‘তারা ভরা রাতে তোমার কথা যে মনে পড়ে বেদনায়’ কিংবা ‘আমি রূপনগরের রাজকন্যা/ রূপের জাদু এনেছি’সহ অসংখ্য কালজয়ী গানের রচয়িতা একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি ও গীতিকার আজিজুর রহমানের ৪৮তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৯৭৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। সে সময় তাকে ভর্তি করা হয় তৎকালীন ঢাকার পিজি হাসপাতালে। ১২ সেপ্টেম্বর গ্যাংগ্রিন রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
দেশের কাব্য এবং সংগীত রচনায় এক অবিস্মরণীয় নাম কবি আজিজুর রহমান। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মানুষটি কবিতা দিয়ে লেখালেখি শুরু করলেও গানই তাকে সবার মাঝে সমাদৃত করে। বাঙালি মুসলমান গীতিকারদের মধ্যে গানের সংখ্যায় কবি নজরুলের পরই তাঁর স্থান। কবি আজিজুর রহমান ৩ হাজারেরও বেশি গান এবং তিনশর বেশি কবিতা লিখেছেন। ঢাকার প্রায় প্রখ্যাত সব সুরকাররা তাঁর লেখা গানে সুর দিয়েছেন, আবার গেয়েছেনও খ্যাতনামা প্রায় সব শিল্পীই।
একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি আজিজুর রহমানের মৃত্যুর প্রায় অর্ধশত বছর হতে চললেও সরকারিভাবে স্মৃতি সংরক্ষণে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অবহেলিত অবস্থায় আছে তাঁর বসতভিটা ও সমাধি চত্বর। নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে সমাধিস্থলসহ স্মৃতিচিহ্ন। প্রতি বছর নীরবে-নিভৃতে চলে যায় কবির জন্ম ও মৃত্যু বার্ষিকী। স্থানীয় বা রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবস দুটি উদযাপন করা হয় না। এবারও ১২ সেপ্টেম্বর কবির মৃত্যুবার্ষিকী ঘিরে নেই কোনো আয়োজন। তাই কবির পরিবার এবং স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মী-সুধীজনদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ রয়েছে।
তাঁর বাস্তুভিটায় সরকারি উদ্যোগে অডিটোরিয়াম, লাইব্রেরি ও মিউজিয়াম নির্মাণের প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা থাকলেও মাজারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ছাড়া কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি। এলাকাবাসী মনে করেন, সরকারের গ্রহণকৃত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে এ প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য সহজেই কবির জীবনকর্ম ও সঠিক ইতিহাস জানার পাশাপাশি তাকে নিয়ে গবেষণার অপার সুযোগ সৃষ্টি হবে। সরকারি এ উদ্যোগকে কেন্দ্র করে সেখানে গড়ে উঠতে পারে সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র।
জানা যায়, ১৯১৭ সালের ১৮ জানুয়ারি কুষ্টিয়া সদর উপজেলার গড়াই নদীর তীরে হাটশ হরিপুর গ্রামে কবি আজিজুর রহমান জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা বশির উদ্দিন প্রামানিক, মা সবুরুন নেছা। ১৯৩১ সালে ঝিনাইদহ জেলার ফুল হরিগ্রামের আজহার সিকদারের মেয়ে ফজিলাতুন্নেসাকে বিয়ে করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ৩ ছেলে ও ৪ মেয়ের জনক।
কিশোর আজিজুর রহমান মাত্র ১০-১২ বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন। সহায়-সম্পত্তি দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে দিতে হয়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলেও প্রবল ইচ্ছা ও অনুসন্ধিৎসু মানসিকতার কারণে বিভিন্ন বই পড়ে স্বশিক্ষিত ব্যক্তিতে পরিণত হন। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সমাজসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। একাধারে কুষ্টিয়া হাটশ হরিপুর ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান, কুষ্টিয়া (নদীয়া) ফুড কমিটির সেক্রেটারি, বেঞ্চ অ্যান্ড কোর্ট ডিভিশনের চেয়ারম্যান, কুষ্টিয়া জেলা বোর্ড ও ডিস্ট্রিক্ট অ্যাডভাইজরি কমিটির সদস্যের পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন। ছাত্রাবস্থায় মুসলিম ছাত্র আন্দোলনেও ভূমিকা রেখেছেন এবং প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সদস্য মনোনীত হয়েছিলেন।
আরও পড়ুন
স্মৃতির অ্যালবামে নীললোহিত ও সাহিত্য পুরুষ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই আজিজুর রহমান গান রচনা শুরু করেন। তিনি একইসঙ্গে সাহিত্যচর্চা ও নাট্যাভিনয়ের সঙ্গেও জড়িত হন এবং নাটকের জন্য অনেক গান রচনা করেন। ১৯৩৮ সালে আজিজুর রহমান সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন এবং সওগাত, মোহাম্মদী, আজাদ, নবশক্তি, আনন্দবাজার, ভারতবর্ষ, বুলবুল, শনিবারের চিঠি ইত্যাদি পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। ১৯৫৪ সালে নিজস্ব শিল্পী হিসাবে তিনি ঢাকা বেতারে যোগদান করেন।
এ সময় বেতার-শিল্পীদের জন্য তিনি অনেক গান লিখেছেন। বিশেষত দেশাত্মবোধক ও ইসলামি গান রচনায় তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তাঁর রচিত ‘পলাশ ঢাকা কোকিল ডাকা আমার এ দেশ ভাইরে’ গানে বাংলাদেশের শস্যশ্যামল প্রকৃতি অত্যন্ত সার্থকভাবে ফুটে উঠেছে। তাঁর রচিত গানে পল্লি গায়ক আব্বাস উদ্দীন আহমদও কণ্ঠ দিয়েছেন। আজিজুর রহমান রচিত আব্বাস উদ্দীনের কণ্ঠে ‘কারও মনে দিও না ব্যথা’ গানটি অত্যন্ত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।
সাংবাদিক হিসেবেও তার খানিকটা পরিচিতি ছিল। অধুনালুপ্ত দৈনিক পয়গম পত্রিকায় ১৯৬৪ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত সাহিত্য বিভাগের সম্পাদক ছিলেন তিনি। ঢাকা থেকে প্রকাশিত কিশোর মাসিক ‘আলপনী’রও সম্পাদক ছিলেন একনিষ্ঠ এই কবি। সাহিত্যচর্চা শুরুর আগে নাটকে অভিনয়ে তাঁর উৎসাহ ছিল বেশি। ফলে শিলাইদহের ঠাকুর বাড়িতে তিনি গড়ে তোলেন একটি নাট্যদল। কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তিনি ও তাঁর দলের ব্যাপক সুনাম ও খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। সমাজসেবায় তিনি ছিলেন একজন নিবেদিত প্রাণ।
১৯৩৪ সালে তার দাদা চাঁদ প্রামানিকের নামে হরিপুর গ্রামে গড়ে তোলেন ‘চাঁদ স্মৃতি পাঠাগার’। এটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি পাঠাগার ছিল। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ বইয়ের খোঁজে আসতেন এই পাঠাগারে। তাঁর সাংগঠনিক ক্ষমতা ছিল প্রবল। কবি আজিজুর রহমানই প্রথম তাঁর জন্মস্থান কুষ্টিয়া জেলার ইতিহাস রচনায় উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।
তাঁর বিখ্যাত গানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- তোমার নামে তসবিহ খোদা/ লুকিয়ে যেন রাখি, পলাশ ঢাকা কোকিল ডাকা/ আমার এদেশ ভাইরে, রক্ত রঙিন উজ্জ্বল দিন/ বৃক্ষ শিখায় জ্বলছে, তারা ভরা রাতে তোমার কথা যে/ মনে পড়ে বেদনায়, মনরে এই ভবের নাট্যশালায়/ মানুষ চেনা দায়, আমি রূপনগরের রাজকন্যা/ রূপের জাদু এনেছি, এই সুন্দর পৃথিবীতে/ আমি এসেছিনু কিছু নিতে, এই রাত বলে ওগো তুমি আমার/ ওই চাঁদ বলে ওগো তুমি আমার, দেখ ভেবে তুই মন/ আপন চেয়ে পর ভালো তোর/ এই রাজধানীর বুকে/কত জীবনের আশা ভেঙে যায়।
এ ছাড়াও তিনশর ওপরে কবিতা রচনা করেছেন। তার মধ্যে ‘নৈশনগরী’, ‘মহানগরী’, ‘সান্ধ্যশহর’, ‘ফেরিওয়ালা’, ‘ফুটপাত’, ‘তেরশপঞ্চাশ’, ‘সোয়ারীঘাটের সন্ধ্যা’, ‘বুড়িগঙ্গার তীরে’, ‘পহেলা আষাঢ়’, ‘ঢাকাই রজনী’, ‘মোয়াজ্জিন’, ‘পরানপিয়া’ উল্লেখযোগ্য। কবিতাগুলো একসময় নবযুগ, নবশক্তি, আনন্দবাজার পত্রিকা, শনিবারের চিঠি, সওগাত, মোহাম্মাদী, আজাদ, বুলবুল পত্রিকায় নিয়মিত ছাপা হতো।
আরও পড়ুন
মহানন্দা নদী এবং আমিনুল ইসলামের কবিতায় জীবন-ভূগোল
গ্রন্থের মধ্যে ডাইনোসরের রাজ্যে (১৯৬২), জীবজন্তুর কথা (১৯৬২), ছুটির দিনে (১৯৬৩), এই দেশ, আবহাওয়ার পয়লা কেতাব তার উল্লেখযোগ্য অনুবাদগ্রন্থ। তাঁর প্রকাশিত আরও কিছু গ্রন্থ হচ্ছে ‘আজাদীর বীর সেনানী: কুমারখালীর কাজী মিয়াজান’, পাঁচমিশালী গানের সংকলন, দেশাত্মবোধক নিজস্ব গানের সংকলন ‘এই মাটি এই মন’, উপলক্ষের গান (১৯৭০) ইত্যাদি। এ ছাড়া কবির লেখা হামদ, নাত ও গজলের বইও রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, বহুগুণে গুণান্বিত একুশে পদকপ্রাপ্ত কবির শেষ অস্তিত্বটুকু হুমকির মুখে। দিন আসে দিন যায়, কবি আজিজুর রহমানের শেষ স্মৃতিটুকু ক্ষয়ে যায়। সদর উপজেলার হাটশ হরিপুর ইউনিয়নের বাজারের পাশে রয়েছে কবির সমাধিস্থল। কবির মাজার রক্ষায় নেওয়া হয়নি কোনো পদক্ষেপ। কবি আজিজুর রহমান আরও অনেকের মতো আমাদের সমাজের ভাগ্যহীন সাহিত্যশিল্পী। জীবনের শেষ দিনগুলোতে নানা দুশ্চিন্তা, আর্থিক অনটন ও রোগব্যাধিতে জর্জরিত ছিলেন তিনি। অর্থ সংকটের কারণে চিকিৎসা পর্যন্ত করাতে পারেননি। গ্যাংগ্রিন রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি।
হাটশ হরিপুরে প্রায় এক একর জায়গা নিয়ে কবির বাস্তুভিটায় বর্তমানে কবির দুই ভাইয়ের সন্তান এবং কবির বড় ছেলে মৃত ফজলুর রহমান মনি মিয়ার ছোট ছেলে আশফাকুর রহমান লিটন ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা বসবাস করছেন। ক্ষোভ এবং হতাশা প্রকাশ করে কবির নাতি আশফাকুর রহমান লিটন বলেন, ‘কবির স্মৃতি রক্ষায় এখানে একাডেমি, মিউজিয়াম নির্মাণসহ সরকারিভাবে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করার কথা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এমনকি জন্ম এবং মৃত্যু বার্ষিকীও রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা হয় না। যা অত্যন্ত বেদনার এবং লজ্জার। আমদের দাবি, কালজয়ী এই ব্যক্তিত্বের স্মৃতি রক্ষার্থে সরকারি যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘কবি আজিজুর রহমান তাঁর জীবদ্দশায় যা রচনা করেছেন; তাঁর অধিকাংশই অগ্রন্থিত এবং আজও অনেক কিছুই অপ্রকাশিত রয়েছে। যা আমাদের জন্য দুঃখজনক। এগুলো এখনো যদি প্রকাশের ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে তাঁর প্রতি সামান্য শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করা হবে।’
কবি আজিজুর রহমান ছিলেন একাধারে কবি, গীতিকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার এবং জনপ্রতিনিধি। তাঁর সৃষ্টির পরিধি ও বৈচিত্র্য কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে। তাঁর লেখা অনেক কালজয়ী গান আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, গুণী মানুষটির স্মৃতি ও বাস্তুভিটা আজ অবহেলিত; জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। তাঁকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও স্মরণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগও দৃশ্যমান নয়।
সম্মিলিত সামাজিক জোটের চেয়ারম্যান লেখক-গবেষক ড. আমানুর আমান বলেন, ‘সংস্কৃতির রাজধানী হিসেবে পরিচিত কুষ্টিয়ার জন্য এ বাস্তবতা নিঃসন্দেহে বেমানান। আমার বিবেচনায়, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি প্রাথমিকভাবে প্রয়োজন একটি শক্তিশালী নাগরিক উদ্যোগ। কবি আজিজুর রহমানের বাস্তুভিটা সংরক্ষণ, তাঁর সাহিত্য ও সংগীতকর্মের যথাযথ মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তাঁর অবদান তুলে ধরার দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে।’
আরও পড়ুন
মানবতা ও স্বাধীনতার পক্ষে নজরুল সমতুল্য কেউ নেই: আবদুল হাই শিকদার
কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মিজানুর রহমান বলেন, ‘রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো দিবস উদযাপন করতে হলে সরকারি সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। আমরা কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরকারের উচ্চপর্যায়ে কথা বলে এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব।’
এএমএস/এসইউ