ফুটবলের অর্থ আত্মসাৎ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে আবারও কঠোর অবস্থান নিয়েছে ফিফা। আর্থিক অনিয়মের দায়ে দুই সাবেক জাতীয় ফুটবল ফেডারেশন সভাপতিকে আজীবনের জন্য ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ করেছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিচারিক কমিটি।
তাদের একজনের বিরুদ্ধে ফিফার নিষেধাজ্ঞা এসেছিল এক যুগেরও বেশি আগে। কিন্তু সেই শাস্তির পরও তিনি নিজ দেশের ফুটবল ফেডারেশনের নেতৃত্বে থেকে গিয়েছিলেন।
মন্টসেরাট ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের দীর্ঘদিনের সভাপতি ভিনসেন্ট ক্যাসেল এবং মালদ্বীপ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি বাসাম আদিল জালিলকে পৃথক আর্থিক অনিয়মের ঘটনায় আজীবন নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলে শুক্রবার জানিয়েছে ফিফা।
ক্যাসেলের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ‘পদ্ধতিগত স্বার্থের সংঘাত’ এবং ফিফা ও নিজ ফেডারেশনের অর্থ অপব্যবহারের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। অন্যদিকে জালিলের বিরুদ্ধে অভিযোগ- কোভিড-১৯ মহামারির সময় ফিফার দেওয়া ত্রাণ তহবিলের অর্থ নিজের স্বার্থে ব্যবহার করা।
ফিফার কোভিড তহবিলের অর্থ ব্যক্তিগত কাজে!
২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির সময় বিশ্বজুড়ে ফুটবল কার্যক্রম সচল রাখতে ফিফা কোভিড-১৯ রিলিফ প্ল্যান চালু করেছিল। এর আওতায় সদস্য দেশগুলোর ফেডারেশনগুলোকে অনুদান ও ঋণ হিসেবে সর্বোচ্চ ১৫০ কোটি ডলার দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল ফিফা।
মালদ্বীপের সাবেক সভাপতি জালিলের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ওই তহবিলের অর্থের অপব্যবহার করে তিনি ব্যক্তিগত সুবিধা নিয়েছেন।
মালদ্বীপের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফিফার কাছ থেকে পাওয়া অর্থের প্রায় ১২ লাখ ডলার আত্মসাতের ঘটনায় চলতি বছর জালিলকে ২৩ বছরের কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছে। ফুটবলের স্থানীয় ক্লাবগুলোর জন্য বরাদ্দ অর্থ দিয়ে তিনি অ্যাপার্টমেন্ট কিনেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে।
ফিফার বিচারিক কমিটি জালিলকে ফুটবল-সংক্রান্ত সব কার্যক্রম থেকে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি ১০ লাখ সুইস ফ্রাঁ জরিমানাও করেছে। দুই বছরের বেশি সময় আগে তাকে সাময়িকভাবে ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ করেছিল ফিফা। এরপর তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া শেষে এবার স্থায়ী শাস্তি দেওয়া হলো।
এক যুগ আগের নিষেধাজ্ঞাও থামাতে পারেনি ক্যাসেলকে
মন্টসেরাট ফুটবলের দীর্ঘদিনের কর্তা ভিনসেন্ট ক্যাসেলের ঘটনা আরও বিস্ময়কর। তার বিরুদ্ধে এর আগেও ফিফার নৈতিকতা কমিটির তদন্ত ও শাস্তি হয়েছিল।
২০১১ সালে ক্যারিবীয় ফুটবলের এক বহুল আলোচিত নির্বাচনী দুর্নীতি কেলেঙ্কারিতে ক্যাসেল ও তার ফেডারেশনের দীর্ঘদিনের সাধারণ সম্পাদক ট্যান্ডিকা হিউজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিল ফিফার তৎকালীন নৈতিকতা কমিটি।
সেবার কাতারের মোহাম্মদ বিন হাম্মামের ফিফা সভাপতি নির্বাচনে সেপ ব্লাটারকে চ্যালেঞ্জ জানানোর প্রচারণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্যারিবীয় ফুটবল কর্মকর্তাদের ৪০ হাজার ডলার করে নগদ অর্থ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল।
তবে সেই নিষেধাজ্ঞার পরও ক্যাসেল ও হিউজ মন্টসেরাট ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের কার্যক্রম পরিচালনা করে গেছেন। এমনকি সম্প্রতি পর্যন্ত তারা দেশটির ফুটবল প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এ বছর এপ্রিলে মন্টসেরাটের একটি আদালতে কর ফাঁকির অভিযোগেও ক্যাসেল ও হিউজ নিজেদের দোষ স্বীকার করেন।
মন্টসেরাট ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে গত ফেব্রুয়ারিতে ফিফাকে ফেডারেশনটির দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে হয়।
ফিফা একটি জরুরি ব্যবস্থাপনা দল নিয়োগ করে দেশটির ফুটবল প্রশাসনের দায়িত্ব নেয়। এর কারণ হিসেবে সংস্থাটি উল্লেখ করে ‘ব্যতিক্রমী সংকট ও প্রাতিষ্ঠানিক অচলাবস্থা’।
মন্টসেরাট ফিফার বিশ্বকাপ বাণিজ্যিক আয় থেকে বছরে অন্তত ২০ লাখ ডলার পাওয়ার অধিকারী। ফলে দেশটির ফুটবল প্রশাসনে আর্থিক স্বচ্ছতা ও সুশাসনের বিষয়টি ফিফার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
ক্যাসেলকে আজীবন নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি ১০ লাখ সুইস ফ্রাঁ জরিমানা করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ফেডারেশনের কর্মীদের শারীরিক ও মানসিক অখণ্ডতাকে প্রভাবিত করে এমন আচরণের অভিযোগও ছিল।
অন্যদিকে হিউজকে ১৫ বছরের জন্য ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ করেছে ফিফা। তার বিরুদ্ধে অনিয়মিত লেনদেন থেকে সুবিধা নেওয়া ও তা সহজতর করা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। তাকে ১ লাখ ৫০ হাজার সুইস ফ্রাঁ জরিমানাও করা হয়েছে।
মালদ্বীপের সাবেক ফেডারেশন সভাপতি জালিলের পাশাপাশি দেশটির সাবেক অর্থ পরিচালক মোহাম্মদ আগিলকেও শাস্তি দিয়েছে ফিফা। আগিলকে ১০ বছরের জন্য ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাকে ১ লাখ সুইস ফ্রাঁ জরিমানাও করা হয়েছে।
ফিফার ভাষ্য অনুযায়ী, জালিলের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় আগিল সহায়তা করেছিলেন এবং অর্থের অপব্যবহার গোপন রাখতে ভূমিকা রেখেছিলেন। এ ছাড়া ভুয়া নথিপত্র ব্যবহার এবং ফিফার নৈতিকতা তদন্তে সহযোগিতা না করার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে প্রমাণিত হয়েছে।
ফিফার বর্তমান সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো গত বছর মালদ্বীপ সফর করেছিলেন। সে সময় তিনি দেশটির ফুটবল যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে, তা স্বীকার করেছিলেন।
ক্যাসেল ও জালিল- দুজনই ২০১৬ সালে নিজ নিজ দেশের ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। একই বছর ফিফার সভাপতি নির্বাচিত হন ইনফান্তিনো। পরের বছর বাহরাইনে ফিফা কংগ্রেসে দুজনই নিজ নিজ ফেডারেশনের সভাপতি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
সেই কংগ্রেসে দেওয়া বক্তব্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছিলেন ইনফান্তিনো। তিনি বলেছিলেন, যারা ফুটবলকে ব্যবহার করে নিজেদের সম্পদ বাড়াতে চায়, তাদের ফুটবল ছেড়ে দেওয়া উচিত।
আইএইচএস/