পরিবারে সচ্ছলতা ফেরাতে তিন বছর আগে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা ধারদেনা করে সৌদিআরব যান ফজলু মন্ডল (৩১)। কিন্তু ঋণ পরিশোধ করার আগেই চারতলা থেকে পড়ে মেরুদন্ড ভেঙে বৃদ্ধ মা-বাবার বোঝা হয়ে দেশে ফিরতে হয়েছে ফজলুকে।
অর্থাভাবে ফজলু সুচিকিৎসা করাতে পারেনি। বর্তমানে স্ত্রী ও ছোট দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় কাটছে তার দিনযাপন। এ অবস্থায় সমাজের বিত্তবান এবং জনপ্রতিনিধিসহ সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন অসুস্থ ফজলুসহ তার পরিবার ও এলাকাবাসী।
ফজলু মন্ডল রাজবাড়ী কালুথালীর মৃগী ইউনিয়নের ছোট কলকলিয়া গ্রামের চা-দোকানি মোজাম মণ্ডলের ছেলে। ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে ২০২৩ সালের জুলাই মাসে সাড়ে ৪ লাখ টাকা খরচ করে তিনি সৌদিআরব যান। ওখানে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করতে গিয়ে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে চারতলা ভবনের ওপর থেকে নিচে পড়ে গিয়ে মেরুদণ্ড ভেঙে যায় ফজলুরের। পরবর্তীতে ওই দেশের একটি হাসপাতালে তার অপারেশন হলেও সঠিক তদারকি ও অর্থের অভাবে হয় নাই যথাযথ চিকিৎসা।
এভাবে প্রায় ৬ মাস হাসপাতালে শয্যাশায়ী থাকার পর রাজবাড়ী জেলা গণঅধিকার পরিষদ নেতা স্থানীয় বসির আহম্মেদের মাধ্যমে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের বিশেষ হস্তক্ষেপে সরকারি ব্যবস্থাপনায় সম্পূর্ণ বিনা খরচে ২৮ আগস্ট দেশে ফিরে আসেন ফজলু। বর্তমানে শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে অন্যের সাহায্য ছাড়া নড়াচড়া করতে পারেন না তিনি। এ অবস্থায় স্ত্রী ও ছোট দুই সন্তানকে নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন এই প্রবাস ফেরত যুবক।
এদিকে প্রবাস জীবনের তিন বছরে ঋণ পরিশোধ করেছেন মাত্র ৩ লাখ টাকা। ফলে বাকী ঋণ পরিশোধ ও জীবিকার তাগিদে ঢাকার একটি গার্মেন্টেসে কাজ নিয়েছেন তার স্ত্রী। আর তিনি ঠাঁই নিয়েছেন বৃদ্ধ মা-বাবার কাছে। বাবার ছোট চায়ের দোকানের আয় দিয়ে পরিবারের খরচ চালানো দায়, এ অবস্থায় তার চিকিৎসা পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হয়ে ওঠার কিছুটা সম্ভাবনা থাকলেও চরম অর্থসংকটে থমকে গেছে তার চিকিৎসা। পাশাপাশি তার স্ত্রী-সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন ফজলু মন্ডল।
অপরদিকে নীতিমালার মধ্যে থাকলে তাকে সহায়তা করতে পারবে বলে জানান রাজবাড়ী জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক।
রাজবাড়ী জেলা গণঅধিকার পরিষদের সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব বসির আহম্মেদ বলেন, অর্থের অভাবে ফজলু মন্ডল দেশে ফিরতে পারছিলেন না। বিষয়টি জানতে পেরে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের হস্তক্ষেপে দেড় মাসের চেষ্টায় তাকে সম্পূর্ণ বিনা খরচে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের মাধ্যমে সরকারি আর্থিক সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। সঠিক ও উন্নত চিকিৎসা পেলে ফজলু সুস্থ হয়ে আবারও জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন বলে আশা করছি।
ফজলু মণ্ডলের মা ও বাবা বলেন, অনেক আশা ভরসা নিয়ে ধারদেনা করে বিদেশে গিয়েছিল ছেলেটা। কিন্তু ফিরে এলো মাজা ভেঙে। ঢাকা থেকে তাকে বাড়িতে আনার মতো টাকাও আমাদের ছিল না, অন্যের কাছ থেকে চেয়েচিন্তে গাড়ি ভাড়া করে এনেছি। আমাদেরই সংসার চলে না, ছেলেকে চিকিৎসা করাবো কীভাবে।
ফজলুর বাবা-মা অসুস্থ, এক বেলা ভালো থাকেন তো অন্য বেলা খারাপ। সরকার, এমপি-মন্ত্রী বা সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে আসলে ফজলুর চিকিৎসা করা সম্ভব।
অসুস্থ ফজলু মন্ডল বলেন, সৌদিআরবে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করার সময় প্রায় ছয় মাস আগে চারতলা থেকে পড়ে আমার মেরুদণ্ড ভেঙে যায়। বিদেশে অপারেশন হলেও অর্থের অভাবে সেখানে কোনো চিকিৎসা পাইনি। পরে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের হস্তক্ষেপে সরকারি ব্যবস্থায় বিনা খরচে দেশে ফিরে আসি।
তিনি আরও বলেন, দেশে ফিরলেও আমার পরিবারের আমাকে চিকিৎসা করানোর মতো কোনো অর্থ-সম্পদ নেই। এখন প্রায় দুই লাখ টাকা ঋণগ্রস্ত হয়েছি। অন্যের সাহায্য ছাড়া সামান্য নড়াচড়াও করতে পারি না, আমি পুরোপুরি অচল হয়ে গেছি। সংসারের খরচ চালাতে না পারায় বাধ্য হয়ে আমার স্ত্রী গার্মেন্টসে চাকরি নিয়ে, সংসার ও দুই সন্তানের দায়িত্ব সামলাচ্ছে। আমি এভাবে বোঝা হয়ে থাকতে চাই না, সুস্থ হয়ে কাজ করে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে চাই। চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার জন্য আমি সরকার এবং বিত্তবানদের সহায়তা ও হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
রাজবাড়ী জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক আবু সালেহ মোহাম্মদ আলী আহসান বলেন, নীতিমালার মধ্যে থাকলে তাকে আমরা সহায়তা করতে পারবো।
রুরবেলুর রহমান/কেজে/জেআইএম