নতুন ভাঁজযোগ্য আইফোনের জন্য অনেকের অপেক্ষা থাকলেও অ্যাপলের সাম্প্রতিক আয়োজনে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে আইফোন ১৮ প্রো ও প্রো ম্যাক্সের ক্যামেরা। মেগাপিক্সেল বাড়ানো কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভরতার বাইরে এবার ক্যামেরায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে অ্যাপল।
নতুন পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে পরিবর্তনশীল অ্যাপারচার, নতুন সেন্সর, উন্নত পেশাদার নিয়ন্ত্রণ, স্থায়ী বিষয়বস্তু অনুসরণ এবং ‘রেফারেন্স’ মোড। এসব সুবিধার কারণে আইফোনের ক্যামেরা এখন পেশাদার আলাদা ক্যামেরার আরও কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে মনে করছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা।
পরিবর্তনশীল অ্যাপারচার
আইফোন ১৮ প্রো সিরিজের অন্যতম বড় সংযোজন পরিবর্তনশীল অ্যাপারচার। ছোট আকারের স্মার্টফোন ক্যামেরা সেন্সরে এমন ব্যবস্থা তৈরি করা বেশ জটিল। কারণ অ্যাপারচারের ক্ষুদ্র ব্লেডগুলোকে খুব মসৃণভাবে খোলা ও বন্ধ হতে হয়। অ্যাপল জানিয়েছে, এ জন্য তারা লেজার দিয়ে কাটা বিশেষ ব্লেড ব্যবহার করেছে।
পরিবর্তনশীল অ্যাপারচারের বড় সুবিধা হলো-স্বয়ংক্রিয় এক্সপোজার ব্যবস্থায় প্রয়োজন অনুযায়ী ক্যামেরায় কম-বেশি আলো প্রবেশ করানো যাবে, শাটার স্পিড পরিবর্তন না করেই। ফলে কম আলোতে চলমান কোনো বিষয় ধারণ করার সময়ও দ্রুত শাটার স্পিড রাখা সম্ভব হবে। এতে ছবি ঝাপসা হওয়ার ঝুঁকি কমবে। একই সঙ্গে কম আইএসও ব্যবহার করা গেলে ছবি ও ভিডিওতে অতিরিক্ত দানাদার ভাবও কম থাকবে।
আরও পড়ুন
আইফোনে ১৮ এর সঙ্গে আর কী কী আনলো অ্যাপল
পেশাদার ক্যামেরার মতো নিয়ন্ত্রণ
আইফোন ১৮ প্রোর নতুন পেশাদার মোডে অ্যাপারচার নিয়ন্ত্রণের সুযোগও দেওয়া হয়েছে। চারটি অ্যাপারচার সেটিং রয়েছে-এফ/১.৪৮, এফ/১.৮, এফ/২.৮ ও এফ/৪.০। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারী প্রয়োজন অনুযায়ী ছবির পেছনের অংশ কতটা ঝাপসা হবে, তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। প্রতিকৃতির ক্ষেত্রে বেশি ব্যাকগ্রাউন্ড ব্লার এবং প্রাকৃতিক দৃশ্যের ক্ষেত্রে পুরো দৃশ্যকে ফোকাসে রাখতে অ্যাপারচার পরিবর্তন করা যাবে।
উদাহরণ হিসেবে, সামনে গাড়ি বা মানুষ চলাচল করছে, কিন্তু পেছনের দৃশ্য পরিষ্কার রাখতে হবে-এমন ছবি তুলতে আগে দিনের আলোতে শাটার স্পিড যথেষ্ট কমানো কঠিন ছিল। নতুন অ্যাপারচার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এ ধরনের শট নেওয়া সহজ হবে।
অ্যাপারচার, আইএসও ও শাটার স্পিডের পাশাপাশি সাদা ভারসাম্যও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। পাশাপাশি হিস্টোগ্রাম দেখার সুবিধা থাকছে, যা ছবির আলো ও অন্ধকার অংশের মাত্রা বুঝতে পেশাদার আলোকচিত্রীদের কাজে আসবে। তবে স্মার্টফোনে পরিবর্তনশীল অ্যাপারচার একেবারে নতুন নয়। এর আগে স্যামসাং গ্যালাক্সি এস৯-এ দ্বৈত অ্যাপারচার এবং শাওমির কয়েকটি মডেলে আরও উন্নত ধরনের মসৃণ অ্যাপারচার ব্যবস্থার দেখা মিলেছে।
স্থায়ী বিষয়বস্তু অনুসরণ
ক্যামেরায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো স্থায়ী বিষয়বস্তু অনুসরণ। ভিডিও বা ছবি তোলার সময় ক্যামেরা কোনো ব্যক্তিকে শনাক্ত করে তার গতিবিধি অনুসরণ করতে পারবে। এমনকি ভিড়ের মধ্যে ওই ব্যক্তি সাময়িকভাবে অন্য কারো আড়ালে চলে গেলেও ক্যামেরা তাকে শনাক্ত করে আবার অনুসরণ করতে পারবে। পেশাদার ক্যামেরাতেও সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের প্রযুক্তি গুরুত্ব পেয়েছে।
ছবি ও ভিডিওতে আরও নিয়ন্ত্রণ
অ্যাপল ফটোগ্রাফিক স্টাইলস সুবিধায় নতুন টেক্সচার ও দানাদার ভাব নিয়ন্ত্রণের সুযোগ যোগ করেছে। এর ফলে ছবি তোলার পর সেটির চেহারা আরও সূক্ষ্মভাবে পরিবর্তন করা যাবে।
ভিডিওর ক্ষেত্রেও নতুন সুবিধা রয়েছে। প্রতি সেকেন্ডে ৬০ ফ্রেম পর্যন্ত ধারণ করা ভিডিওতে শুটিং শেষ হওয়ার পর সিনেমাটিক প্রভাব প্রয়োগ করা যাবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, বিশেষ করে টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে ভিডিও প্রকাশের ক্ষেত্রে এটি কাজে আসতে পারে।
আরও পড়ুন
অ্যাপলের প্রথম ফোল্ডেবল ফোনে কী থাকছে, দাম কত?
ছবির আসল সংস্করণ যাচাই
পেশাদার আলোকচিত্রী ও কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য অ্যাপলের ‘রেফারেন্স ইমেজ’ সুবিধাটিও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন রেফারেন্স মোডে ছবি তোলার সময় ক্যামেরা থেকে পাওয়া তথ্যের একটি স্বাক্ষরযুক্ত সংস্করণ সংরক্ষণ করা হবে। অ্যাপলের ব্যক্তিগত ক্লাউড কম্পিউটিং ব্যবস্থা সেই তথ্য ব্যবহার করে একটি অপরিবর্তনযোগ্য রেফারেন্স ছবি তৈরি করবে। মূল ছবির পাশাপাশি সেটি ফটোস অ্যাপে দেখা যাবে। ফলে পরে কোনো ছবি পরিবর্তন বা বিকৃত করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা সহজ হবে।
বিশেষ করে কোনো আলোকচিত্র অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বা পরিবর্তন করা হলে এর মূল সংস্করণের সঙ্গে তুলনা করে বিষয়টি শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
৪৮ মেগাপিক্সেল ক্যামেরা
নতুন প্রযুক্তির পাশাপাশি আইফোন ১৮ প্রো সিরিজে উচ্চ রেজল্যুশনের ক্যামেরাও থাকছে। প্রধান ক্যামেরায় ৪৮ মেগাপিক্সেলের ফিউশন ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়েছে, যার সঙ্গে রয়েছে পরিবর্তনশীল অ্যাপারচার। এ ছাড়া ৪৮ মেগাপিক্সেলের ফিউশন আল্ট্রা ওয়াইড ক্যামেরায় এফ/২.২ এবং ৪৮ মেগাপিক্সেলের ফিউশন টেলিফটো ক্যামেরায় এফ/২.৮ অ্যাপারচার থাকছে।
আইফোন ১৮ প্রোর ক্যামেরা ব্যবস্থায় এবার অ্যাপল শুধু মেগাপিক্সেল বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর জোর না দিয়ে ব্যবহারকারীর হাতে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার দিকে গুরুত্ব দিয়েছে। ফলে স্মার্টফোন দিয়ে ছবি ও ভিডিও ধারণের অভিজ্ঞতা আরও পেশাদার পর্যায়ে নেওয়ার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
সূত্র: এনেগ্যাজেট
শাহজালাল/কেএসকে