মক্কা তখন অন্ধকারে ঢাকা। কাবাঘরকে ঘিরে অসংখ্য মূর্তি। লাত, উজ্জা, মানাতসহ নানা দেব-দেবীর নামে মানুষ সিজদা করছে। কাবার আঙিনা মুখরিত। সেই কোলাহলের ভেতর হারিয়ে গেছে ইবরাহিম (আ.) এর তাওহিদের সেই নির্মল আহ্বান।
সেই সময় মক্কার এক কোণে জন্ম নিল আরেকটি নীরব বিপ্লব।
কয়েকজন মানুষ বিশ্বাস করল যে, উপাসনার যোগ্য একমাত্র আল্লাহ। মুহাম্মদ (সা.) তাঁর রাসুল। মানুষের তৈরি কোনো মূর্তি নয়, কোনো দেবতা নয়, কোনো ক্ষমতাবান নেতা নয়; মাথা নত করতে হবে শুধু আল্লাহর সামনে।
কিন্তু সত্যের এই ঘোষণা মক্কার নেতারা সহজভাবে মেনে নিল না।
নতুন মুসলমানদের ওপর শুরু হলো নির্যাতন। কাউকে বালুর ওপর শুইয়ে রাখা হচ্ছে। কাউকে উত্তপ্ত পাথরের নিচে চাপা দেওয়া হচ্ছে। কারও ওপর সামাজিক বয়কট, কারও ওপর পারিবারিক নির্যাতন। মুসলমানদের সংখ্যা অল্প। তাদের কোনো রাষ্ট্র নেই, কোনো সেনাবাহিনী নেই, কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতা নেই।
এমনকি তাদের নামাজও পড়তে হতো গোপনে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং তাঁর সাহাবিরা এমন জায়গা খুঁজে নিতেন, যেখানে মুশরিকদের চোখ এড়িয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো যায়।
কাবাঘর, যে ঘরটি ইবরাহিম (আ.) এক আল্লাহর ইবাদতের জন্য নির্মাণ করেছিলেন, সেখানেই মুসলমানরা প্রকাশ্যে নামাজ পড়তে পারছিলেন না!
আরও পড়ুন
ইসলাম-পূর্ব যুগে কেমন ছিলেন ওমর (রা.)?
ওমরের (রা.) ইসলাম গ্রহণ
ওমর (রা.) তখনও মুসলমান হননি। বরং তিনি ছিলেন ইসলামের অন্যতম কঠোর বিরোধী। তার শক্তি, সাহস, ব্যক্তিত্ব সবকিছুই কুরাইশের কাছে পরিচিত। মুসলমানদের ওপর তার কঠোরতার কথাও মক্কার মানুষ জানত।
কিন্তু মানুষের পরিকল্পনার ওপরে আল্লাহর পরিকল্পনা থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ! এই দুই ব্যক্তির মধ্যে যে তোমার কাছে অধিক প্রিয়, তার মাধ্যমে ইসলামকে শক্তিশালী করো—আবু জাহল অথবা ওমর ইবনুল খাত্তাব।’ (জামে তিরমিজি, কিতাবুল মানাকিব, হাদিস: ৩৬৮১)
আল্লাহ ওমর (রা.) এর জন্য হিদায়াত নির্ধারণ করেছিলেন।
একদিন তিনি বের হলেন রাসুলুল্লাহ (সা.) কে হত্যা করার উদ্দেশ্যে। হাতে তরবারি। মনে প্রচণ্ড ক্ষোভ। কিন্তু পথেই জানতে পারলেন, তার নিজের বোন ফাতিমা (রা.) ও ভগ্নিপতি সাঈদ ইবন যায়দ (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেছেন।
ক্রোধের আগুন আরও জ্বলে উঠল।
তিনি বোনের বাড়িতে পৌঁছালেন। সেখানে কোরআনের আয়াত পাঠ করা হচ্ছিল। ওমর (রা.) তা শুনলেন। প্রথমে ক্রোধ, তারপর বিস্ময়, এরপর সেই আয়াতের শব্দ তার হৃদয়ের দরজায় আঘাত করতে লাগল।
তিনি পড়লেন সূরা ত্ব-হার শুরু অংশ।
‘ত্বা-হা। আমি তোমার ওপর কুরআন নাজিল করিনি, যাতে তুমি দুর্ভোগে পড়ো…’ (সুরা ত্ব-হা: ১–৮)
যে হৃদয় কিছুক্ষণ আগেও মুহাম্মদ (সা.) কে হত্যা করার জন্য উত্তপ্ত ছিল, সেই হৃদয়েই এবার অন্য এক আলো প্রবেশ করল।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘মুহাম্মদ কোথায়?’
তাকে বলা হলো, দারুল আরকামে।
ওমর (রা.) সেখানে গেলেন।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন ওমর। তার হাতে তরবারি। ভেতরের সাহাবিরা আতঙ্কিত হয়ে গেলেন। কিন্তু হামজা (রা.) বললেন, ওমর এসেছে তো কী হয়েছে? ভালো উদ্দেশ্যে এলে ভালোভাবে গ্রহণ করা হবে; আর খারাপ উদ্দেশ্যে এলে তার নিজের তরবারিই তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে। (ইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নববিয়্যাহ)
অবশেষে ওমর (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সামনে দাঁড়ালেন।
তিনি কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ করলেন।
আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে দারুল আরকাম মুখর হয়ে উঠল।
একজন ভয়ংকর বিরোধী মুহূর্তেই হয়ে গেলেন ইসলামের সৈনিক।
‘আমরা কি সত্যের ওপর নই?’
ইসলাম গ্রহণের পর ওমর (রা.) রাসুলুল্লাহকে (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমরা কি সত্যের ওপর নই?’
রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘অবশ্যই।’
ওমর (রা.) আবার বললেন, ‘তাহলে আমরা আমাদের দ্বীন গোপন করব কেন?’
ওমরের (রা.) ইসলাম গ্রহণের পর মুসলমানদের আত্মবিশ্বাস অনেকে বেড়ে গিয়েছিল। অন্য সাহাবিরাও ভাবছিলেন, আমরা আর লুকিয়ে থাকবো কেন? মুশরিকরা প্রকাশ্যে দেব-দেবীদের পূজা করে, আমরা কেন প্রকাশ্যে আল্লাহর ইবাদত করতে পারবো না?
মুসলমানদের প্রকাশ্যে নামাজ আদায়
একদিন মুসলমানরা বেরিয়ে পড়লেন। তারা এগিয়ে গেলেন কাবার দিকে। মুসলমানরা দুই কাতারে বিভক্ত হয়ে চলছিলেন। এক কাতারের সামনে ছিলেন হজরত হামজা (রা.), অন্য কাতারের সামনে ছিলেন হজরত ওমর (রা.)। মাঝখানে ছিলেন আল্লাহর রাসুল (সা.)।
যে মুসলমানরা এতদিন নিজেদের ইমানও গোপন করতেন, তারাই আজ প্রকাশ্যে আল্লাহর ঘরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।
মুশরিকরা তাকিয়ে আছে। তাদের চোখে বিস্ময়। যে মানুষগুলোকে তারা এতদিন দুর্বল ভেবেছিল, আজ তারা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর সেই সারির সামনে ওমর। অন্য পাশে হামজা। দুই পাশে দুই পাহাড়ের মতো সাহাবি।
মুসলমানরা মসজিদুল হারামে প্রবেশ করলেন। তারপর কাবার সামনে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করলেন। এই নামাজের মধ্যে ছিল এক গভীর বার্তা: আমরা আল্লাহ ছাড়া কারও সামনে মাথা নত করব না।
এটি ছিল ভয়কে অতিক্রম করার নামাজ। এটি ছিল তাওহিদের প্রকাশ্য ঘোষণা। এটি ছিল মক্কার মূর্তিপূজার সংস্কৃতির সামনে ইসলামের প্রথম দৃশ্যমান আত্মপ্রকাশের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত।
মুশরিক নেতারা এই দৃশ্য দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল।
যে মুসলমানদের তারা এতদিন নির্যাতন করে এসেছে, আজ তারা তাদের চোখের সামনে কাবার সামনে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ছে।
মুসলমানদের মধ্যে ওমরের (রা.) এর উপস্থিতি তাদের জন্য আরও যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠেছিল।
কেন ওমর এত গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন?
ওমর শুধু একজন নতুন মুসলমান ছিলেন না। তিনি ছিলেন কুরাইশের পরিচিত একজন শক্তিশালী মানুষ। তার ইসলাম গ্রহণের অর্থ ছিল, মুহাম্মাদের (সা.) অনুসারীরা আর শুধু নির্যাতিত কয়েকজন দুর্বল মানুষের দল নয়। তাদের মধ্যে এখন ওমর আছে। আছে হামজা। আছে আবু বকর। আছে ওসমান। আছে আরও অনেক সাহাবি; যারা সত্যের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত।
ওমরের (রা.) এর ইসলাম গ্রহণ তাই মুসলমানদের মানসিক শক্তিতে বড় পরিবর্তন এনেছিল।
ইবন মাসউদ (রা.) এর ভাষায়, ওমর (রা.) ইসলাম গ্রহণ করার পর থেকে মুসলমানরা শক্তি ও মর্যাদা অনুভব করেছিলেন।
এই কারণেই পরবর্তী সময়ে ওমর (রা.) কে আল-ফারুক বলা হয়; যিনি সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করেন। (তারিখুল খুলাফা: পৃ. ৯১–৯২)
আরও পড়ুন
খলিফা ওমরের (রা.) জনমুখী শাসনের গল্প
এই ঘটনার শিক্ষা কী?
মক্কার সেই ঘটনার দিকে তাকালে আমরা দেখি ইমানের শক্তি। ওমর (রা.) ইসলাম গ্রহণের আগে ছিলেন ইসলামের বিরুদ্ধে। কিন্তু ইসলাম যখন তার হৃদয়ে প্রবেশ করল, তখন তিনি সত্যের জন্য নিজের সব শক্তি নিয়োজিত করলেন।
তার ইসলাম গ্রহণের ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, কোনো মানুষের বর্তমান অবস্থাকে দেখে তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যায় না। যে মানুষটি একদিন ইসলামের বিরুদ্ধে তরবারি হাতে বেরিয়েছিলেন, তিনিই একদিন ইসলামের জন্য তরবারি হাতে দাঁড়ালেন। যে মানুষটি রাসুলুল্লাহ (সা.) এর বিরোধিতা করতে চেয়েছিলেন, তিনিই পরে তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সাহাবিদের একজন হয়ে উঠলেন। যে মানুষটি মুসলমানদের ভয় দেখাতেন, তিনিই মুসলমানদের সাহস ও আত্মবিশ্বাসের কারণ হয়ে দাঁড়ালেন।
মক্কার সেই দিনের নামাজ ইসলামের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। কাবার সামনে দাঁড়িয়ে অল্পসংখ্যক মুসলমান যেন সেদিন ঘোষণা করেছিলেন, সংখ্যা কম হতে পারে, শক্তি কম হতে পারে; কিন্তু সত্যের শক্তি কম নয়।
আর সেই কাতারের সামনে ছিলেন ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)।
ওএফএফ