দিনাজপুর মেডিকেল কলেজের এক সহযোগী অধ্যাপক ও এক প্রভাষক দীর্ঘদিন ধরে বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। তাদের একজন বিদেশে এবং অন্যজন দেশের বিভিন্ন স্থানে বেসরকারি হাসপাতালে ও চেম্বারে রোগী দেখছেন বলে জানা গেছে। দীর্ঘদিন কর্মস্থলে না ফেরায় দুজনেরই বেতন-ভাতা বন্ধ রেখেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ।
কলেজ সূত্রে জানা যায়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম খানকে গত বছরের ৪ নভেম্বর দিনাজপুর মেডিকেল কলেজের নিউরোসার্জারি বিভাগে বদলি করা হয়। এর আগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত থাকাকালে গত বছরের ১ নভেম্বর অপারেশন থিয়েটারে অ্যানেস্থেসিওলজি বিভাগের এক নারী রেসিডেন্ট চিকিৎসকের সঙ্গে অশালীন আচরণের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
এ ঘটনার প্রতিবাদে সহকর্মী চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা হাসপাতালের ভেতরে বিক্ষোভ মিছিল করেন এবং অস্ত্রোপচার কক্ষের সেবা বন্ধ করে দেন। পরে জরুরি বৈঠক করে তাকে সাংগঠনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়।
এই ঘটনার তিন দিনের মাথায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যুগ্মসচিবের সই করা আদেশে তাকে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে বদলি করা হয়। দিনাজপুরে বদলির পর প্রথম কয়েক মাস নিয়মিত অফিস করলেও চলতি বছরের ১৯ মে’র পর থেকে তিনি আর কর্মস্থলে যাননি।
দিনাজপুর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. শেখ সাদেক আলী বলেন, সর্বশেষ ১৯ মে ডা. শামসুল কলেজে এসেছিলেন। এরপর দুই দিনের ছুটি নিয়ে আর কর্মস্থলে ফেরেননি। অনুপস্থিতির বিষয়ে গত ১২ ও ১৮ আগস্ট তাকে দুবার শোকজ করা হলেও তিনি জবাব দেননি। পরে আবারও শোকজ করা হয়েছে।
অধ্যক্ষ বলেন, নিয়মিত অনুপস্থিতির কারণে তার বেতন-ভাতা বন্ধ রাখা হয়েছে। মুঠোফোনে একাধিকবার কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার অনুরোধ করা হলেও তিনি অসুস্থতাসহ বিভিন্ন কারণ দেখিয়েছেন।
তবে ডা. শামসুল ইসলাম খান তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা এবং স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) আজীবন সদস্য হওয়ার কারণে মিথ্যা অভিযোগে তাকে সরানো হয়েছে।
বেতন বন্ধের বিষয়ে তিনি জানান, বদলির চেষ্টা করছেন। বদলি হয়ে গেলে বেতন-ভাতার জন্য আবেদন করবেন। তার দাবি, ২৮ বছর চাকরি করায় তার অনেক ছুটি পাওনা রয়েছে এবং সেই ছুটির বিপরীতে বেতন-ভাতা পাওয়ার আবেদন করবেন।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ডা. শামসুল ইসলাম খান কক্সবাজারে বদলি নেওয়ার চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও চেম্বারে রোগী দেখছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের প্রভাষক ডা. সঙ্গীতা চৌধুরী প্রায় ১০ মাস ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। কলেজ কর্তৃপক্ষের দাবি, তিনি কোনো ছুটি না নিয়ে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন এবং তার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একাধিকবার চিঠি পাঠানো হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
অধ্যক্ষ ডা. শেখ সাদেক আলী বলেন, পরে জানা গেছে ডা. সঙ্গীতা চৌধুরী দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। বর্তমানে তিনি ইন্দোনেশিয়ায় আছেন। দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকায় তার বেতন-ভাতাও বন্ধ রাখা হয়েছে।
কলেজ সূত্রে আরও জানা যায়, সহযোগী অধ্যাপক শাহীন আক্তার সুমিও কিছুদিন বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। পরে সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী নিয়ম মেনে বদলি নিয়ে অন্যত্র গেছেন বলে জানিয়েছেন অধ্যক্ষ। তবে তিনি দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত বলে কলেজ সূত্রে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষকরা দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলেও তাদের পদ শূন্য না হওয়ায় ওই পদে নতুন শিক্ষক নিয়োগ বা পদায়ন করা যাচ্ছে না। ফলে শিক্ষক সংকটে থাকা দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে শিক্ষার্থীদের পাঠদান আরও ব্যাহত হচ্ছে।
কলেজের তৃতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, এমনিতেই কলেজে শিক্ষক সংকট রয়েছে। এর মধ্যে পদে থেকেও শিক্ষক অনুপস্থিত থাকায় শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি আরও বেড়েছে। দ্রুত শিক্ষক সংকট নিরসনের দাবি জানান তিনি।
‘নিরাপদ ঔষুধ চাই’ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবু বক্কর সিদ্দিক রাব্বী বলেন, বিনা অনুমতিতে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন হলে আইন অনুযায়ী আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
কলেজ কর্তৃপক্ষের দাবি, নিয়ম অনুযায়ী দীর্ঘদিন অনুপস্থিত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তবে সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী দুই মাসের বেশি অনুমোদনহীন অনুপস্থিতির ক্ষেত্রে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান থাকলেও তাদের ক্ষেত্রে এখনো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এমদাদুল হক মিলন/কেএইচকে