গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে চুরি হওয়া লেমুর ভারতের গুজরাটের একটি পার্কে পাওয়া যাওয়ার কথা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়। সেই লেমুর উদ্ধারে ডিএনএ নমুনার কথা বলা হলেও কর্তৃপক্ষের সংরক্ষণে কোনো ডিএনএ প্রোফাইল ছিল না। তবে এবার আশা জাগিয়েছে চুরির পর উদ্ধার হওয়া লেমুর। ভারতের পার্কে থাকা লেমুরের পরিচয় মিলবে পার্কে থাকা লেমুরের ডিএনএ প্রোফাইলে মাধ্যমে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সকালে গাজীপুর সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক রহমান এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি জানান, পার্কে থাকা লেমুরের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকার ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। ভারতে থাকা লেমুরের ডিএনএ নমুনার রিপোর্ট সংগ্রহ করে পার্কের লেমুরের ডিএনএ রিপোর্ট মেলানো হলেই নিশ্চিত হওয়া যাবে ভারতে থাকা লেমুরের মালিকানা।
পার্ক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ৬ আগস্ট বাংলাদেশের হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে অন্য দেশে পাচারকালে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও প্রাণীর সঙ্গে একটি পুরুষ ও একটি মাদী লেমুর উদ্ধার করা হয়েছিল। পরে লেমুর দুটিকে গাজীপুর সাফারি পার্কে হস্তান্তর করা হয়। পার্কে থাকাবস্থায় লেমুরের দুটি বাচ্চা জন্ম দিয়েছিল। সেখান থেকে একটি লেমুরের মৃত্যু হলে পার্কে থাকা তিনটি লেমুর ২০২৫ সালের ২২ মার্চ দিবাগত রাতে বেষ্টনীর নেট কেটে চুরির হয়ে যায়। চুরির ঘটনায় একই বছরের ২৪ মার্চ থানায় অভিযোগ দেওয়া হলে ৬ এপ্রিল মামলা রুজু হয়। এরপর ১৮ মার্চ রাতে রাজধানীর শ্যামবাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি লেমুর উদ্ধার করে পার্কে ফিরিয়ে আনা হয়।
মামলা রুজুর পর সাফারি পার্ক থেকে চুরি যাওয়া লেমুর উদ্ধার তদন্তে নামে সিআইডি। তদন্তের এক পর্যায়ে তারা জানতে পারেন, গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে চুরি হওয়া বিপন্ন প্রজাতির তিনটি রিংটেইল লেমুরের দুটিকে ভারতের গুজরাটে শীর্ষ ধনকুবের অনন্ত আম্বানির বন্য প্রাণী উদ্ধার ও সংরক্ষণ প্রকল্প বনতারা’য় শনাক্ত করা হয়েছে। সীমান্ত দিয়ে পাচারের পর একাধিক হাত ঘুরে লেমুর দুটি সেখানে প্রায় ৪৮ লাখ রুপিতে বিক্রি করা হয়েছে বলে তদন্তে নিশ্চিত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
এখন বনতারা কর্তৃপক্ষ প্রাণী দুটির পরিচয় নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের কাছে ডিএনএ প্রোফাইল চেয়েছে। কিন্তু গাজীপুর সাফারি পার্কে আগে থেকে লেমুর দুটির ডিএনএ প্রোফাইল না থাকায় সেগুলো যে বাংলাদেশ থেকে চুরি যাওয়া প্রাণী, তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে বর্তমানে সাফারি পার্কে থাকা লেমুরের ডিএনএ নমুনা পাচার হওয়া লেমুরের পরিচয় শনাক্তে আশা জাগিয়েছে। ভারতে পাচার হয়ে যাওয়া লেমুর দুটি একই পরিবারের হওয়ায় তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে পার্কে থাকা একটি লেমুরের। পার্কে থাকা লেমুরের ডিএনএ স্যাম্পল সংগ্রহ করে গত মার্চ মাসে ঢাকার ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। ল্যাব রিপোর্টের সঙ্গে ভারতের গুজরাটে বনতারায় থাকা লেমুরের ডিএনএ নমুনার মিল পাওয়া গেলে প্রকৃত বিষয়টি জানা যাবে বলে জানিয়েছেন গাজীপুর সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক রহমান।
তিনি বলেন, গাজীপুর সাফারি পার্কের দুটি লেমুরের সন্ধান ভারতের গুজরাটে পাওয়ার বিষয়টি পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে জানতে পেরেছি। তবে ভারতে থাকা লেমুর দুটি সাফারি পার্কের কি না তা নিশ্চিত করতে পারেননি কেউ। যদি ডিএনএ নমুনা থাকতো তাহলে নিশ্চিতভাবেই বলা যেত। বিমানবন্দর থেকে উদ্ধার হওয়া দুটি লেমুর সাফারি পার্কে দুটি বাচ্চার জন্ম দেয়। এরপর একটি লেমুরের মৃত্যু হয়। পার্ক থেকে চুরি যাওয়া তিনটি লেমুরের মধ্যে একটি উদ্ধার করা হয়েছে, যেটি পার্কেই রয়েছে। সেটির নমুনা সংগ্রহ করে আমরা ল্যাবে পাঠিয়েছি। আমরা আশাবাদী যে, পার্কে থাকা লেমুরের ডিএনএ নমুনার সঙ্গে ভারতে থাকা দুটি লেমুরের ডিএনএ নমুনা মিলবে।
ঢাকা বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম. কে. এম ইকবাল হোছাইন চৌধুরী বলেন, লেমুর দুটি চুরি যাওয়ার পর প্রথমে ডিবি পুলিশ ও পরে সিআইডি পুলিশ তদন্ত করে। তদন্তের মাধ্যমে সিআইডি জানিয়েছে ভারতের গুজরাটে সন্ধান পাওয়া লেমুরগুলো গাজীপুর সাফারি পার্কের হতে পারে। পার্কে থাকা লেমুরটি ও চুরি যাওয়া লেমুর দুটি একই পরিবারভুক্ত। চুরি যাওয়া ও পার্কে থাকা লেমুর একই পরিবারের হওয়ায় তাদের ডিএনএ একই থাকবে। পার্কের লেমুরের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে তা ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। ল্যাবের রিপোর্ট পাওয়া মাত্রই সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হবে।
বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক মো. ছানাউল্ল্যা পাটওয়ারী বলেন, আমাদের ডিএনএ প্রোফাইল সংগ্রহের সক্ষমতা রয়েছে। বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের ফরেনসিক ল্যাবও রয়েছে। ফলে ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করা কঠিন কোনো কাজ নয়। কিন্তু এর প্রয়োজনীয়তা হয়ত এর আগে এভাবে অনুভূত হয়নি। বন বিভাগের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনাও ছিল না।
বন বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বন্যপ্রাণী চোরাচালান ও পাচারের ঘটনা শনাক্ত এবং পাচার হওয়া প্রাণী দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে ডিএনএ প্রোফাইল গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।
এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. মনিরুল এইচ খান বলেন, যে প্রাণীর মূল্য বেশি সেই প্রাণীগুলোর ডিএনএ প্রোফাইলিং করা জরুরি। লেমুর মূল্যবান প্রাণী। এটির ডিএনএ প্রোফাইল করা জরুরি ছিল।
শিহাব খান/এফএ