
প্রতিষ্ঠার পর গত ৭৮ বছরে উত্তর কোরিয়া যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার মধ্য দিয়ে গেছে। তারপরও শাসনব্যবস্থার পতন হয়নি। বরং বর্তমান নেতা কিম জং–উনের হাতে ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত হয়েছে। পারমাণবিক অস্ত্র, কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও চীন–রাশিয়ার সহায়তা দেশটিকে টিকে থাকার নতুন শক্তি দিয়েছে। আজ ৯ সেপ্টেম্বর উত্তর কোরিয়ার ৭৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে জেনে নেওয়া যাক দেশটির উত্থান–পতনের নানা কাহিনি।
১৯৪৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় উত্তর কোরিয়া। এরপর কেটে গেছে ৭৮ বছর। এ সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙেছে, পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক শাসন বিলুপ্ত হয়েছে এবং চীন বাজার অর্থনীতির পথে অনেক দূর এগিয়েছে। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থা টিকে আছে প্রায় একইভাবে।
উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাও একটি পরিবারের বাইরে যায়নি। প্রথমে কিম ইল–সুং, পরে তাঁর ছেলে কিম জং–ইল এবং এখন নাতি কিম জং–উন—তিন প্রজন্ম ধরে উত্তর কোরিয়া শাসন করছে কিম পরিবার।
এই ৭৮ বছরে উত্তর কোরিয়া যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার মধ্য দিয়ে গেছে। তারপরও শাসনব্যবস্থার পতন হয়নি। বরং বর্তমান নেতা কিম জং–উনের হাতে ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত হয়েছে। পারমাণবিক অস্ত্র, কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও চীন–রাশিয়ার সহায়তা দেশটিকে টিকে থাকার নতুন শক্তি দিয়েছে।
কিম ইল–সুংয়ের শাসনে নেতাকে ঘিরে প্রবল ব্যক্তিপূজাও গড়ে ওঠে। রাষ্ট্রের ইতিহাস, স্বাধীনতা, যুদ্ধ ও উন্নয়নের সব সাফল্যের কেন্দ্রে তাঁকে রাখা হয়। এভাবে কিম পরিবারের শাসনকে শুধু রাজনৈতিক ব্যবস্থা নয়, উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অংশে পরিণত করা হয়।
১৯১০ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত কোরীয় উপদ্বীপ জাপানের অধীন ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের পর কোরিয়াকে সাময়িকভাবে দুই ভাগে ভাগ করে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। ৩৮তম অক্ষরেখার উত্তরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও দক্ষিণে যুক্তরাষ্ট্র প্রভাব বিস্তার করে।
এই সাময়িক বিভাজন পরে স্থায়ী রূপ নেয়। উত্তরে সোভিয়েত–সমর্থিত কিম ইল–সুং এবং দক্ষিণে যুক্তরাষ্ট্র–সমর্থিত সিংম্যান রি ক্ষমতায় আসেন। ১৯৪৮ সালে দুই অংশে দুটি আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। উত্তর অংশের নাম হয় ডেমোক্রেটিক পিপলস রিপাবলিক অব কোরিয়া বা উত্তর কোরিয়া।
দুই রাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষই পুরো কোরীয় উপদ্বীপের বৈধ সরকার বলে নিজেদের দাবি করেছিল। ১৯৫০ সালের জুনে উত্তর কোরিয়ার বাহিনী দক্ষিণ কোরিয়ায় হামলা চালায়। শুরু হয় কোরীয় যুদ্ধ।
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনী দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষে যুদ্ধে নামে। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেয় চীন। ১৯৫৩ সালে যুদ্ধবিরতি হয়। তবে দুই কোরিয়ার মধ্যে কোনো পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি হয়নি। থেকে যায় উপদ্বীপের বিভাজনও।
কিম ইল–সুং উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রথম নেতা। তিনি ১৯৪৮ থেকে ১৯৯৪ সালে মৃত্যুর আগপর্যন্ত দেশটি শাসন করেন।
কিম ইল–সুংয়ের সময়েই উত্তর কোরিয়ায় একদলীয় ও অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠে। রাষ্ট্র, ক্ষমতাসীন ওয়ার্কার্স পার্টি, সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তাব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ ক্রমে একজন নেতাকে ঘিরে সাজানো হয়।
কিম ইল–সুং ‘জুচে’ বা নিজ শক্তির ওপর নির্ভর করার রাজনৈতিক ধারণা সামনে আনেন। এ ধারণার মূলকথা ছিল, উত্তর কোরিয়া রাজনীতি, অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষায় নিজের পথ অনুসরণ করবে। তবে বাস্তবে দেশটি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল।

কিম ইল–সুংয়ের শাসনে নেতাকে ঘিরে প্রবল ব্যক্তিপূজাও গড়ে ওঠে। রাষ্ট্রের ইতিহাস, স্বাধীনতা, যুদ্ধ ও উন্নয়নের সব সাফল্যের কেন্দ্রে তাঁকে রাখা হয়। এভাবে কিম পরিবারের শাসনকে শুধু রাজনৈতিক ব্যবস্থা নয়, উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অংশে পরিণত করা হয়।
রাষ্ট্রের ক্ষমতার পাশাপাশি উত্তরসূরি তৈরির কাজও কিম ইল–সুং নিজের জীবনকালেই শুরু করেন। তাঁর ছেলে কিম জং–ইলকে ধীরে ধীরে দল, রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদে আনা হয়। ফলে ১৯৯৪ সালে কিম ইল–সুংয়ের মৃত্যুর পর প্রথমবারের মতো উত্তর কোরিয়ায় পিতা থেকে ছেলের হাতে ক্ষমতা যায়।
কিম জং–ইল এমন একসময় ক্ষমতা নেন, যখন উত্তর কোরিয়া গভীর সংকটে ছিল। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর উত্তর কোরিয়া গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সহায়তা ও বাণিজ্যের সুযোগ হারায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ।
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি উত্তর কোরিয়ায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ঠিক কত মানুষ মারা গিয়েছিল, তার নিশ্চিত হিসাব নেই। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের হিসাবে, দুর্ভিক্ষে প্রায় ১০ লাখ মানুষ মারা গিয়ে থাকতে পারে। খাদ্যের সন্ধানে কয়েক লাখ মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে চীনে চলে যায়।
এত বড় মানবিক বিপর্যয়ের পরও শাসনব্যবস্থার পতন হয়নি। কিম জং–ইল ‘সামরিক বাহিনী প্রথম’ নীতি গ্রহণ করেন। এতে রাষ্ট্রের সীমিত সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। সামরিক বাহিনী একই সঙ্গে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও কিম পরিবারের শাসন রক্ষার প্রধান শক্তি হয়ে ওঠে।
কিম জং–ইলের সময়েই উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্রের পথে দ্রুত এগোয়। দেশটি ২০০৩ সালে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। ২০০৬ সালে প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়। এরপর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
অর্থনৈতিক সংকট ও দুর্ভিক্ষ উত্তর কোরিয়াকে দুর্বল করেছিল। কিন্তু পারমাণবিক কর্মসূচি দেশটির নিরাপত্তাকৌশল বদলে দেয়। বাইরের শক্তির সামরিক হস্তক্ষেপ ঠেকাতে পারমাণবিক অস্ত্রকে সবচেয়ে বড় নিশ্চয়তা হিসেবে দেখতে শুরু করে পিয়ংইয়ং।
কিম জং–ইল ২০১১ সালের ডিসেম্বরে মারা যান। এরপর তাঁর ছেলে কিম জং–উন ক্ষমতায় আসেন। তখন তাঁর বয়স কম এবং রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতাও সীমিত ছিল। ফলে তিনি ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবেন কি না, তা নিয়ে দেশের বাইরে প্রশ্ন ছিল।
কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই কিম জং–উন দল, সরকার ও সেনাবাহিনীর ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর সময়েই উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি অনেক দ্রুত এগিয়েছে।
উত্তর কোরিয়া ২০০৬ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ছয়টি পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়েছে। এর মধ্যে চারটি হয়েছে কিম জং–উনের শাসনে। ২০১৭ সালের সর্বশেষ পরীক্ষাটি আগের সব পরীক্ষার তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল।
২০১৮ সালে কিম জং–উন কূটনীতির দিকে এগোন। তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মুন জে–ইন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেন। ট্রাম্প ও কিমের প্রথম বৈঠক হয় ২০১৮ সালের জুনে সিঙ্গাপুরে।
এ দুই নেতার দ্বিতীয় বৈঠক হয় ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে হ্যানয়ে। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে কোনো চুক্তি ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়। এরপর আলোচনা আর এগোয়নি।
কিম জং–উনের সরকার এখন বলছে, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রধর রাষ্ট্রের মর্যাদা বদলানো যাবে না। ২০২২ সালে দেশটি নতুন পারমাণবিক নীতি আইনে পরিণত করে। সেই আইনে কিম জং–উনকে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের একক ক্ষমতা দেওয়া হয়।
কিম জং–উনের শাসনের শুরুতে অনেকেই মনে করেছিলেন, তাঁর ক্ষমতা হয়তো দল ও সেনাবাহিনীর প্রবীণ নেতাদের ওপর নির্ভরশীল থাকবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তিনি নিজের কর্তৃত্ব বাড়িয়েছেন।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ওয়ার্কার্স পার্টির নবম কংগ্রেসে দলের নিয়মে পরিবর্তন আনা হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন অনুযায়ী, নতুন নিয়মে গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা নিয়োগ ও অপসারণ, দলের বৈঠক ডাকা এবং বিভিন্ন বিভাগ ভেঙে দেওয়ার স্পষ্ট ক্ষমতা কিম জং–উনকে দেওয়া হয়েছে।
নতুন নিয়মে কিম ইল–সুং ও কিম জং–ইলের কাজের উল্লেখও বাদ দেওয়া হয়েছে। এর পরিবর্তে বর্তমান নেতা কিম জং–উনের ভূমিকা সামনে আনা হয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি একে ‘কিম জং–উন যুগ ২.০’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
উত্তর কোরিয়ার মানুষ কী জানতে পারবেন, কোথায় যেতে পারবেন এবং কীভাবে জীবন কাটাবেন—তার ওপর রাষ্ট্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। স্বাধীন গণমাধ্যম নেই। বিদেশি খবর ও বিনোদনের ওপরও কঠিন বিধিনিষেধ আছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলেছে, আগের ১০ বছরে উত্তর কোরিয়ার মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি; বরং নজরদারি, বাধ্যতামূলক শ্রম ও কঠোর শাস্তির ব্যবহার বেড়েছে। বিদেশি টেলিভিশন অনুষ্ঠান ছড়িয়ে দেওয়ার মতো অপরাধেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
অর্থনৈতিক সংকট ও দুর্ভিক্ষ উত্তর কোরিয়াকে দুর্বল করেছিল। কিন্তু পারমাণবিক কর্মসূচি দেশটির নিরাপত্তাকৌশল বদলে দেয়। বাইরের শক্তির সামরিক হস্তক্ষেপ ঠেকাতে পারমাণবিক অস্ত্রকে সবচেয়ে বড় নিশ্চয়তা হিসেবে দেখতে শুরু করে পিয়ংইয়ং।
প্রতিবেদনটি উত্তর কোরিয়া থেকে পালিয়ে যাওয়া তিন শতাধিক ব্যক্তি ও প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়। উত্তর কোরিয়া এ ধরনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা সংস্থার নজরদারি এবং কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা উত্তর কোরিয়ায় বিরোধী শক্তি গড়ে ওঠার সুযোগ খুবই সীমিত করে রেখেছে। কিম পরিবারের শাসনও টিকে থাকার পেছনে এটি বড় একটি কারণ।
উত্তর কোরিয়ার সাধারণ মানুষের জীবন এখনো কঠিন। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির হিসাবে, দেশটির ১ কোটি ৭ লাখ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় প্রতি পাঁচ শিশুর একজনের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। চাষযোগ্য জমির স্বল্পতা, আধুনিক কৃষিযন্ত্র ও সারের অভাব ও বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশটিতে প্রয়োজনের তুলনায় কম খাদ্য উৎপাদিত হয়।
এরপরও সাম্প্রতিক সময়ে উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতিতে কিছুটা প্রবৃদ্ধি হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ সালে উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। এ নিয়ে টানা তিন বছর দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের বেশি হলো।
রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য, রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন প্রকল্প ও অস্ত্রের চাহিদা এ প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। তবে উত্তর কোরিয়া নিজে নিয়মিত অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করে না। তাই দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা ও বাণিজ্য তথ্যের ভিত্তিতে এসব হিসাব তৈরি করা হয়।

দীর্ঘদিন ধরে উত্তর কোরিয়ার প্রধান অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহায়তাকারী চীন। ২০২৫ সালে দেশটির বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯৮ শতাংশই ছিল চীনের সঙ্গে।
কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক দ্রুত বদলে গেছে। পিয়ংইয়ং রাশিয়াকে বিপুল অস্ত্র ও সেনাসদস্য দিয়েছে। বিনিময়ে উত্তর কোরিয়া অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা পাচ্ছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে।
২০২৪ সালে দুই দেশ একটি ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি করে। সম্প্রতি রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে প্রথম সড়কসেতুও চালু হয়েছে। এর আগে দুই দেশের মধ্যে রেল ও বিমান যোগাযোগ ছিল। নতুন সেতুটি দুই দেশের ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে উঠেছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘৩৮ নর্থ’–এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাশিয়াকে সহায়তার মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া অর্থ, জ্বালানি, খাদ্য, সামরিক প্রযুক্তি ও আধুনিক যুদ্ধের বাস্তব অভিজ্ঞতা পাওয়ার চেষ্টা করছে। মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়ে চীনের ওপর একক নির্ভরতাও কমাতে চাইছে দেশটি।
উত্তর কোরিয়ার ৭৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে কিম জং–উনকে অভিনন্দন জানিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
সি বলেছেন, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা চীনের ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের অবিচল নীতি। অন্যদিকে পুতিন দুই দেশের ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করতে কিমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার কথা বলেছেন।
দুই নেতার বার্তা উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাসীন ওয়ার্কার্স পার্টির পত্রিকা ‘রোডং সিনমুন’-এর প্রথম পাতায় প্রকাশিত হয়েছে।
একই দিনে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা জানিয়েছে, ইয়ংবিয়নের প্রধান পারমাণবিক কেন্দ্রে উত্তর কোরিয়া নতুন একটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা তৈরি করেছে। সেখানে ২৮টি পর্যন্ত সেন্ট্রিফিউজ ক্যাসকেড রাখার জায়গা থাকতে পারে। সংস্থাটি বলেছে, একাধিক স্থানে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অবকাঠামোর ধারাবাহিক বিস্তারের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
উত্তর কোরিয়ার ৭৮ বছরের ইতিহাস থেকে শাসনব্যবস্থাটি টিকে থাকার কয়েকটি কারণ স্পষ্ট হয়।
প্রথমত, কিম পরিবারের নেতৃত্বকে রাষ্ট্রের ইতিহাস ও পরিচয়ের সঙ্গে এক করে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, দল, সরকার, সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা সংস্থাকে একই নেতৃত্বের অধীন রাখা হয়েছে।
তৃতীয়ত, তথ্যের প্রবাহ ও সাধারণ মানুষের চলাচলের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা হয়েছে। চতুর্থত, পারমাণবিক অস্ত্রকে বাইরের সামরিক হস্তক্ষেপ ঠেকানোর প্রধান উপায় হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে।
পঞ্চমত, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী কখনো সোভিয়েত ইউনিয়ন, কখনো চীন এবং এখন রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাচ্ছে পিয়ংইয়ং।
তিন প্রজন্মে উত্তর কোরিয়ার চারপাশের বিশ্ব অনেক বদলেছে। কিন্তু কিম পরিবারের শাসনের মূলভিত্তি—কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা, সামরিক শক্তি, কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও শক্তিশালী প্রতিবেশীর সহায়তা রয়েছে এখনো অটুট। প্রতিষ্ঠার ৭৮ বছর পরও উত্তর কোরিয়ার টিকে থাকার মূল ব্যাখ্যা সম্ভবত এখানেই।
{তথ্যসূত্র: রয়টার্স, আল-জাজিরা, জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা, ৩৮ নর্থ ও ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজি}