পেটে ব্যথা নিয়ে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে এসেছিলেন সদর উপজেলার মাহিদিয়া গ্রামের হাফিজুর রহমান। বহির্বিভাগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পর হাসপাতাল থেকে বের হতেই তাকে ঘিরে ধরেন এক দালাল। চিকিৎসকের দেওয়া পরীক্ষা-নিরীক্ষা কম খরচে করিয়ে দেওয়ার কথা বলে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালের সামনের একটি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। সেখানে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে তার কাছ থেকে নেওয়া হয় অতিরিক্ত দেড় হাজার টাকা।
একইভাবে সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি এলাকার নাসিমা বেগম এসেছিলেন বহির্বিভাগে চিকিৎসক দেখাতে। টিকিট কাউন্টারের সামনে আসতেই একজন তাকে দ্রুত চিকিৎসক দেখিয়ে দেওয়ার কথা বলে একটি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে চিকিৎসক দেখানোর জন্য দাবি করেন ২০০ টাকা। বিষয়টি বুঝতে পেরে সেখান থেকে চলে আসেন নাসিমা।
হাফিজুর ও নাসিমার মতো প্রতিদিনই যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে দালালের খপ্পরে পড়ছেন রোগী ও স্বজনরা। কখনো কম খরচে পরীক্ষা করিয়ে দেওয়ার কথা বলে, কখনো দ্রুত চিকিৎসক দেখানোর প্রলোভনে, আবার কখনো সরকারি হাসপাতালে ভালো চিকিৎসা হবে না—এমন ভয় দেখিয়ে তাদের নেওয়া হচ্ছে আশপাশের বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। এতে একদিকে বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে রোগীদের, অন্যদিকে ভুল বা অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।
আরও পড়ুন
সোনারগাঁ / রোগী থেকে হাসপাতাল দালালের দৌরাত্ম্যে সবাই অসহায়
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, সরকারি এই হাসপাতালে অর্ধশতাধিক দালাল সক্রিয়। বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ওষুধের ফার্মেসির হয়ে কাজ করা এসব দালাল রোগী ভাগিয়ে নিয়ে কমিশন আদায় করেন। তাদের সঙ্গে হাসপাতালের কতিপয় কর্মচারী ও কিছু চিকিৎসকেরও যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এ তৎপরতা এখন হাসপাতালের ‘বিষফোঁড়া’য় পরিণত হয়েছে।
সরকারি সেবার রোগী, গন্তব্য বেসরকারি ক্লিনিক
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি হাসপাতালে এক্স-রে করতে খরচ হয় ২০০ টাকা, ইসিজি ৮০ টাকা এবং আলট্রাসনোগ্রাম ১১০ টাকা। কিন্তু একই ধরনের পরীক্ষা বেসরকারি হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে করতে গেলে এর প্রায় তিনগুণ পর্যন্ত খরচ হয়। এর বাইরে রক্ত, প্রস্রাবসহ বিভিন্ন পরীক্ষার খরচও রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের এসব সেবার কথা বলে বিভিন্নভাবে বাইরে নিয়ে যান দালালরা। এর বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে কমিশন পান তারা। কেউ কেউ রোগীপ্রতি সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন পান বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সকাল থেকেই টিকিট কাউন্টারে দালালদের ভিড়
সূত্র জানায়, প্রতিদিন সকাল ৭টার পর থেকেই হাসপাতালের টিকিট কাউন্টারের সামনে জড়ো হতে থাকেন দালালরা। পরে তারা হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও বহির্বিভাগে ছড়িয়ে পড়েন। সহজ-সরল রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে প্রথমে হাসপাতালের চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়ে তাদের মধ্যে ভয় বা বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়। এরপর বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় নির্দিষ্ট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব দালালের বড় একটি অংশ হাসপাতালের আশপাশের এলাকার বাসিন্দা। ফলে তারা নানা ধরনের প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এ কাজ করে আসছেন।
কয়েক বছর আগে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিল। রোগী ও স্বজনদের সচেতন করতে হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে ১০টি প্রচার মাইক বসানো হয়েছিল। টিকিট কাউন্টারের সামনে স্থাপন করা হয়েছিল তথ্যকেন্দ্র। সেখানে একজন কর্মচারী রোগীদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও তথ্য দিয়ে সহায়তা করতেন।
আরও পড়ুন
চাঁদাবাজ-টেন্ডারবাজ-দালালদের দখলে ঢাকা মেডিকেল
তবে বর্তমানে প্রচার মাইকগুলো নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। তথ্যকেন্দ্রেও কোনো কর্মচারী দায়িত্ব পালন করছেন না বলে সূত্র জানিয়েছে। ফলে দালালদের তৎপরতার সুযোগ আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
‘নিজস্ব লোক’ দিয়ে রোগী ভাগানোর অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ, হাসপাতালকেন্দ্রিক দালালচক্রের সঙ্গে কয়েকজন কর্মচারীর সখ্য রয়েছে। তাদের কেউ কেউ সরাসরি দালালির সঙ্গে জড়িত বলেও অভিযোগ রয়েছে। আবার কয়েকজন চিকিৎসকের ‘নিজস্ব লোক’ হিসেবেও দালাল রয়েছে বলে সূত্রের দাবি।
অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে রোগীকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরামর্শ দেওয়া হয়। ব্যবস্থাপত্রে নির্দিষ্ট কোনো ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নামও উল্লেখ করে দেওয়া হয়। কখনো চিকিৎসকের কক্ষের সামনে অপেক্ষায় থাকা দালাল রোগীকে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যান। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে চিকিৎসকের সহকারী রোগীকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্ড দিয়ে সেখানে যেতে বলেন।
সূত্রের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকরা চিকিৎসক ও দালালের কমিশন আলাদাভাবে পরিশোধ করেন। আর নিজের চেষ্টায় রোগী ভাগিয়ে আনতে পারলে দালালরা সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন পান।
হাসপাতালের সক্ষমতার ঘাটতিও কাজে লাগাচ্ছে দালালচক্র
যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল নামের সঙ্গে ২৫০ শয্যার হলেও এখানে প্রায় তিনগুণ রোগী ভর্তি থাকেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। প্রতিদিন বহির্বিভাগেও দুই থেকে আড়াই হাজার রোগী চিকিৎসা নেন।
বিপুলসংখ্যক রোগীর বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা হাসপাতালের বর্তমান সক্ষমতার মধ্যে করা সম্ভব হয় না। ফলে অনেক রোগীকেই বাইরে থেকে পরীক্ষা করিয়ে রিপোর্ট নিয়ে আসতে হয়। আর এই সুযোগকেই কাজে লাগাচ্ছে দালালচক্র।
আরও পড়ুন
বেলকুচি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: দালালের উপদ্রবে অতিষ্ঠ রোগীরা
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাড়তি অর্থ খরচের পাশাপাশি এখানে আরও বড় ঝুঁকি রয়েছে। কোনো রোগীকে পরীক্ষা না করেই বানানো রিপোর্ট ধরিয়ে দেওয়া হলে সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে চিকিৎসা নিতে গিয়ে রোগীর গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
নওদাগ্রামের আব্দুল খালেকের অভিজ্ঞতাও এমনই। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক দেখাতে এসে টিকিট কাটার পর এক দালালের খপ্পরে পড়েন তিনি।
আব্দুল খালেক জানান, ওই দালাল তার রোগের কথা শুনে বলেন, হাসপাতালে ভালোভাবে চিকিৎসক দেখবেন না। সামান্য টাকার জন্য সরকারি হাসপাতালে রোগী দেখানোর দরকার নেই। ৩০০ টাকা ফি দিয়ে ভালো চিকিৎসক দেখিয়ে দেওয়ার কথা বলে তাকে হাসপাতালসংলগ্ন একটি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখানে চিকিৎসক দেখানোর পর বিভিন্ন প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা করানো হয়। চিকিৎসকের ফি ও পরীক্ষা বাবদ তার কাছ থেকে নেওয়া হয় ২ হাজার ২৫০ টাকা। পরে তিনি বুঝতে পারেন, দালাল ও কথিত চিকিৎসকের মাধ্যমে প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
অভিযানেও কমছে না দৌরাত্ম্য
দালালদের বিরুদ্ধে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অভিযান হলেও তাদের তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। গত ৮ জুলাই হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা দুই নারী রোগীকে ভুল বুঝিয়ে বাইরের একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করার অভিযোগে মেহেদী হাসান নামে এক দালালকে আটক করা হয়।
আরও পড়ুন
ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ও তীব্র জনবল সংকটে ধুঁকছে দিঘলিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
এর আগে, গত ১৪ জুন হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা ও হয়রানির অভিযোগে সুমন দেবনাথ (২৫) নামে আরেক দালালকে আটক করে কর্তৃপক্ষ। এরও আগে গত ১২ মে দালালবিরোধী বিশেষ অভিযান চালানো হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, অতীতে একাধিক দালাল আটক হলেও পরে তারা ছাড়া পেয়ে আবারও একই কাজে যুক্ত হয়েছেন। ফলে শুধু অভিযান চালিয়ে নয়, দালালচক্রের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
কর্তৃপক্ষ যা বলছেন
যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত বলেন, হাসপাতালে বিপুলসংখ্যক রোগীর একটি অংশ বাইরে থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দালালচক্র তাদের প্রতারণার শিকার করে।
তিনি বলেন, দালাল ও প্রতারকদের বিরুদ্ধে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সবসময়ই সোচ্চার। মাঝে মধ্যে অভিযান এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানও পরিচালনা করা হয়। অভিযানে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
এইচআরএম/কেএইচকে/এএসএম