে। আধাভাঙা টিনের ঘরটাও হয়তো দুপুরের আগেই নদীগর্ভে চলে যাবে। থালা-বাসন, কিছু কাপড় আর শেষ সম্বল গরু নিয়ে সবাই রওয়ানা দিলো আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে। করিম মিয়া বাপ-দাদার ভিটা ছেড়ে যেতে রাজি নন। চোখের জল মুছতে মুছতে বললেন, ‘হে আল্লাহ, আমাগো ঘরটা রাইখা দিও। সব নিছো, এইটুকু আর নিয়ো না।’বড় মেয়ে রহিমা বাবার হাত ধরে বলল, ‘আব্বা, আহেন। আগে জীবন বাঁচাই। নদী তো সবই লইয়া গেল।’ করিম মিয়া মাটিতে বসে পড়লেন, ‘আমি যামু না রে মা। এই ভিটা ছাইড়া কই যামু?’
শেষ পর্যন্ত দুই মেয়ে আর ছেলে মিলে তাকে টেনে নিয়ে গেল। করিম মিয়ার আর্তনাদে যেন আকাশও ভারী হয়ে উঠল। কেউ কলাগাছের ভেলা বানিয়েছে। কেউ শিশু কাঁধে নিয়ে হাঁটছে। কারো মাথায় চালের বস্তা। কেউ শুধু শূন্য হাতে।
আরও পড়ুন
কবরের লাশ চুরি ঠেকাতে প্রতি রাতে গ্রামবাসীর পাহারা
করিম মিয়া কয়েকবার পেছনে তাকালেন। বাড়িটা তখনো দাঁড়িয়ে। মনে হচ্ছিল, হয়তো বেঁচে যাবে। দুপুরের আগেই খবর এলো– ঘরটা নেই। সব নদীতে চলে গেছে। করিম মিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। তারপর মাথা নিচু করে বললেন, ‘নদী ঘর নেয়, মানুষরে না। মানুষ আবার ঘর বানায়।’
বড় মেয়ে বাবার দিকে তাকাল। প্রথমবারের মতো সে বুঝল–সব হারিয়েও মানুষ বেঁচে থাকে। কারণ নদী ভিটা ভাঙতে পারে কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকার ইচ্ছা ভাঙতে পারে না। সেই ইচ্ছে নিয়েই মানুষ বেঁচে থাকে, নতুন করে গড়ার স্বপ্ন দেখে।
এসইউ