সেপ্টেম্বরের এই সময়ে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেটের দলের ব্যস্ত থাকার কথা ছিল ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ নিয়ে; কিন্তু ভারতের বাংলাদেশ সফর আরেক দফা পিছিয়েছে। তাতে কি! লিটন-শান্তদের ব্যস্ততার অভাব নেই। চলতি মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকা সফর। দুই মাসের বেশি সময় টানা খেলায় ব্যস্ত থাকতে হবে টাইগারদের।
টানা খেলা থাকলে টিম ম্যানেজমেন্টকে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত থাকতে হয় পেসারদের নিয়ে। তাদের ওয়ার্কলোড ম্যানেজ করা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেওয়া, চোট থেকে রক্ষা করা সবকিছুই চোখে চোখে রাখতে হয়। সেখানে বাংলাদেশের মূল বোলার নাহিদ রানাই এখন চোট থেকে সেরে ওঠার যুদ্ধে রয়েছেন। পাইপলাইনে থাকা একাধিক পেসারও আছেন চোটে। ফলে আগামী দুইমাস পেসারদের ম্যানেজ করা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে টিম ম্যানেজমেন্টের জন্য।
এশিয়ান গেমসে এবার টি-টোয়েন্টি দলের মূল স্কোয়াডকেই পাঠাচ্ছে বিসিবি। ফাইনাল বা তৃতীয় স্থান নির্ধারনী ম্যাচ খেললেও অন্তত ৩ অক্টোবর পর্যন্ত জাপানেই থাকতে হবে বাংলাদেশ দলকে।
এরপর আফগানিস্তানের বিপক্ষে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশ-আফগানিস্তানের একমাত্র টেস্ট শুরু হবে ৯ অক্টোবর। অর্থাৎ জাপান থেকে আরব আমিরাতে যাওয়া ও টেস্ট শুরুর আগে হাতে থাকছে ৬ দিন। এরপর একই দেশে আফগানিস্তান ও জিম্বাবুয়ের সঙ্গে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজ। ২৩ অক্টোবর হবে সেই সিরিজের ফাইনাল।
ততক্ষণে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলতে ঢাকায় চলে আসবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ঢাকায় প্রথম টেস্ট শুরু হবে ২৮ অক্টোবর। অর্থাৎ আরব আমিরাতে ফাইনাল খেললে, দেশে ফেরার পর ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের প্রস্তুতি নিতে বাংলাদেশের হাতে সময় থাকবে মাত্র ৪ দিন।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজ শেষ হবে ৯ নভেম্বর। এর ঠিক ৬ দিন পর দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে সিরিজের প্রথম টেস্ট খেলতে নামবে টাইগাররা। অর্থাৎ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই প্রায় ৯ হাজার কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে একেবারেই ভিন্ন পরিবেশ ও কন্ডিশনে খেলতে হবে টাইগারদের। এরপর থাকবে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি সিরিজও। যে সফর শেষ হবে ১৩ ডিসেম্বর।
এমন ঠাসা সূচিতে মূল পেসারদের কিভাবে ব্যবহার করা হবে, সেটিই হতে পারে বাংলাদেশের বড় সিদ্ধান্তগুলোর একটি। তাসকিন আহমেদ, হাসান মাহমুদ, নাহিদ রানা ও শরীফুল ইসলামকে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ পর্যন্ত যতটা সম্ভব সতেজ রাখা, বিকল্পদের প্রস্তুত রাখার মতো চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে নির্বাচক ও টিম ম্যানেজমেন্টের সামনে।
আফগানিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র টেস্ট ম্যাচটি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ নয়। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালের দৌড়ে থাকা বাংলাদেশের পরের চার টেস্ট ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। ফলে আফগানদের বিপক্ষে টেস্টটাই মূলতঃ কম গুরুত্বপূর্ণ।
সেখানে হাসান মাহমুদ, তাসকিন আহমেদ, শরিফুল ইসলামের মধ্যে যে কাউকেই বিশ্রাম দেওয়া যেতে পারে। হাসান তো জাতীয় দল ছাড়াও কাউন্টি ক্রিকেটে টানা খেলার মধ্যে আছেন। এক্ষেত্রে কয়েকদিন আগেই দক্ষিণ আফ্রিকায় ‘এ’ দলের হয়ে দারুণ খেলা ও জাতীয় দলের রাডারে দীর্ঘদিন ধরে থাকা রেজাউর রহমান রাজাকে সুযোগ দিতে পারেন নির্বাচকরা।
এছাড়া মুশফিক হাসানের মতো এখনো অভিষেকের অপেক্ষায় থাকা পেসারও এই ম্যাচে খেলতে পারেন। মুশফিকের বাড়তি গতি এবং রাজার বাড়তি বাউন্স আদায়ের সামর্থ্যও কাজে লাগতে পারে। খালেদ আহমেদ এবং এবাদত হোসেনরা তো আগে থেকেই টেস্টের জন্য পরীক্ষিত। চোট সমস্যা না থাকলে তাদেরকেও কাজে লাগাতে পারে টিম ম্যানেজমেন্ট। তাছাড়া আরব আমিরাতের গরমে পেসারদের চেয়ে স্পিনারের বেশি প্রভাব ফেলার প্রবণতা তো থাকছেই।
আশা করা হচ্ছে নাহিদ রানা চোট কাটিয়ে আরব আমিরাতে ত্রিদেশীয় সিরিজ দিয়েই মাঠে ফিরবেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচ অনুশীলনের সঙ্গে ছন্দে ফেরার জন্য সেখানে রানার খেলার প্রয়োজনও আছে। এমন ঠাসা সূচির সবচেয়ে বড় সুবিধা হতে পারে বেঞ্চের পেসারদের পরখ করে নেওয়া। মূল খেলোয়াড়দের বিশ্রাম দিয়ে যদি বিকল্পদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তৈরি করা যায়, তাহলে শুধু দুই মাসের সূচিই নয়, ভবিষ্যতের জন্যও শক্তিশালী বেঞ্চ তৈরি হবে।
তবে এক্ষেত্রে নির্বাচকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, ব্যাকআপে থাকা পেসারদের চোট। ইকবাল হোসেন ইমন, রবিউল ইসলাম, তানজিম হাসান সাকিব, আব্দুল গাফফার সাকলায়েনরা চোটে ভুগছেন। রোহানাত দৌলা বর্ষণের উপর লোড বেশি পড়লে তাকেও অন্তত দেড় সপ্তাহ বিশ্রামে যেতে হয়।
বিকল্প পেসারদের চোট থাকলেও তাদের সুবিধামতো ব্যবহার করতে চান নির্বাচকরা। জাগো নিউজকে নির্বাচক প্যানেলের সদস্য নাঈম ইসলাম বলেন, ‘হ্যাঁ, আমাদের কিছু খেলোয়াড় চোটে আছে। তারা সেরে ওঠার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। তাই আমাদের কিছু অগ্রাধিকারভিত্তিক পরিকল্পনা আছে। এসব বিষয় হিসাব করে যখন যাকে প্রয়োজন হবে এবং যে যখন ফিট থাকবে, সেভাবেই আমরা তাদের খেলানোর চেষ্টা করব।’
যেহেতু একদম অক্টোবর-নভেম্বর টানা দুই মাস খেলা। এ সময়ে বিশেষ করে পেসারদের ইনজুরি হওয়ার চান্স বেশি থাকে। সেক্ষেত্রে পেসারদের কি একটু ম্যানেজ করাটা চ্যালেঞ্জিং হয়ে যাবে কি না? এমন প্রশ্নে এই নির্বাচক বলেন, ‘অবশ্যই, পেসারদের ক্ষেত্রে সবকিছুই তাদের ওয়ার্কলোডের ওপর নির্ভর করবে। আমাদের ফিজিও এবং বোলিং কোচ আছেন, তারা এ বিষয়ে ভালোভাবে সামলাচ্ছেন। তাদের ওয়ার্কলোড ঠিক রেখে আমরা খেলানোর চেষ্টা করব। বিষয়টি সবসময়ই কঠিন হবে। টানা যদি এতগুলো ম্যাচ থাকে, তাহলে এটা প্রত্যেকটি দলের জন্যই কঠিন। তাই আমরা সবকিছু ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে যতটা সম্ভব সামলে নেওয়ার চেষ্টা করব।’
আরব আমিরাত থেকে কোনো চোট নিয়ে ফিরলে সেটা বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্টের জন্য বড় মাথাব্যাথা হতে পারে। কারণ ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজেই দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের অনুশীলন ও ম্যাচ অনুশীলন সারতে হবে। মাত্র ৬ দিনের বিরতি থাকায় জোহানেসবার্গ টেস্টের আগে কোনো প্রস্তুতি ম্যাচ খেলতে পারবে না নাজমুল হোসেন শান্তর দল।
শুধু পেসার নয়, ব্যাটিংয়েও বিশ্রাম ও রোটেশনের প্রয়োজন রয়েছে। তানজিদ হাসান, লিটন দাস ও নাজমুল হোসেন শান্ত তিন ফরম্যাটেই ব্যস্ত থাকবেন। তাই সূচির মাঝে তাদেরও প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্রাম দেওয়া দরকার। বিকল্প হিসেবে অমিত হাসান, জাকের আলী, আরিফুল ইসলাম ও পারভেজ হোসেন ইমনদের ব্যবহার করা যেতে পারে। আরিফুল তো অস্ট্রেলিয়ায় টপ অ্যান্ড টেন টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টেও ভালো করেছেন।
তবে এশিয়ান গেমস শেষ হওয়ার আগে নতুন কাউকে সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে ভাবতে চান না নির্বাচকরা। নাঈম বলেন, ‘এখন প্রথমে আমাদের দল যাচ্ছে জাপানে, এশিয়ান গেমসে। আফগানিস্তানের দল নিয়ে এখনো কাজ শুরু করিনি। আমাদের মোটামুটি একটা দল আছে। সেই দল থেকে হয়তো আমরা যখন কাজ শুরু করব, তখন এসব সিদ্ধান্ত নিতে পারব।’
এসকেডি/আইএইচএস