শিশুর হাতে ডিজিটাল ডিভাইস এখন আর কোনো বিরল দৃশ্য নয়। দুই বছরের শিশুটির কান্নাকাটি থামানো কিংবা নিজের একটু কাজের ফুরসত পেতে অনেক অভিভাবকই নির্দ্বিধায় কচি হাতে তুলে দিচ্ছেন ডিজিটাল ডিভাইস। আপাতদৃষ্টিতে শিশুকে যা শান্ত রাখার জাদুকরী কৌশল মনে হচ্ছে, তার নেপথ্যে আছে স্বাস্থ্য ও মানসিক বিপর্যয়।
ডিভাইসের এই রঙিন ও আকর্ষক ভার্চুয়াল জগতের মোহে হারিয়ে যাচ্ছে শিশুদের সামাজিক বিকাশ, শৈশবের স্বাভাবিক চঞ্চলতা এবং শারীরিক সুস্থতা। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শৈশবে অনিয়ন্ত্রিত স্ক্রিন-টাইমের প্রভাব সাময়িক কোনো সমস্যা নয়, এটি রেখে যাচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি ও অপরিবর্তনীয় ক্ষতির ছাপ।
ব্রিটেনের এক যুগান্তকারী গবেষণায় এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন গবেষকরা। গবেষণায় সতর্ক করে বলা হয়েছে, এ বয়সে স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে শিশুদের বিকাশে বড় ধরনের উদ্বেগজনক প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি স্মার্টফোন, ট্যাবলেট এবং অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস শিশুদের জন্য যে ঝুঁকি তৈরি করে; তা নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে আরও তদন্তের আহ্বান জানানো হয়েছে।
আরও পড়ুন
শিশুর জন্মের পর থেকে মায়ের যত্ন কেমন হবে?
শিশুর বিকাশে বাধা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
যুক্তরাজ্য ভিত্তিক গবেষণার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অল্প বয়সে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাভাবিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করে। দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য সব ধরনের স্ক্রিন-টাইম ক্ষতিকর। দ্রুত পরিবর্তনশীল দৃশ্যের আলো শিশুর মস্তিষ্কের স্বাভাবিক গঠনে বিঘ্ন ঘটায়।
এর ফলে ‘স্পিচ ডিলে’ বা দেরিতে কথা বলা, মনোযোগের চরম ঘাটতি এবং অন্যের আবেগ অনুধাবন করতে না পারার মতো সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এমনকি কান্নাকাটি থামানো বা শান্ত হওয়ার জন্য শিশুরা এখন মা-বাবার বদলে ডিভাইসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
শারীরিক সমস্যা
দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের সামনে থাকায় শিশুদের চোখে মায়োপিয়া ও ড্রাই আই সিন্ড্রোম দেখা দিচ্ছে। ডিভাইসের নীল আলো মস্তিষ্কে মেলোটোনিন হরমোন নিঃসরণে বাধা দেয়, যা স্বাভাবিক ঘুম নষ্ট করে শিশুকে মেজাজী করে তোলে। এ ছাড়া কায়িক পরিশ্রমের অভাবে বাড়ছে শৈশবকালীন স্থূলতা ও মেরুদণ্ডের ক্ষতি।
আরও পড়ুন
শিশুর লেখাপড়ার হাতেখড়িতে মায়ের করণীয়
আচরণগত পরিবর্তন
বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শিশুরা সামাজিকভাবে একা হয়ে পড়ছে। খেলাধুলা বা সহপাঠীদের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি না হওয়ায় সামান্যতেই চরম রেগে যাওয়া বা হিংস্র আচরণ করার প্রবণতা দেখা দিচ্ছে।
এড়িয়ে চলার উপায়
প্রযুক্তি এড়িয়ে চলা অসম্ভব হলেও শিশুরা যেন প্রযুক্তির দাস না হয়ে পড়ে, তা নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে দুই বছর বয়স পর্যন্ত শিশুকে পুরোপুরি স্ক্রিন-মুক্ত রাখা এবং পরবর্তীতে দৈনিক সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টা ভালো মানের কনটেন্টে সীমাবদ্ধ রাখার সময়সীমা মেনে চলা উচিত।
স্মার্টফোনের বদলে শিশুর হাতে ছড়ার বই, কাঠের ব্লক বা শিক্ষণীয় খেলনা, রং-পেন্সিল তুলে দিয়ে বিকল্প আনন্দ পেতে উৎসাহ দিতে হবে এবং প্রতিদিন নিয়ম করে খোলা মাঠে অন্য শিশুদের সঙ্গে শারীরিক খেলাধুলার মাধ্যমে প্রকৃতির সান্নিধ্য দিতে হবে। পাশাপাশি শিশুদের সামনে অভিভাবকদের নিজেদের ফোন ব্যবহার কমিয়ে সন্তানকে পর্যাপ্ত ‘কোয়ালিটি টাইম’ দিতে হবে।
আরও পড়ুন
শহরের শিশুরা কেন ঘরের মধ্যে আটকে থাকে?
শিশুরা যেন রঙিন পর্দার কৃত্রিম আলোর কারণে বাস্তব শৈশবকে আড়াল করতে না পারে এবং তাদের হাতে তুলে দেওয়া যায় মুক্ত আকাশ ও সুস্থ শৈশব; সেদিকে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।
এসইউ