চলতি মৌসুমের ভরা বাজারে পাটের ভালো দামে গাইবান্ধার কৃষকের মুখে ফিরেছে হাসি। চাষিদের দাবি, অন্তত গত এক দশকে ভরা মৌসুমে পাটের এমন দাম পাননি তারা। উৎপাদন খরচ মিটিয়ে এবার লাভের মুখ দেখায় দীর্ঘদিনের হতাশা কাটিয়ে নতুন করে আশার আলো দেখছেন পাটচাষিরা। তবে ভালো দাম পাওয়ার এই স্বস্তির মধ্যেও তাদের শঙ্কা কাটেনি বাজারে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য নিয়ে।
জেলার উল্লেখযোগ্য গাইবান্ধার সদর উপজেলার কামারজানি ও ফুলছড়ি উপজেলার ‘ফুলছড়ি’ হাটে গিয়ে দেখা যায়, উৎসব মুখর পরিবেশে চলছে পাটের বেচা-কেনা। ভোর-সকাল থেকেই নৌকায় করে পাট বিক্রি করতে আসছেন চরাঞ্চলের চাষিরা। হাটের মাঠের পাশাপাশি নৌকাতেও চলছে ক্রয়-বিক্রয়। এসময় হাসি-খুশি মুখ দেখা যায় কৃষকদের। কৃষকরা প্রশ্নের জবাবও দেন প্রাণোচ্ছল ভাবেই। হাটে মানভেদে প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে নিম্নে তিন হাজার ৮০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ চার হাজার ১০০ টাকায়। যা গেল অন্তত ১০ বছরের মধ্যে পাটের ভরা মৌসুমের সর্বোচ্চ মূল্য বলে জানান কৃষকরা।
‘গাইবান্ধায় বর্তমানে পাটের বাজার ভালো। অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি পাটের আবাদ বাড়াতে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।’
অন্যদিকে ফুলছড়ি উপজেলার উদাখালি, উড়িয়া, ফজলুপুর ও কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পাট শুকানো ও পরিষ্কারের কাজ করছেন চাষিরা। কেউ কেউ প্রস্তুত করছেন বিক্রির জন্যও। অনেক কৃষক পাট ও পাটকাঠি শুকাচ্ছেন পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে। এসময় পাট নিয়ে স্বপ্নবোনা কৃষকদের চোখে-মুখে ছিল হাসির ঝিলিক। এবার লাভের ভাগে।
আরও পড়ুন
পড়াশোনার ফাঁকে ৩৬০ টাকায় শুরু, এখন মাসে আয় ৩ লাখ
পাটচাষিরা জানান, গত কয়েক বছর থেকেই পাটের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার হতাশা থাকলেও এবছর লাভের মুখ দেখছেন। তিন হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার ১০০ টাকা পাটের দাম তারা অন্তত ১০ বছরের মধ্যে পাননি। আর এ বছর পাল্টে গেছে সেই চিত্র।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার কামারজানি এলাকার পাট চাষি হুমায়ন মিয়া বলেন, এ বছর পাটের বাজার ভালো। চাষের খরচ মিটিয়ে বিঘা প্রতি ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ হবে। অন্যান্য বছর দাম না পাওয়া অনেক কৃষক পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ছিল।
আরেক চাষি ঈসমাইল হোসেন অভিযোগ করে বলেন, অন্যান্য বছরেও পাটের এমন দাম গেলেও তা কৃষকের ভাগ্যে জোটেনি। কৃষকের হারভাঙা খাটুনিতে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য কেড়ে নিয়েছে সিন্ডিকেট। কেননা, ভরা মৌসুমের যে সময়ে কৃষকরা পাট বিক্রি করেন ঠিক সেই সময়ে মিল মালিকরা কম দাম ছাড়া পাট ক্রয় করেন না। ফলে বাধ্য হয়ে অর্ধেক দামে পাট বিক্রি করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কৃষকরা।
‘দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি কৃষকরা। কৃষিনির্ভর এ জেলায় অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হলে কৃষককে আগে বাঁচাতে হবে। কৃষকদের উৎপাদিত ফসল সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ক্রয় করলো, তারা চাষাবাদে আগ্রাহ বাড়াবে।’
ফুলছড়ির হাটে পাট বিক্রি করতে আসা ফুলছড়ি ইউনিয়নের বাগবাড়ি এলাকার পাটচাষি আব্দুস সালাম বলেন, এবার পাটের দামে আমরা খুশি। এমন বাজার থাকলে আমরা পাটের আবাদ করবো।
আরেক কৃষক আবেদ আলী ব্যাপারি বলেন, সব খরচ বাদে এবার লাভ হচ্ছে কৃষকদের। ভরা বাজারে গত ১০ বছর পর এমন দাম পাচ্ছি আমরা। তবে এই দাম কতদিন থাকবে সেটি নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।
জামালপুরের ঘুটাইল বাজার থেকে আসা পাইকারি পাট ক্রেতা খোরশেদ আলম বলেন, সবচেয়ে ভালো মানের পাট ক্রয় করা হচ্ছে ৪ হাজার ৫০ থেকে ১০০ টাকায়, মাঝারি মানের পাট ৩ হাজার ৯০০ থেকে ৪ হাজার আর তুলনামূলক নিম্নমানের পাট ক্রয় করছি ৩ হাজার ৮০০ টাকায়। এবছর পাটের দাম অনেক ভালো।
ফুলছড়ি হাটে পাট বিক্রি করতে আসা পাটচাষি আলফাজ আলী বলেন, এবছর এখন বাজারে দাম ভালো, কিন্তু এমন ভরা মৌসুমে পাটের এই দাম ছিল না দীর্ঘদিন। বাধ্য হয়ে মাত্র ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় পাট বিক্রি করতে হয়েছে আমাদের। আর বিক্রির কয়েক সপ্তাহ পরেই দেখা যায় সেই পাটই হাটে দ্বিগুণ দামে বিক্রি হয়েছে।
মৃদু বাড়ছে পাটচাষ, আগের পরিসংখ্যান বহুদূর গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী জেলায় পাট চাষাবাদের ৫ বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছর ১৭০ হেক্টর জমিতে পাটচাষ বৃদ্ধি পেয়ে ১৩ হাজার ৯৮৭ হেক্টর এবং গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে ২৭ হেক্টর বৃদ্ধি পেয়ে পাটচাষ হয়েছিলো ১৩ হাজার ৮১৭ হেক্টর জমিতে। কিন্তু তার আগের বছরগুলোতে ভয়াবহভাবে কমেছে পাটের আবাদ।
আরও পড়ুন
রেমা-কালেঙ্গা গহিন অরণ্যে গাছের মগডালে বিরল প্রাণী, মুগ্ধ পর্যটকরা
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালে জেলার সাত উপজেলায় ১৬ হাজার ৪৬০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়। পরের বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে বিস্ময়করভাবে ১ হাজার ৪০০ হেক্টর কমে গিয়ে তা ১০ হাজার ৫০০ হেক্টরে নামে এবং ২০২৪ সালে আরও ১ হাজার ২১০ হেক্টর কমে জেলায় ১৩ হাজার ৭৯০ হেক্টর জমিতে পাট চাষাবাদ হয়।
‘আমরা চরের মানুষ এই মৌসুমে চরাঞ্চলে পাট ছাড়া কোনো আবাদ হয় না। বাধ্য হয়ে পাটই করতে হয়। কিন্তু সিন্ডিকেটে না ভাঙলে কৃষকদের বাঁচানো সম্ভব নয়। পাটচাষে একদিকে আবার বন্যাসহ নানা ঝুঁকি, অন্যদিকে বাজারে সিন্ডিকেট। সরকারের উচিৎ কৃষকদের পক্ষে থেকে সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া।’
এছাড়া অন্যদিকে, চলতি বছরসহ কোনো বছরই চাষাবাদে এবং পাট উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কৃষি বিভাগ। যদিও সার-বীজের সরকারি প্রণোদনা কার্যক্রম সচল রেখেছে সরকার। চলতি বছর ১৩ হাজার ৯৮৭ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে পাট। এর বিপরীতে উৎপাদন ধরা হচ্ছে ৩৪ হাজার ৯৮৭ টন। এছাড়া এবছর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪৮ হেক্টর জমির ফসল।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, বন্যা-খরাসহ নানা দুর্যোগের ঝুঁকি, হারভাঙ্গা খাটুনি আর ধার-দেনা করে পাট চাষ করেন কৃষকেরা। আর তাদের উৎপাদিত পণ্যের দাম নির্ধারণ করেন পাটকল মালিক, ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটরা। যার কারণে প্রায় বছরই পাট চাষে পুঁজি হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষক। ফলে চাষাবাদে আগ্রহ হারিয়েছেন অনেক স্থানীয় কৃষক। যদিও গেল দুবছর থেকে আবার ধীর গতিতে বাড়ছে পাটের আবাদ।
ফুলছড়ির কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের উত্তর রসূলপুরের কৃষক ফারুক হোসেন বলেন, যখন এই অঞ্চলের শতকরা ৯০ ভাগ কৃষকের ঘরে পাট থাকে না তখন ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে পাট ক্রয় করেন। ফলে লাভবান হয় মিল মালিক ও মধ্যসত্বভোগীরা। আর ক্ষতিগ্রস্ত হই আমরা কৃষকরা। তবে এবছর পাল্টেছে সেই চিত্র। এসময় তিনি বর্তমান বাজার ধরে রাখতে সরকারের প্রতি আবেদন জানান।
খোলাবাড়ির কৃষক জাহাঙ্গীর আলম সরকার বলেন, পাটচাষিদের পাটকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে সব হিসাব। তারা ভরা মৌসুমেপাট বিক্রি করে সংসারের ব্যয়, ধার-দেনা পরিশোধসহ সাংসারিক যাবতীয় কাজ করেন। কৃষকদের ন্যায্যমূল্য পেতে এবছরের মতো সব সময়ই শুরু থেকেই পাট ক্রয়-বিক্রয়ে সরকারের নজরদারি করতে হবে।
ঝিগাবাড়ী চরের পাটচাষি জিয়ারত উদ্দিন বলেন, আমরা চরের মানুষ এই মৌসুমে চরাঞ্চলে পাট ছাড়া কোনো আবাদ হয় না। বাধ্য হয়ে পাটই করতে হয়। কিন্তু সিন্ডিকেটে না ভাঙলে কৃষকদের বাঁচানো সম্ভব নয়। পাটচাষে একদিকে আবার বন্যাসহ নানা ঝুঁকি, অন্যদিকে বাজারে সিন্ডিকেট। সরকারের উচিৎ কৃষকদের পক্ষে থেকে সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া।
ফুলছড়ি হাটের পাট ব্যবসায়ী কাজল বলেন, স্টোকাররা ভালো মানের পাট মণপ্রতি ৪ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত কিনছেন। ফলে কৃষক এবছর লাভবান হচ্ছেন।
আরও পড়ুন
শেরপুরে সবজিতে নীরব বিপ্লব, ২৫০ কোটি টাকার বাণিজ্যের আশা
তিনি আরও বলেন, মিলাররা এই দামে পাট কিনছে না, ফলে আমরাও কিনতে পারছি না।
এসময় সিন্ডিকেট প্রশ্নে পাট ব্যবসায়ী কাজল বলেন, আমরা স্থানীয়ভাবে পাট ক্রয় করি ঠিকই। আমরা নিজেরা দাম নির্ধারণ করি না। আমাদেরকে পাটকল মিল মালিকরা যে দামে কিনতে বলেন, সেই দামেই পাট কিনতে হয়। এখানে আমাদের কিছু নেই।
গাইবান্ধা নাগরিক মঞ্চের আহ্বায়ক অ্যাড. সিরাজুল ইসলাম বাবু বলেন, দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি কৃষকরা। কৃষিনির্ভর এ জেলায় অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হলে কৃষককে আগে বাঁচাতে হবে। কৃষকদের উৎপাদিত ফসল সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ক্রয় করলো, তারা চাষাবাদে আগ্রাহ বাড়াবে।
তিনি আরও অভিযোগ করে বলেন, কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি পাট কেনা হচ্ছে না। ফলে লাভবান হচ্ছেন ফড়িয়া-পাইকারেরা। হাটে-হাটে সরকারি ক্রয়কেন্দ্র খুলে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পাট কেনা হলে কৃষকরা অবশ্যই লাভবান হবেন।
এছাড়া সরকারি পাটকলগুলো চালু এবং পাটজাত পণ্যের উৎপাদন বাড়াতে উদ্যোগ নেওয়াসহ পণ্যের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকারে প্রতি আহ্বান জানান তিনি। অন্যথায় এই সোনালী আঁশে (পাট চাষে) আগ্রহ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) আসাদুজ্জামান বলেন, গাইবান্ধায় বর্তমানে পাটের বাজার ভালো। অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি পাটের আবাদ বাড়াতে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।
এনএইচআর