শিরোপা জেতেননি, বিশ্বকাপের ফাইনালেও উঠতে পারেননি। তবু এবারের ব্যালন ডি’অর নিজেরই প্রাপ্য বলে মনে করছেন কিলিয়ান এমবাপে। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ট্রফিহীন মৌসুম কাটালেও ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে নিজেকে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে রাখছেন ফরাসি এই তারকা। এমনকি ব্যালন ডি’অর নিয়ে নিজের ধারণার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে টেনে এনেছেন লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর দীর্ঘ আধিপত্যের সময়কেও।
ফ্রান্স ফুটবলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমবাপে বলেছেন, এ বছর ব্যালন ডি’অর জেতা তার অন্যতম লক্ষ্য। ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে বড় কোনো শিরোপা না জেতার বিষয়টি তার দাবিকে দূর্বল করে না বলেও মনে করেন তিনি। কারণ, তার মতে ব্যালন ডি’অর মূলত ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কার।
২৭ বছর বয়সী এমবাপে বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, এ বছর আমি এটি জিততে পারি। এটি আমার অন্যতম লক্ষ্য। মানুষ বলে, আমি কোনো ট্রফি জিতিনি। কিন্তু এটি তো ব্যক্তিগত পুরস্কার। আমি কখনো দেখিনি কোনো ব্যালন ডি’অর বিজয়ী সর্বসম্মতভাবে নির্বাচিত হয়েছে।’
এমবাপের যুক্তি, যদি কোনো খেলোয়াড়কে সবাই ভোট দিয়ে বিজয়ী করতেন, তাহলেই কেবল বলা যেত যে পুরস্কারটি নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। ‘কেউ কি কখনো ১০০ শতাংশ ভোটে ব্যালন ডি’অর জিতেছে? এর অর্থ হলো, সবসময়ই এমন কেউ থাকেন, যিনি মনে করেন বিজয়ী এই পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য ছিলেন না,’ বলেন তিনি।
গোলই নিজের পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি
এবারের মৌসুমে এমবাপের ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান অবশ্য তার দাবিকে জোরালো করার মতোই। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে করেছেন ১৫ গোল, লা লিগায় ২৫টি। অর্থাৎ ইউরোপের ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে বড় দুই মঞ্চেই গোলের দিক থেকে ছিলেন দুর্দান্ত।
জাতীয় দলের হয়েও বিশ্বকাপে নিজের রেকর্ড আরও সমৃদ্ধ করেছেন তিনি। এবারের আসরে গোল করে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন এমবাপ্পে। বিশ্বকাপে তার মোট গোলসংখ্যা এখন ২২।
তবে ফ্রান্সের বিশ্বকাপ যাত্রা থেমেছে সেমিফাইনালেই। স্পেনের কাছে ২-০ গোলে হেরে ফাইনালে ওঠা হয়নি তাদের। আর রিয়াল মাদ্রিদের হয়েও এবার কোনো বড় ট্রফি জেতা হয়নি এমবাপ্পের। তবু ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের বিচারে নিজেকে অন্যদের চেয়ে আলাদা মনে করছেন তিনি।
‘ব্যালন ডি’অর নিয়ে আমার ধারণা তৈরি হয়েছে মেসি ও রোনালদোর যুগ দেখে। আপনি সাধারণ খেলোয়াড়কে এই পুরস্কার দেবেন না; দেবেন এমন খেলোয়াড়কে, যে অন্যদের চেয়ে আলাদা। আমার মনে হয়, এ বছর আমি এমন কিছু করেছি, যা আলাদা। তাই আমি বিশ্বাস করি, আমি এটি জিততে পারি,’ বলেন এমবাপে।
আমার চেয়ে ভালো কোনো খেলোয়াড় নেই
ব্যালন ডি’অর জেতার যোগ্যতা নিজের আছে কি না- সরাসরি জানতে চাওয়া হলে আরও আত্মবিশ্বাসী উত্তর দেন এমবাপে। ‘আমার চেয়ে ভালো কোনো খেলোয়াড় ছিল না,’ বলেন তিনি।
এরপর নিজের দাবির পক্ষে যুক্তিও দিয়েছেন রিয়াল তারকা। ‘আমরা অর্জনের কথা বলছিলাম। বড় প্রতিযোগিতাগুলোতে এত গোল করা, যেখানে বিশ্বের সব বড় খেলোয়াড় থাকে; আর অবশ্যই বিশ্বকাপে, সবচেয়ে বড় মঞ্চে, সেই প্রতিযোগিতার ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া- আমার পুরো ছুটির সময় মানুষ আমার সঙ্গে এসব নিয়েই কথা বলেছে’- বলেন এমবাপে।
বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার বিষয়টির গুরুত্বও আলাদা করে তুলে ধরেছেন এমবাপে। তার মতে, বিশ্বকাপ এমন একটি মঞ্চ, যেখানে ফুটবল ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়েরা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন।
‘বিশ্বকাপ কী বোঝায়, সেটা পুরোপুরি উপলব্ধি করা কঠিন। এটি বড় খেলোয়াড়, তারকা এবং ফুটবল ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়দের প্রতিযোগিতা। আর ২৭ বছর বয়সেই আপনি যখন নিজেকে বলতে পারেন, এই প্রতিযোগিতায় আমিই সবচেয়ে বেশি গোল করেছি- এটা বিশেষ কিছু,’ বলেন তিনি।
মেসির রেকর্ড ভেঙে আরও গর্বিত এমবাপে
এমবাপের কাছে বিশ্বকাপের গোলের রেকর্ডটির আরেকটি বিশেষ তাৎপর্য আছে। কারণ, যে রেকর্ড তিনি ভেঙেছেন, সেটি এতদিন ছিল লিওনেল মেসির দখলে। এমবাপে বলেন, ‘আরও বিশেষ বিষয় হলো, আপনি এই রেকর্ডটি লিওর কাছ থেকে নিয়েছেন। অনেকের কাছেই ক্রিশ্চিয়ানোর সঙ্গে মেসিই ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়। এমন অর্জন সত্যিই আলাদা।’
মেসি-রোনালদোর যুগের কথা বারবার টেনে আনার পেছনে তাই নিজের ব্যালন ডি’অর দাবির একটি দর্শনও তুলে ধরেছেন এমবাপে। তার মতে, এই পুরস্কার কেবল শিরোপার হিসাব নয়; বরং এমন ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি, যা একজন খেলোয়াড়কে অন্যদের থেকে আলাদা করে দেয়।
সাক্ষাৎকারে ফ্রান্সের নতুন কোচ জিনেদিন জিদানের নিয়োগ নিয়েও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন এমবাপ্পে। দিদিয়ের দেশমের জায়গায় ফ্রান্স জাতীয় দলের দায়িত্ব নিয়েছেন দেশটির কিংবদন্তি এই ফুটবলার।
জিদানকে নিয়ে এমবাপের উচ্ছ্বাসের কারণও স্পষ্ট। ফ্রান্সের মানুষের কাছে জিদান শুধু একজন সাবেক ফুটবলার নন, তিনি জাতীয় ফুটবলের অন্যতম বড় প্রতীক।
‘ফরাসিদের কাছে তিনি অনেক কিছু। তিনি একজন কিংবদন্তি। তিনি আমাদের দেশের ‘জিজু’- তিনি কমনীয়তা ও মহত্ত্বের প্রতীক। খেলোয়াড় হিসেবে জাতীয় দলের ইতিহাসে তার অসাধারণ অবদান রয়েছে এবং তিনি কিছু অবিস্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন,’ বলেন এমবাপে।
জিদানকে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ছাড়িয়ে যাওয়া এক তারকা হিসেবেও বর্ণনা করেছেন তিনি। ‘সম্ভবত ফ্রান্স দলকে সবচেয়ে বেশি ধারণ করেন এমন খেলোয়াড় তিনিই। তিনি সেই খেলোয়াড়দের একজন, যিনি প্রজন্মের সীমা ছাড়িয়ে গেছেন। ফরাসি ফুটবলের ইতিহাসে তিনি এমন একটি ছাপ রেখে গেছেন, যা কখনো মুছে যাওয়ার নয়।’
এবার তাই এমবাপের সামনে দুটি বড় আকাঙ্ক্ষা- একদিকে জিদানের অধীনে নতুন ফ্রান্সের অধ্যায়, অন্যদিকে ক্যারিয়ারের প্রথম ব্যালন ডি’অর। ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান দিয়ে নিজের দাবিকে জোরালো করলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন ভোটাররা। তবে ‘আমার চেয়ে ভালো কোনো খেলোয়াড় ছিল না’- এমবাপের এমন সরাসরি দাবি যে এবারের ব্যালন ডি’অর বিতর্ককে আরও উত্তপ্ত করে তুলবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
আইএইচএস/