শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দায়িত্ব কে পালন করবেন—এ নিয়ে তার সাম্প্রতিক মন্তব্যের পর দলটির ভেতরে নতুন করে নেতৃত্বের প্রশ্ন সামনে এসেছে। সভাপতিমণ্ডলীর জ্যেষ্ঠ সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমের সক্রিয়তা ঘিরে দলের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ ও আস্থার সংকটের কথাও জানা যাচ্ছে। তবে দলটির মুখপাত্র বলছেন, নেতৃত্ব নিয়ে কোনো সংকট বা দ্বন্দ্ব নেই।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল জানিয়েছে, তাদের দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা তার অনুপস্থিতিতে দলের সভাপতিমন্ডলীর জ্যেষ্ঠতম সদস্য শেখ সেলিম দায়িত্ব পালন করবেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন।
এরপর বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত খবর শেখ সেলিমকে কেন্দ্র করে দলের ভেতরে বিরোধিতা ও সংকট তৈরি হয়েছে বলে আভাস দিচ্ছে।
ভারতের কলকাতায় অবস্থান করা দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম এই ধরনের তথ্য প্রত্যাখ্যান করলেও তিনি এ বিষয়ে বিবিসি বাংলার কাছে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্য থেকে দলের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে দেখা যাচ্ছে দলটির সাবেক সংসদ সদস্য মো. হাবিবে মিল্লাতকে। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছেন, ‘শেখ হাসিনা দলের সভাপতি। তিনি দেশে ফেরার কথা বলেছেন। এখানে অন্য কাউকে নেতৃত্ব দেওয়া বা এ ধরনের কোনো আলোচনা দলীয় পরিমণ্ডলে হয়েছে বলে আমার জানা নেই।’
আরও পড়ুন
দ্য ওয়ালকে সাক্ষাৎকার / শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ সেলিম
ভারত থেকে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানোর অনুমতি নেই শেখ হাসিনার
আওয়ামী লীগের মুখপাত্র মোহাম্মদ আলী আরাফাত বলছেন, দলের নেতৃত্ব নিয়ে ‘সংকট বা দ্বন্দ্বের কোনো প্রশ্নই নেই, কারণ আওয়ামী লীগে গঠনতন্ত্রের বাইরে কিছু হয় না’।
‘শেখ হাসিনা সভানেত্রী আছেন ও থাকবেন। কোনো পরিবর্তন বা নতুন সিদ্ধান্ত হলে সেটির একমাত্র ফোরাম দলের কাউন্সিল। এখন যা প্রচারণা হচ্ছে পুরোটাই গুজব,’ বলেছেন আরাফাত।
তবে কলকাতায় অবস্থান করা দলটির কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, শেখ সেলিমকেই ভবিষ্যতে সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হবে- এমন কিছু শেখ হাসিনা না বললেও সেলিম সম্প্রতি যে দলে সক্রিয় হয়েছেন তা নিয়েই দলের মধ্যে অসন্তোষ আছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. সাব্বীর আহমেদ বলছেন, আওয়ামী লীগে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব থেকে দুই ভাগে হয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ারও ইতিহাস আছে।
‘নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়া গণতান্ত্রিক না হলে ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে দল খুঁজে নিতে না পারলে নেতৃত্বের সংকট তৈরির আশঙ্কা থেকেই যায়,’ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
আরও পড়ুন
দেশে দণ্ডিত, বিদেশে সুরক্ষিত: শেখ হাসিনা ও আসাদের মধ্যে যত মিল
শেখ হাসিনার অনুষ্ঠান নিয়ে মুখ খুলল ভারত সরকার
দলের ভেতরে কী হচ্ছে
কলকাতায় অবস্থান করা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দলটির শীর্ষ নেতা শেখ হাসিনাসহ যেসব নেতা ভারতসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন, তাদের মধ্যে শুরুতে অনেক দিন পারস্পারিক যোগাযোগ ছিল খুবই কম।
পরে ধীরে ধীরে শেখ হাসিনার তৎপরতাতেই দলের একটি অংশ কলকাতায় থেকে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এরপর থেকে পূর্ব কলকাতার টেংরা এলাকায় বসবাস করা দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার বাসাতেই সেখানে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাদের নিয়মিত বৈঠক হয়ে আসছিল।
মূলত এসব বৈঠকে দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমসহ কলকাতায় সক্রিয় নেতারা নিয়মিত যোগ দিয়ে আসছিলেন। কখনো কখনো এসব বৈঠকে ভার্চুয়ালি শেখ হাসিনাও অংশ নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে এ মুহূর্তে সভাপতিমণ্ডলীর সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম কলকাতার নিউটাউন এলাকায় বসবাস করলেও তিনি দলীয় এসব কার্যক্রমে সম্পৃক্ত ছিলেন না।
এমনকি দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের কলকাতা যাওয়ার পরেও অনেকদিন দলীয় কোনো বৈঠকে অংশ নেননি বা নিতে পারেননি। পরে ভার্চুয়াল সভাগুলোতে শেখ হাসিনাই তাকে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেন।
আরও পড়ুন
শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে যা বললেন হর্ষবর্ধন শ্রিংলা
জাহেদ উর রহমান / হাসিনাকে ফিরিয়ে আনতে অনড় সরকার, ভারতের কাছে প্রত্যাশা ‘মুখ বন্ধ রাখা’
এখন সম্প্রতি শেখ ফজলুল করিম সেলিমকে দলের কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা হলে তিনি কিছু বৈঠকে সভাপতিত্ব করেছেন এবং তিনি সিনিয়র হওয়ার কারণে বৈঠকগুলো তার নিউটাউনের বাসাতেই হয়েছে- এমন ধারণাই পাওয়া যাচ্ছে। এ নিয়েও দলের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ আছে বলে দলের সূত্রগুলো জানাচ্ছে।
কলকাতায় থাকা আওয়ামী লীগের একজন নেতা বলেছেন, ‘শেখ সেলিম তো গত প্রায় দুই বছর এখানেই ছিলেন। কিন্তু দলের কার্যক্রমে তিনি সম্পৃক্ত হননি। এর আগেও দল ক্ষমতায় থাকার সময়েও তিনি বহু বছর দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত ছিলেন না। আবার তার একাধিক আত্মীয় তারেক রহমানের মন্ত্রিসভাতেই আছে। ফলে তাকে নিয়ে একটা আস্থার সংকট আছেই।’
আওয়ামী লীগের মুখপাত্র মোহাম্মদ আলী আরাফাত গত মঙ্গলবার বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন যে, ‘শেখ হাসিনা নেতৃত্ব ইস্যুতে দলীয় গঠনতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটি বলেছেন মাত্র। শেখ হাসিনা যোগ দেননি এমন কিছু বৈঠকে শেখ সেলিম সভাপতিমণ্ডলীর সিনিয়র সদস্য হিসেবে কিছু বৈঠকে সভাপতিত্ব করেছেন। দলের নেতৃত্ব নিয়ে সংকট বা দ্বন্দ্বের কোনো প্রশ্নই নেই, কারণ আওয়ামী লীগে গঠনতন্ত্রের বাইরে কিছু হয় না।’
হাবিবে মিল্লাত বলছেন, ‘আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা যে কাউকেই দায়িত্ব দিতে পারেন। তবে এখন দলের প্রস্তুতির বিষয় হলো শেখ হাসিনার ফেরা এবং তিনিই দলের সভাপতি আছেন। এর বাইরে আর কোনো আলোচনা দলের ভেতরে হয়েছে বলে জানি না।’
আরও পড়ুন
শেখ হাসিনার জন্য মৃত্যুদণ্ড অপেক্ষা করছে : প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা
ডিসেম্বরের হাইপ আর ন্যারেটিভ সেপ্টেম্বরেই শেষ: আসিফ মাহমুদ
এরইমধ্যে বুধবার আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়ার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট দিয়ে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের লেটার হেড প্যাডে তার নাম ও জাল স্বাক্ষর ব্যবহার করে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হচ্ছে যা ‘মিথ্যা, বানোয়াট ও ষড়যন্ত্রমূলক’।
যে প্রেস বিজ্ঞপ্তির কথা তিনি লিখেছেন, সেটার একটি ছবিও সঙ্গে যুক্ত করা হয় যেখানে লেখা রয়েছে যে, ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আসাকে কেন্দ্র করে শেখ ফজলুল করিম সেলিমকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগে বিরোধ নতুন কিছু?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. সাব্বীর আহমেদ বলছেন, মূল নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে নেতৃত্ব নিয়ে সংকটের উদাহরণ আওয়ামী লীগে আগেও আছে।
প্রসঙ্গত, ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর দল হিসেবে চরম বিপর্যয়ে পড়েছিল আওয়ামী লীগ। নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধের কারণে ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ (মিজান) ও আওয়ামী লীগ (মালেক) নামে ভাগ হয়ে অংশ নিয়েছিল।
মূলত নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধের কারণেই শেখ হাসিনাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয় ১৯৮১ সালে, যদিও তিনি তখনও বিদেশেই নির্বাসনে ছিলেন। কিছু নেতা দলটিকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়ায় তাকে আওয়ামী লীগের প্রধান করা হয়।
এমনকি শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পরেও দীর্ঘদিন দলের সিনিয়র নেতাদের মধ্যে বিরোধ ছিল অনেকটাই স্পষ্ট। তখন দলের অন্যতম নেতা আব্দুর রাজ্জাক আলাদা রাজনৈতিক দল বাকশাল সক্রিয় রেখেছিলেন। পরে ১৯৯১ সালের নির্বাচনের আগে তিনি বাকশাল বিলুপ্ত করে আওয়ামী লীগে ফিরে এসেছিলেন।
আরও পড়ুন
শেখ হাসিনা আপিলের সুযোগ পাবেন কি না, যা বললেন আইনমন্ত্রী
সাহস থাকলে দেশে আসুন, শেখ হাসিনাকে দুলু
এরপর ক্রমান্বয়ে দলটিতে শেখ হাসিনার একক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলেও ২০০৭ সালে বাংলাদেশে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এলে দলটিতে সংস্কার ইস্যুতে আবারো নেতৃত্বের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
তখন শেখ হাসিনা জেলে থাকা অবস্থায় দলের ভেতরে সংস্কার ইস্যুতে সামনে এসেছিলেন কয়েকজন সিনিয়র নেতা। যদিও তাদের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়, যা দলে শেখ হাসিনার কর্তৃত্ব আরও সুদৃঢ় করে।
এরপর ২০০৯ সালের সংসদ নির্বাচনে দল ক্ষমতায় এলেও ওই সিনিয়র নেতাদের মন্ত্রিসভায় নেননি শেখ হাসিনা। এরপর থেকে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া পর্যন্ত তিনিই ছিলেন দলটির একক নেতা। তিনিই তার মতো করে দলের সাংগঠনিক কাঠামো সাজিয়েছিলেন।
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরেও শেখ হাসিনার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেনি দলের ভেতর থেকে। তবে দ্য ওয়ালের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি তার অনুপস্থিতিতে দলের সভাপতির দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে শেখ সেলিমের নাম আনায় দলের ভেতরে অসন্তোষের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
‘নেতৃত্ব যদি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত না হয়, তা হলে যে কোনো সময়েই এ নিয়ে দ্বন্দ্ব, সংকট বা গ্রুপিং তৈরি হতে পারে। আওয়ামী লীগে যদি শেখ সেলিমের বিষয়টি সত্য হয়, তাহলে তা নিয়েও সংকটের আশঙ্কা থাকাটাই স্বাভাবিক,’ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন অধ্যাপক সাব্বীর আহমেদ।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা
এমএমএআর