‘ভ্যান চালায় সংসার চলে। ওর (ভ্যানের) উপরই আমরা নির্ভর। ভ্যানডা হারা গেছে। এহন আমরা চলব ক্যাম্বা (কীভাবে)। আমার চলার মতো তো আর পরিবেশ নাই। বছরের মাথায় এটা হারায়ছে। এ মাথায় এটা হারালো। এ্যাম্বা হলি চলি ক্যাম্বা?’
কথাগুলো বলছিলেন মনোয়ারা খাতুন (৫৯)। তিনি কুষ্টিয়ার কুমারখালীর যদুবয়রা ইউনিয়নের দক্ষিণ যদুবয়রা গ্রামের ভ্যানচালক আব্দুল্লাহ বিশ্বাসের (৬৬) স্ত্রী। সংসারের উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন ব্যাটারিচালিত ভ্যানটি চুরি হওয়ায় দিশাহারা হয়েছেন এই বৃদ্ধ দম্পতি।
ভোটার আইডি কার্ড অনুযায়ী আব্দুল্লাহ বিশ্বাসের বয়স ৬৬ বছর। এই বয়সে বিশ্রাম নিয়ে আরাম আয়েশে দিনযাপনের কথা তার। কিন্তু চার ছেলে সন্তান দারিদ্র ও দিনমজুর হওয়ায় ভ্যান চালিয়ে এক নাকি ও নাতিনসহ চারজনের সংসার চালাতেন। কিন্তু সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে পুলিশ পরিচয়ে যাত্রী সেজে তাকে অজ্ঞান করে উপজেলার পান্টি-যদুবয়রা সড়কের লালনবাজার এলাকা থেকে তার ভ্যানটি নিয়ে যায় চক্রটি। সম্ভাব্য সব জায়গা খোঁজাখুঁজি করেও ভ্যানের সন্ধান পাননি। পরে মঙ্গলবার তিনি কুমারখালী থানায় লিখিত অভিযোগ করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আব্দুল্লাহ বিশ্বাসের মেঝে পাকা দুই কক্ষবিশিষ্ট টিনশেড ঘরে স্ত্রী, সন্তান, এক নাতি ও এক নাতিনসহ চারজনের বসবাস। প্রায় এক বছর আগে নিজ বাড়ি থেকে একটি ভ্যান চুরির ঘটনা ঘটে। এরপর দুটি এনজিও থেকে প্রায় ৬০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে নতুন একটি ভ্যান কিনেছিলেন। কিন্তু বছর পার না হতেই আবারও তার উপার্জনের একমাত্র অবলম্বনটি চুরি হয়ে গেছে।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে আব্দুল্লাহ বিশ্বাসের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, সড়কের ধারে টিনশেডে চৌচালা মেঝে পাকা ঘর। ঘরটির সামনে ভ্যানটি রাখার স্থান করা হয়েছে। কিন্তু ভ্যানটি নেই। ভ্যানের চার্জার নিয়ে বারান্দায় বসে আছেন বৃদ্ধ দম্পতি। তাদের চোখেমুখে হতাশার ছাপ।
এসময় মনোয়ারা খাতুন বলেন, ‘ভ্যানই আমারে সম্বল ছিল। কিন্তু এক ভ্যান কয়বার কেনা যায়? এহন আর ভ্যান কেনার মতো কোনো পরিবেশ নেই। এহন কেউ যদি একটা সাহায্য করতনে, তাহলে আবার চলতি পারতাম।’
আব্দুল্লাহ বিশ্বাস বলেন, ‘সোমবার দুপুরে যদুবয়রার এনায়েতপুর বাজার থেকে পুলিশ পরিচয়ে একজন ভ্যানে উঠে লালনবাজার আসলো। এরপর তিনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে আরেকজনের সঙ্গে কথা বলেন। হঠাৎ কী হলো বুঝলাম না। মাথা ধরে নিচে বসে পড়লাম। আধাঘণ্টা পরে দেখি লোকজন মাথায় পানি ঢালছে। কিন্তু ভ্যান আর নেই।’
তার ভাষ্য, ভ্যান চালিয়ে দিনে ৩০০-৪০০ টাকা আয় হতো। তা দিয়ে কিস্তি আর চারজনের সংসার চলত। কিন্তু এখন ভ্যান হারিয়ে সব বন্ধ হয়ে গেছে। না খেয়ে দিন যাচ্ছে তাদের। কেউ একটি ভ্যান কিনে দিলে তার জন্য দোয়া করবেন।
প্রতিবেশী আলম মণ্ডল বলেন, ‘খুব অসহায় ও গরিব মানুষ আব্দুল্লাহ। ভ্যান হারিয়ে পরিবার নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন তিনি। তার একটা ভ্যানের ব্যবস্থা হলে আবার সংসারটা চলত।’
এ বিষয়ে কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দিন বলেন, ‘শয়তানের নিঃশ্বাসের খপ্পরে পড়ে ভ্যান হারিয়েছেন বৃদ্ধ আব্দুল্লাহ। লিখিত অভিযোগটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
বৃদ্ধ দম্পতির পাশে দাঁড়াতে সমাজের বিত্তবানদের আহ্বান জানিয়েছেন ইউএনও ফারজানা আখতার। তিনি বলেন, লিখিত আবেদন করলে সাধ্যমতো সহযোগিতা করা হবে।
আল-মামুন সাগর/এসআর