অনেক দিনের পুরোনো একটি বই হাতে নিলে শুধু তার পাতায় জমে থাকা ইতিহাসই চোখে পড়ে না, নাকে পৌঁছায় এক অদ্ভুত পরিচিত সুবাসও। কারো কাছে তা শৈশবের স্কুল লাইব্রেরির স্মৃতি, কারো কাছে পুরোনো বইয়ের দোকানে কাটানো সময়। আবার কারো মনে এই গন্ধ ফিরিয়ে আনে বহু বছর আগের কোনো প্রিয় বই পড়ার মুহূর্ত। বইপ্রেমীদের কাছে এই গন্ধের আলাদা আকর্ষণ আছে। অনেকেই হয়তো ভাবেন, পুরোনো বইয়ের নিজস্ব কোনো বিশেষ সুগন্ধ রয়েছে। আসলে বিষয়টি একটু অন্যরকম।
কাগজের বয়স বাড়লে যা ঘটে
কাগজ তৈরির প্রধান উপাদানগুলোর একটি হলো কাঠ থেকে পাওয়া আঁশ। এতে সেলুলোজের পাশাপাশি লিগনিনসহ আরও কিছু রাসায়নিক উপাদান থাকে। বছরের পর বছর ধরে আলো, বাতাস, আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার প্রভাবে এসব উপাদানের মধ্যে ধীরে ধীরে পরিবর্তন ঘটতে থাকে।
বিশেষ করে পুরোনো কাগজে অ্যাসিড-নির্ভর রাসায়নিক বিক্রিয়া চলতে থাকলে কাগজের কিছু উপাদান ভেঙে যেতে শুরু করে। তখন একাধিক উদ্বায়ী রাসায়নিক পদার্থ তৈরি হয়। এগুলো বাতাসে ছড়িয়ে পড়ার পরই আমাদের নাকে পৌঁছায় সেই বিশেষ পুরোনো বইয়ের গন্ধ।
এই গন্ধের পেছনে একক কোনো রাসায়নিক পদার্থ দায়ী নয়। বরং বিভিন্ন যৌগের সম্মিলিত প্রভাবেই তৈরি হয় বইটির স্বতন্ত্র সুবাস।
ভ্যানিলার সঙ্গে মিল যেখানে
পুরোনো বইয়ের গন্ধকে অনেকে ভ্যানিলার সঙ্গে তুলনা করেন। এর একটি কারণ হলো ভ্যানিলিন নামের একটি যৌগ। পুরোনো কাগজে লিগনিনের অবক্ষয়ের ফলে ভ্যানিলিন তৈরি হতে পারে এবং এই যৌগের সুবাস ভ্যানিলার পরিচিত গন্ধের সঙ্গে মেলে।
তবে বইয়ের গন্ধ শুধু ভ্যানিলিনের কারণে হয়-এমনটা ভাবা ঠিক নয়। কাগজের বিভিন্ন উপাদান থেকে তৈরি আরও অনেক উদ্বায়ী যৌগ একসঙ্গে মিশে সেই গন্ধ তৈরি করে। কোনো কোনো যৌগ বাদাম বা কাঠের মতো অনুভূতি দিতে পারে, আবার কোনোটি মিষ্টি কিংবা ফুলের গন্ধের সঙ্গে মিল তৈরি করতে পারে। এই কারণেই একেকটি পুরোনো বইয়ের গন্ধ একেক রকম মনে হয়।
সব পুরোনো বইয়ের গন্ধ এক নয়
এখানেই রয়েছে আরও মজার বিষয়। সব পুরোনো বই খুললে কিন্তু একই গন্ধ পাওয়া যায় না। কারণ প্রতিটি বইয়ের কাগজ, কালি, আঠা এবং সংরক্ষণের পরিবেশ এক নয়।
কোন ধরনের কাগজ ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি তৈরির সময় কী উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে, বইয়ের মুদ্রণে কোন কালি বা আঠা ব্যবহার হয়েছে-এসবই বইয়ের গন্ধে প্রভাব ফেলতে পারে। এমনকি বইটি বছরের পর বছর কোথায় রাখা হয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
শুষ্ক ও পরিচ্ছন্ন জায়গায় রাখা বইয়ের গন্ধ একরকম হতে পারে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে থাকা বইয়ে ভ্যাপসা গন্ধ তৈরি হতে পারে।
ধুলা, ধোঁয়া, রান্নাঘরের গন্ধ, পারফিউম কিংবা আশপাশের অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থও বছরের পর বছর ধরে কাগজে প্রভাব গন্ধকে বদলে দিতে পারে।
গন্ধ বিশ্লেষণ করেও বই পরীক্ষা করা যায়
বইয়ের গন্ধ নিয়ে গবেষণা শুধু কৌতূহলের বিষয় নয়। সংরক্ষণবিদদের কাছেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। বই বা ঐতিহাসিক নথি থেকে বের হওয়া উদ্বায়ী রাসায়নিক যৌগ বিশ্লেষণ করে কাগজের অবক্ষয়ের ধরন সম্পর্কে ধারণা নেওয়া সম্ভব।
এ ধরনের গবেষণায় ম্যাটেরিয়াল ডিগ্রাডোমিক্স পদ্ধতির ব্যবহারও দেখা গেছে। এর বিশেষত্ব হলো, পুরোনো নথি বা বইয়ের পাতা কেটে পরীক্ষা করার প্রয়োজন হয় না। গন্ধের সঙ্গে যুক্ত রাসায়নিক উপাদান বিশ্লেষণ করেই কাগজের অবস্থার কিছু ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
পুরোনো কাগজের সুবাসকে মানুষের পরিচিত বিভিন্ন গন্ধের সঙ্গে তুলনা করার জন্য গবেষণায় \'হিস্টোরিক পেপার ওডর হুইল\' -এর মতো নির্দেশিকাও তৈরি হয়েছে। সেখানে চকলেট, কফি, ভ্যানিলাসহ নানা ধরনের গন্ধের সঙ্গে পুরোনো কাগজের সুবাসের তুলনা করা হয়।
নতুন বইয়ে কেন সেই মায়াবী গন্ধ নেই?
নতুন বইয়ের কাগজে সাধারণত পুরোনো কাগজের মতো দীর্ঘ সময়ের রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটেনি। তার ওপর আধুনিক বইয়ের কাগজ তৈরির পদ্ধতিও অনেক বদলে গেছে। উন্নতমানের কাগজে লিগনিনের পরিমাণ কম রাখা হয়, যাতে কাগজ দ্রুত হলুদ হয়ে না যায় এবং দীর্ঘদিন ভালো থাকে।
ফলে কয়েক দশক ধরে পুরোনো হওয়া কাগজে যে ধরনের যৌগ তৈরি হতে পারে, নতুন বইয়ে শুরুতেই সেগুলোর একই মাত্রা থাকে না।
আরও পড়ুন
মানুষ প্যারার মধ্যেই হাসির কারণ খুঁজে নেয়
তাই পুরোনো বইয়ের সেই মিষ্টি গন্ধ আসলে এক ধরনের রাসায়নিক স্মৃতি। একটি বই যত পুরোনো হয়, তার পাতায় তত জমতে থাকে সময়ের ছাপ। আর সেই ছাপেরই একটি অংশ আমরা অনুভব করি নাকে-কখনো ভ্যানিলা, কখনো কফি, কখনো কাঠের মতো পরিচিত কোনো সুবাস হিসেবে।
আরও পড়ুন
‘নৌকাডুবি’ আজও কেন জনপ্রিয় মানুষের কাছে
বইয়ের পাতার সেই গন্ধ তাই শুধু নস্টালজিয়া নয়, এটি কাগজের বয়স, পরিবেশ এবং ধীরে ধীরে বদলে যাওয়ার এক অদৃশ্য গল্প।
সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট, টাইমস অব ইন্ডিয়া
এসএকেওয়াই