
এক বন্ধুর সঙ্গে চায়ের দোকানে যাচ্ছিলেন চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার ইকরা আবদুল জব্বার উচ্চবিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহকারী শিক্ষক নজরুল ইসলাম (৩৫)। তখন সন্ধ্যা সাতটা। উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের শহীদ মেজর নাজমুল হক সড়ক ধরে হাঁটছিলেন তাঁরা। হঠাৎ পেছন থেকে একটা ডাক শুনে ফিরে তাকান নজরুল। দেখেন, হাতে অস্ত্র নিয়ে তাঁকে ঘিরে ধরেছে কয়েকজন কিশোর। তাদের একজন তাঁকে উদ্দেশ করে বলে ওঠে, ‘তুই আমাকে থানায় দিলি কেন?’ এরপরই ছুরি আর ক্ষুর নিয়ে শুরু হয় আক্রমণ। একের পর এক ছুরিকাঘাতে আহত শিক্ষক নজরুল ইসলাম চিৎকার করলে পালিয়ে যায় কিশোরেরা। তার আগে নিয়ে যায় তার সঙ্গে থাকা ৪৫ হাজার টাকা ও মুঠোফোন।
৪ সেপ্টেম্বরের এ ঘটনার পর এখনো স্বাভাবিক হতে পারেননি শিক্ষক নজরুল। গতকাল মঙ্গলবার উপজেলার উকিলপাড়ার একতলা বাসায় বসে শরীরের ক্ষতচিহ্নগুলো দেখান তিনি। দুই হাত, ডান পায়ের ঊরু সহ শরীরের পাঁচ স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাত লেগেছে। কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার মতো এখনো শারীরিক–মানসিক অবস্থা নেই তাঁর। নিজের ছাত্রের বয়সী কিছু কিাশোরের এমন আক্রমণ তিনি মানতে পারছেন না।
প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ওই দিন তাঁদের স্কুলের এক ছাত্রকে তারই সাবেক এক সহপাঠীর নেতৃত্বে কয়েকজন কিশোর তুলে নিয়ে যায়। পরে শিক্ষকেরা উপজেলার বটতলী স্টেশনের কাঁচাবাজার এলাকা থেকে ওই ছাত্রকে উদ্ধার করেন। ঘটনায় জড়িত এক কিশোরকে আটক করে পুলিশে দেওয়া হয়। আটক কিশোর ইকরা স্কুলেরই সাবেক ছাত্র। গত বছর বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।
শুরুটা হয়েছিল বিদ্যালয় থেকেই
শিক্ষক নজরুল ইসলামের ওপর হামলার সঙ্গে গত ২২ আগস্টের একটি ঘটনার সম্পর্ক রয়েছে বলে জানিয়েছেন ইকরা আবদুল জব্বার উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জামাল উদ্দিন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ওই দিন তাঁদের স্কুলের এক ছাত্রকে তারই সাবেক এক সহপাঠীর নেতৃত্বে কয়েকজন কিশোর তুলে নিয়ে যায়। পরে শিক্ষকেরা উপজেলার বটতলী স্টেশনের কাঁচাবাজার এলাকা থেকে ওই ছাত্রকে উদ্ধার করেন। ঘটনায় জড়িত এক কিশোরকে আটক করে পুলিশে দেওয়া হয়। আটক কিশোর ইকরা স্কুলেরই সাবেক ছাত্র। গত বছর বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, সেদিন ওই ছাত্রকে উদ্ধার করতে যাওয়া শিক্ষকদের মধ্যে নজরুল ইসলাম ছিলেন। ওই ঘটনার জের ধরে নজরুলের মুঠোফোনে বারবার হুমকি দেওয়া হয়। শেষে হামলাও করা হয় তাঁর ওপর। প্রধান শিক্ষক জামাল উদ্দিন বলেন, একজন শিক্ষক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পড়ান, শাসন করেন, ভুল হলে শুধরে দেন। সেই শিক্ষকের বিরুদ্ধেই যদি কোনো কিশোর অস্ত্র হাতে দাঁড়ায়, তাহলে ঘটনাটি কেবল একজন ব্যক্তির ওপর হামলা হিসেবে দেখলে হবে না। এটি পুরো সমাজেরই ক্ষত।
জামাল উদ্দিন আরও বলেন, বিদ্যালয় থেকে একজন শিক্ষার্থীকে তুলে নেওয়ার ঘটনা ঠেকাতে শিক্ষকেরা এগিয়ে গিয়েছিলেন। একজন শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করে পুলিশে সোপর্দ করেছিলেন তাঁরা। সেটিই যদি হামলার কারণ হয়ে থাকে, তাহলে শিক্ষকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। কোনো শিক্ষক আর কিশোরদের দায়িত্ব নিতে চাইবেন না। এ ক্ষেত্রে শিক্ষক–অভিভাবকদের বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
কী বলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা
শিক্ষক নজরুল ইসলাম এখনো পুরোপুরি সুস্থ হননি। এ ঘটনায় মানসিক ধাক্কাও সামলে উঠতে পারেননি তিনি। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘আমি শিক্ষকতা করি। শিক্ষার্থীদের মানুষ করার চেষ্টা করি। কখনো ভাবিনি, আমারই সাবেক ছাত্র ও তার সমবয়সী কিশোরেরা আমাকে এভাবে আক্রমণ করবে। ওই দিন একজন শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয় থেকে তুলে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। শিক্ষকের দায়িত্ব বোধ থেকেই তাকে উদ্ধার করতে আমরা ছুটে গেছি। এরপর যদি আমাকে হামলার শিকার হতে হয়, তাহলে আমরা শিক্ষক হিসেবে কোথায় দাঁড়াব?’
ঘটনাটিকে উদ্বেগজনক বলেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বায়েজীদ-বিন-আখন্দও। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘একজন শিক্ষকের ওপর হামলার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব। ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, তদন্তের মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া ঠেকাতে পরিবার, বিদ্যালয়, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করতে উদ্যোগ নিতে হবে সম্মিলিতভাবে। কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় যেন অপরাধীদের আইনি ব্যবস্থা থেকে রক্ষা করতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।’
কথা হয় কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে। প্রথম আলোকে তাঁরা বলেন, ‘আমরা সন্তানকে স্কুলে পাঠাই লেখাপড়া শিখে ভালো মানুষ হওয়ার জন্য। কিন্তু যদি স্কুলের শিক্ষকের ওপরই যদি ছেলেরা হামলা করে, তাহলে বিষয়টি আমাদের জন্য খুবই চিন্তার। শুধু পুলিশ দিয়ে কিশোর অপরাধ বন্ধ করা যাবে না। পরিবারকে সন্তানদের খোঁজ রাখতে হবে, তারা কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে—এসব দেখতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যালয় ও সমাজের বড়দেরও দায়িত্ব নিতে হবে। আজ একজন শিক্ষকের ওপর হামলা হয়েছে, কাল অন্য কারও সন্তানও এর শিকার হতে পারে। যে বয়সে একজন কিশোরের হাতে থাকার কথা বই, খাতা কিংবা খেলার ব্যাট, সেই বয়সে তার হাতে কেন উঠছে ধারালো অস্ত্র?’
সাতজনের নামে মামলা
শিক্ষক নজরুল ইসলামের ওপর হামলার ঘটনায় সাতজনের নাম উল্লেখ করে থানায় মামলা হয়েছে বলে জানিয়েছে লোহাগাড়া থানা–পুলিশ। ইতিমধ্যে মামলার এজাহারভুক্ত একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
লোহাগাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবদুল্লাহ বলেন, ঘটনার রাতেই শিক্ষক বাদী হয়ে সাতজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছেন। পুলিশ একজনকে গ্রেপ্তার করেছে। ঘটনায় জড়িত অন্যদের সবাইকে শনাক্ত করেছে পুলিশ। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে। পুলিশ এ ঘটনা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে।