বিশ্ব রাজনীতিতে দ্রুত বদলাচ্ছে শক্তির সমীকরণ। একদিকে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সংঘাত, অন্যদিকে ইউক্রেন যুদ্ধ। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা। এর মধ্যেই রাশিয়া ও চীনের ঘনিষ্ঠতা আরও বাড়ছে। ইরানের সঙ্গেও দুই দেশের সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পুরোনো বিশ্বব্যবস্থার সামনে তৈরি হচ্ছে নতুন চ্যালেঞ্জ।
নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলন সেই পরিবর্তনেরই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি। রাশিয়া, চীন ও ইরানের মতো দেশগুলোর পাশাপাশি ভারতও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। সম্মেলনের আলোচনায় উঠে এসেছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার, উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর মতো বিষয়।
রাশিয়া-চীন সম্পর্কের নতুন মাত্রা
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব রাজনীতিতে প্রায় একক প্রভাব বিস্তার করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন ও রাশিয়ার শক্তি বৃদ্ধির ফলে সেই একক আধিপত্যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট।
ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে রাশিয়া আরও বেশি করে চীনের দিকে ঝুঁকেছে। চীনও রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য, জ্বালানি ও কৌশলগত সহযোগিতা বাড়িয়েছে। দুই দেশের পাশাপাশি উত্তর কোরিয়ার সঙ্গেও রাশিয়ার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়েছে। তিন দেশই পারমাণবিক শক্তিধর হওয়ায় তাদের পারস্পরিক সহযোগিতা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিষয় হয়ে উঠেছে।
ইরান যুদ্ধেও বাড়ছে চাপ
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইরান ব্রিকসের সদস্য হওয়ায় যুদ্ধের প্রভাব ব্রিকসের আলোচনাতেও পড়ছে। রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কও দীর্ঘদিনের।
আরও পড়ুন>সৌদি আরবকে ঘিরে ফেলছে ইরান, নতুন সংকটে মধ্যপ্রাচ্যবৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় সংস্কারের প্রস্তাব মোদীর
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে অস্থিরতা বাড়লে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ও বাণিজ্য পরিবহনে বড় প্রভাব পড়তে পারে।
এ অবস্থায় ইরানের সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের ঘনিষ্ঠতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কেও টানাপোড়েন
একসময় ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে ওয়াশিংটনের এশিয়া নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে।
রাশিয়া থেকে ভারতের তেল কেনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ এবং শুল্কনীতি নিয়ে দিল্লির অসন্তোষ প্রকাশ্যে এসেছে। একই সঙ্গে ভারত-পাকিস্তান সংঘাত বন্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতার দাবি নিয়েও নয়াদিল্লির সঙ্গে ওয়াশিংটনের মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে সীমান্ত নিয়ে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার পর ভারত ও চীনও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভারত সফর সেই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। ফলে ভারত এখনো যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হলেও একই সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কও ধরে রাখছে।
পশ্চিমা জোটেও বাড়ছে বিভাজন
শুধু প্রতিপক্ষ দেশগুলোর উত্থান নয়, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জোটের ভেতরেও নানা মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে শুল্কনীতি, বাণিজ্য এবং নিরাপত্তা ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরোধ তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুন>সৌদি আরবকে ঘিরে ফেলছে ইরান, নতুন সংকটে মধ্যপ্রাচ্যবৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় সংস্কারের প্রস্তাব মোদীর
ন্যাটো নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে দায়িত্ব ভাগাভাগি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ডেনমার্কের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনাও মিত্রদের মধ্যে অস্বস্তি বাড়িয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতেও ইউরোপীয় দেশগুলোর অবস্থান সবসময় ওয়াশিংটনের সঙ্গে পুরোপুরি মেলেনি। ফলে পশ্চিমা জোট আগের মতো একক অবস্থানে আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
ব্রিকস কি নতুন বিশ্বব্যবস্থার ভিত্তি?
নয়াদিল্লি ঘোষণায় ব্রিকস নেতারা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। বিশেষ করে আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ব্রিকসের দেশগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোর পক্ষেও অবস্থান নিয়েছে। এর লক্ষ্য সরাসরি ডলারকে সরিয়ে দেওয়া নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক ব্যবস্থায় বিকল্প তৈরি করা।
ব্রিকস একই সঙ্গে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সংস্কার এবং স্বচ্ছ ও নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থার ওপর জোর দিয়েছে।
ব্রিকস কি পশ্চিমবিরোধী জোট?
ব্রিকসকে অনেক সময় পশ্চিমবিরোধী জোট হিসেবে তুলে ধরা হলেও বাস্তবতা আরও জটিল। চীন ও রাশিয়া অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমাতে ব্রিকসকে গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখতে চায়। কিন্তু ভারতসহ অনেক সদস্য দেশ সরাসরি পশ্চিমবিরোধী অবস্থান নিতে আগ্রহী নয়।
ভারতের মূল লক্ষ্য কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখা। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক, অন্যদিকে রাশিয়া, চীন ও অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে সহযোগিতা। ফলে ব্রিকস এখনো ন্যাটো বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো সামরিক বা রাজনৈতিক জোট নয়।
কোন পথে যাবে যুক্তরাষ্ট্র?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে। রাশিয়া-চীন ঘনিষ্ঠতা, ইরানের সঙ্গে সংঘাত, ভারতের সঙ্গে টানাপোড়েন এবং পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে মতপার্থক্য। সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতি, বড় সামরিক শক্তি এবং বিস্তৃত মিত্রজোটের অধিকারী। তাই রাতারাতি বিশ্ব নেতৃত্ব হারানোর সম্ভাবনা নেই। কিন্তু বিশ্ব যে ধীরে ধীরে একক আধিপত্য থেকে বহুমেরু ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে, তার ইঙ্গিত স্পষ্ট।
রাশিয়া-চীনের ঘনিষ্ঠতা, ইরানের সঙ্গে সহযোগিতা এবং ভারতের কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার নীতি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন শক্তির কেন্দ্র তৈরি হচ্ছে। ব্রিকস সেই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। আর এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর না করে কূটনীতি, বাণিজ্য ও মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে সাজাতে হতে পারে।
সূত্র: আল-জাজিরা, রয়টার্স, এনডিটিভি
এমএসএম