সকালের নরম রোদ মেখে মেঠোপথ ধরে স্কুলে আসছে শিশুরা। কারো হাতে বই, কারো কাঁধে স্কুলব্যাগ। কারো চোখে নতুন দিনের স্বপ্ন, আবার কারো মুখে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হওয়ার উচ্ছ্বাস। কিন্তু পথের নির্মল বাতাস পেরিয়ে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ঢুকতেই বদলে যায় সেই পরিচিত দৃশ্য। বাতাসে ভেসে আসে তীব্র দুর্গন্ধ। কেউ নাক চেপে ধরে, কেউ মুখ ফিরিয়ে নেয়। গন্ধের উৎস বিদ্যালয়ের মাঠের পাশের জমে থাকা দূষিত পানি।
এরই মধ্যে স্কুলের ঘণ্টা বেজে গেছে। শিক্ষার্থীরা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশে শিক্ষকরা। শুরু হয়েছে সকালের সমাবেশ। জাতীয় সংগীতের সুরে মুখর হওয়ার কথা পুরো বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। লাল-সবুজের পতাকা ধীরে ধীরে উঠছে আকাশের দিকে। কিন্তু সেই গানের সুরের মধ্যেও বারবার বাধা হয়ে আসছে মুরগির বিষ্ঠা ও বর্জ্য মিশ্রিত পানির তীব্র দুর্গন্ধ।
এ চিত্র ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার ৪০ নম্বর বাঁশাটি চরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। বিদ্যালয়ের মাঠের একাংশে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা পানির সঙ্গে আশপাশের মুরগির খামারের বিষ্ঠা ও বর্জ্য মিশে তৈরি হয়েছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ স্থানীয় বাসিন্দারা। মাঠের একটি অংশ এখন শিশুদের খেলাধুলা ও স্বাভাবিক চলাচলের জন্য প্রায় অনুপযোগী।
একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ সাধারণত শিশুদের সবচেয়ে আনন্দের জায়গাগুলোর একটি। ক্লাসের ফাঁকে সেখানে ছোটাছুটি করার কথা, দল বেঁধে খেলাধুলা করার কথা। শরীরচর্চা, ক্রীড়া কিংবা জাতীয় দিবসের বিভিন্ন আয়োজনও হওয়ার কথা মাঠটিকে ঘিরে, কিন্তু বাঁশাটি চরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাস্তবতা যেন তার সম্পূর্ণ বিপরীত। সেখানে মাঠের একাংশে জমে আছে নোংরা পানি। পানির ওপর ভাসছে ময়লা-আবর্জনা। আশপাশে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। দীর্ঘদিন ধরে পানি জমে থাকায় মাটি কাদায় পরিণত হয়েছে। কোথাও কোথাও পানির রংও বদলে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মাজেদুলের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের পাশে গড়ে ওঠা গরু ও মুরগির খামার থেকে বের হওয়া বর্জ্য যথাযথ ব্যবস্থাপনা না থাকায় বিভিন্নভাবে বিদ্যালয়ের মাঠের দিকে চলে আসছে। বৃষ্টির পানি ও অন্যান্য প্রবাহের সঙ্গে মিশে সেই বর্জ্য জমা হচ্ছে নিচু জায়গায়। ফলে একদিকে পানি নিষ্কাশনের সমস্যা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে বর্জ্য মিশে পানিকে আরও দূষিত করে তুলছে।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক খায়রুল আলম বলেন, বিদ্যালয়ের পাশে ফিরোজ নামের এক ব্যক্তি গরু ও মুরগির খামার করেছেন। সেখান থেকে মুরগির বিষ্ঠা ও অন্যান্য ময়লা বিদ্যালয়ের সীমানা দিয়ে শিশুদের খেলার মাঠে এসে পড়ছে।
তিনি বলেন, এসব বর্জ্য থেকে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ ছড়ায়। এর কারণে শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, শিক্ষক-কর্মচারীরাও সমস্যায় পড়ছেন। অফিসকক্ষে বসা, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান এবং বিদ্যালয়ের অ্যাসেম্বলি করতেও অসুবিধা হচ্ছে। সমস্যা সমাধানের জন্য এরইমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে।
বিদ্যালয়ের মাঠের এমন পরিবেশে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে শিশুরা। যেসব শিশু সকালবেলা বই-খাতা নিয়ে বিদ্যালয়ে আসে, তাদের একটি অংশকে প্রতিদিন দুর্গন্ধযুক্ত পানির পাশ দিয়ে চলাচল করতে হয়। খেলাধুলার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে।
শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের মধ্যেও এ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। তাদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ের পাশে দূষিত পানি জমে থাকলে তা শিশুদের স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি জমে থাকা পানিতে মশার বংশবিস্তার এবং বিভিন্ন ধরনের জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
অভিভাবক সাথী আক্তার বলেন, সন্তানদের স্কুলে পাঠানো হয় পড়াশোনা করার পাশাপাশি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠার জন্য। কিন্তু বিদ্যালয়ের মাঠের এই অবস্থা দেখে তারা চিন্তিত। কখন শিশুরা কোনো রোগে আক্রান্ত হয়, সেই ভয় থাকে।
আরেক অভিভাবক জহুরা বেগম বলেন, মুরগির খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার যথাযথ ব্যবস্থা না থাকলে শুধু খামারের আশপাশ নয়, পুরো এলাকার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিদ্যালয়ের মতো সংবেদনশীল জায়গার পাশে এমন পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির ভাষ্য, বছরের বিভিন্ন সময়ে বৃষ্টির পানি জমে মাঠের নিচু অংশ প্লাবিত হয়। সেই পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় দীর্ঘ সময় আটকে থাকে। এর সঙ্গে আশপাশের বর্জ্য মিশে গিয়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
এ বিষয়ে মুক্তাগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কৃষ্ণচন্দ্র বলেন, দীর্ঘদিনের এই সমস্যা সমাধানে এরইমধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। খেলার মাঠের যে অংশে পানি জমে থাকে, সেখানে মাটি ভরাট করে ফুলের বাগান তৈরি করে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি মুরগির খামারের মালিকের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে এবং খামারটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।
প্রশাসনের এমন উদ্যোগে আশার আলো দেখছেন স্থানীয়রা। তবে তাদের প্রশ্ন, শুধু মাঠের একটি অংশ মাটি দিয়ে ভরাট করলেই কি সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে? পানি কোথা থেকে আসছে, কোথায় যাচ্ছে, খামারের বর্জ্য কীভাবে বিদ্যালয়ের মাঠে পৌঁছাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে যেন এমন পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সেসব বিষয়ও সমাধানের আওতায় আনা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত বিদ্যালয়ের মাঠ থেকে জমে থাকা দূষিত পানি ও বর্জ্য অপসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে মাঠের পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে। আশপাশের খামারগুলোর বর্জ্য যাতে বিদ্যালয়ের মাঠ কিংবা আশপাশের পরিবেশে না আসে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
শিশুদের জন্য একটি পরিচ্ছন্ন বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ কোনো বিলাসিতা নয়, এটি তাদের অধিকার। সেই অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের।
হোসাইন সুলভ/এফএ