হাসপাতাল ভবনের বিভিন্ন স্থানে দেয়াল ভাঙা এবং ফাটল
জনবল সংকট রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে
খুলনা জেলার দিঘলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত। একদিকে হাসপাতালে জনবল সংকট অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চলছে চিকিৎসা সেবা। স্বাস্থ্য সহকারী পদ, কুক এবং নিরাপত্তা প্রহরীসহ একাধিক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। এমনকি পরিচ্ছন্নতাকর্মী সংকটের কারণে হাসপাতাল থাকে অপরিচ্ছন্ন। নানা জটিলতার মধ্যে সাধারণ মানুষকে চিকিৎসা সেবা নিতে হচ্ছে।
হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, হাসপাতালের বিভিন্ন রুম ও আবাসিক রোগীদের ওয়ার্ডেও বিভিন্ন স্থানে দেয়ালের ওপর থেকে ভেঙে পড়ছে পলেস্তার। অনেক রুম পরিত্যক্ত বিধায় ব্যবহার করা হচ্ছে না। বাথরুমগুলোর অবস্থাও বেহাল। পাশে একটি নতুন ভবন হলেও জায়গা সংকটের মধ্যে চলছে চিকিৎসাসেবা। অপরিষ্কার অবস্থায় রয়েছে হাসপাতালের বিভিন্ন স্থান। রয়েছে একটি মাত্র এম্বুলেন্স। কিছুদিন আগে ড্রাইভার নিয়োগ হয়েছে। সকাল থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত আউটডোরে চলে চিকিৎসাসেবা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রথম শ্রেণির ৪০টি পদের মধ্যে শূন্য পদ রয়েছে ১৩টি, দ্বিতীয় শ্রেণির ৩৩টি পদ পূর্ণ রয়েছে, তৃতীয় শ্রেণির ৮৮টি পদের মধ্যে শূন্য রয়েছে ৪০টি পদ এবং চতুর্থ শ্রেণির ২২টি পদের মধ্যে শূন্য রয়েছে ২০টি পদ। হাসপাতালে নিরাপত্তা প্রহরী নেই। নেই কোনো কুক ও আনসার সদস্য। নেই ওয়ার্ড বয়। আউটসোর্সিং কর্মীদের দিয়ে চলছে অস্থায়ীভাবে চতুর্থ শ্রেণির কর্মীদের কাজ। স্টোর কিপার না থাকায় হচ্ছে জটিলতা। স্বাস্থ্য সহকারীর ২৯টি পদের ২৫টি রয়েছে শূন্য। শিশু বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট দুইটি পদের একটি শূন্য। একজন কনসালটেন্ট সপ্তাহে শনিবার ও রবিবার আসেন রোগী দেখতে।
আরও জানা যায়, গত এক মাস ধরে হাসপাতালে গড়ে প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০ জন রোগী ভর্তি থাকেন। আর আউটডোরে থাকেন ৪৫০ থেকে ৫০০ জন রোগী। তবে ৬০ থেকে ৭০ জন রোগী ভর্তি থাকলেও নিয়ম অনুযায়ী ৪৭ জন রোগীর বেশী ডায়েট লিস্ট করা সম্ভব হয় না। হাসপাতাল থেকে প্রায় ৩৫ থেকে ৩৭ পদের ওষুধ রোগীদের সরবরাহ করা হয়। প্রতি মঙ্গলবার ও বুধবার সিজার করা হয়।
হাসপাতালের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী বলেন, স্বাস্থ্য সহকারী পদ, নিরাপত্তা প্রহরী, কুক এবং ওয়ার্ড বয় হাসপাতালে নেই। ডাক্তাররা চিকিৎসাসেবা দিতে গেলে স্বাস্থ্য সহকারী প্রয়োজন হয়। কিন্তু অনভিজ্ঞ আউটসোর্সিং কর্মীদের দিয়ে সে কাজ করাতে হয়। অনেক আউট সোর্সিং কর্মীরা কোম্পানি থেকে সঠিক সময়ে বেতন না পাওয়ায় কাজ ছেড়ে চলে গেছে। সব মিলিয়ে নানারকম জটিলতায় ভুগছে এই হাসপাতাল।
তারা আরও বলেন, দিঘলিয়া উপজেলার ৬০ থেকে ৭০ ভাগ মানুষ দরিদ্র। তারা স্বল্প খরচে চিকিৎসার জন্য এই হাসপাতালে আসেন। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হলেও অনেক জটিল রোগের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় না। তবে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের কম জটিল সার্জারিগুলো করা হচ্ছে। হাসপাতালে সিজার, নরমাল ডেলিভারি রোগী এবং হার্নিয়া অপারেশন করাও হচ্ছে।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা সফুরা খাতুন বলেন, আমি দীর্ঘদিন শ্রমিকের কাজ করেছি। এখন মাঝে মাঝে হাড়ের সমস্যায় ভুগি। এজন্য মাসে এক-দুইবার হাসপাতালে আসতে হয়। একবার হাসপাতালে ভর্তিও হতে হয়েছে। তবে হাসপাতালে থাকার মতো অবস্থা নেই। কিন্তু ডাক্তার দেখালে এখান থেকে কিছু ওষুধ পাওয়া যায়। তবে দামি ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয় বলে তিনি জানান।
ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে আসা রোগী জসিম মিয়ার স্বজন আলতাফ শেখ বলেন, মাঝে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আসি বড় ভাইকে নিয়ে। টেস্ট করে জানতে পারি ডেঙ্গু হয়েছে। পরে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। তবে হাসপাতালের অনেক স্থান থেকে দেয়াল ভেঙে ভেঙে পড়েছে। অনেক রুম পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। থাকতে ভয় লাগে।
আউটডোরে কথা হয় জেসমিন খাতুনের সঙ্গে। তিনি বলেন, গাইনি সমস্যা নিয়ে চিকিৎসাসেবা নিতে এসেছি। ডাক্তার পেয়েছি। চিকিৎসা নিতে সমস্যা হয়নি। তবে হাসপাতালের পরিবেশ আরেকটু ভালো করা দরকার। আমাদের এই অঞ্চলের মানুষ দরিদ্র। সবার অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো না।
দিঘলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও প. প. কর্মকর্তা ডা. মো. মাহবুবুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা কনডেমনেশন প্রক্রিয়ায় রয়েছি। এই ভবন অনেক পুরাতন হয়ে গেছে। ওয়ার্ডে রোগী রাখা যায় না, ওয়ার্ডের বাইরে বারান্দায় রোগী রাখতে হয়। এছাড়া জনবল সংকট তো রয়েছেই। স্বাস্থ্য সহকারী পদ রয়েছে ২৯ টি। কিন্তু সেখানে জনবল রয়েছে মাত্র চারজন। এছাড়া দপ্তরেও জনবল সংখ্যার ঘাটতি রয়েছে। এ বিষয়গুলো নিয়ে সব সময় আলোচনা চলছে।’ তবে নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন হলে এই ঘাটতি আর থাকবে না বলে তিনি জানান।
খুলনার সিভিল সার্জন মাহফুজা খাতুন জাগো নিউজকে বলেন, ‘হাসপাতালের বিষয়ে অবগত রয়েছি। এটা আর মেরামত করতে চাচ্ছি না। ওখানে নতুন করে ভবন নির্মাণের প্রয়োজন। আমরা সে প্রক্রিয়ায় রয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘শুধু দিঘলিয়াতে নয়, জেলার নয়টি উপজেলাতে জনবল ঘাটতি রয়েছে। এমনকি আমার অফিসেও জনবল ঘাটতি। নতুন করে নিয়োগ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন হলে জনবল সংকট কিছুটা দূর হবে।’
আরিফুর রহমান/কেজে/জেআইএম