
পরদিন অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হবে। রাত তিনটায় ঘুম থেকে উঠে পড়তে বসে যেতেন রিশাদ শরিফ। অ্যাসাইনমেন্ট শেষে সকাল ছয়টায় ধরতেন অফিসের ট্রেন। এভাবেই কেটেছে গত দুই বছর। রিশাদ বলছিলেন, ‘স্বপ্ন দেখতে সবাই পছন্দ করে। কিন্তু সেটাকে বাস্তব করাটা আসলে খুব বোরিং হার্ডওয়ার্ক (একঘেয়ে পরিশ্রম), যেটা প্রতিদিন করতে হয়।’
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির এক্সিকিউটিভ এমবিএতে (ইএমবিএ) ‘ডিনস অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন রিশাদ। অক্সফোর্ড ইএমবিএর জানুয়ারি ২০২৪ কোহর্টে (ব্যাচ) প্রথম হয়ে এই স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি। পেশাজীবীদের জন্য এক্সিকিউটিভ এমবিএ স্নাতকোত্তর পর্যায়ের একটি ডিগ্রি। র্যাঙ্কিংয়ে অক্সফোর্ডের এই ডিগ্রি বিশ্বের সেরা।
রিশাদের বেড়ে ওঠা ঢাকার মালিবাগে। পড়েছেন সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে। নটর ডেম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক। ২০০৯ সালে গাজীপুরের ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (আইইউটি) থেকে স্নাতক করেন। পরের বছর যোগ দেন ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশে। কাজের সূত্রে গত ছয় বছর সপরিবার যুক্তরাজ্যে আছেন। এখন তিনি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর অপারেশন স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটির বৈশ্বিক প্রধান।
অক্সফোর্ডে তাঁর ইএমবিএর ব্যাচে প্রায় ২৬ দেশের ৬০ জন পেশাজীবী ছিলেন। তাঁদের কেউ ব্যবসায়ী, কেউ রাজনীতিবিদ, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা কিংবা চিকিৎসক। প্রত্যেকেরই সংশ্লিষ্ট পেশায় দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতা আছে।
রিশাদের পেশাজীবন প্রায় ১৬ বছরের। স্ত্রী ফারহা দিবা সুফিয়ান একজন অর্থনীতিবিদ। তাঁদের দুই সন্তান। ৯ বছরের নাদিন ও ৫ বছরের হামজা। প্রশ্ন ছিল, ‘এই ব্যস্ত জীবনে আবার কেন পড়ালেখার কথা ভাবলেন?’ রিশাদের সহজ উত্তর, ‘আমি এটাকে ব্যক্তি উন্নয়নের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছি।’
কথায় কথায় আরও দুটি কারণ জানা গেল। প্রথমত, তিনি সন্তানদের অনুপ্রেরণা দিতে চান। দ্বিতীয়ত, দেশের প্রতিনিধিত্ব করার ভাবনাও তাঁর মাথায় ছিল। রিশাদ বলেন, ‘আমার কোহর্টে, কিংবা এর আগে-পরেও কোনো বাংলাদেশিকে আমি অক্সফোর্ডের ইএমবিএতে পাইনি। অনেকে তো আমাদের দেশকে নেতিবাচকভাবে দেখে। মনে করে শাসনব্যবস্থা ভালো না, গরিব। আমি দেশকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করতে চেয়েছি। সে জন্য ভালো রেজাল্ট করার একটা বাড়তি চেষ্টা ছিল।’
এক্সিকিউটিভ এমবিএর জন্য অক্সফোর্ড ছাড়াও লন্ডন বিজনেস স্কুলে আবেদন করেছিলেন রিশাদ। সেখানেও তিনি নির্বাচিত হন। রিশাদ জানালেন, অভিবাসীরা সাধারণত বড় স্বপ্ন দেখার সাহস করে না। সেই অনিশ্চয়তা রিশাদেরও ছিল। তবে তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষ তার স্বপ্নের সমানই বড়। বলছিলেন, ‘বাস্কেটবল খেলোয়াড় মাইকেল জর্ডানের একটা কথা আছে। প্রতিটি না নেওয়া শট একটা মিসড শট। অর্থাৎ, তুমি যদি শটটা না-ই নাও, তার মানে তুমি সেটা মিস করলে। শটটা বরং নিয়ে দেখো, জিততেও পারো। আমার মনে হয়, নিজেকে সেই পারমিশনটা দেওয়া উচিত।’

পরিবার এবং কাজ সামলে প্রথমত ডিগ্রিটা অর্জন করাই ছিল চ্যালেঞ্জিং। একজন বাবা, স্বামী, চাকরিজীবীর দায়িত্বই অনেক বড়। তার সঙ্গে যোগ হয়েছিল আরও একটা পরিচয়—শিক্ষার্থী। তবে গত দুই বছর এই চ্যালেঞ্জ উপভোগও করেছেন তিনি।
রিশাদ তাঁর কোহর্টের সহপাঠীদের ভোটে ‘গ্র্যাজুয়েশন স্পিকার’ নির্বাচিত হন। প্রায় ৬০০ মানুষের সামনে বক্তৃতা দেন তিনি। সেই বক্তব্যে গত দুই বছরের পথচলা প্রসঙ্গে রিশাদ বলেন, ‘গত ২৪ মাসের প্রতিটি সপ্তাহে কোনো দিন আমি ছিলাম একজন ব্যর্থ বাবা, কোনো দিন ব্যর্থ কর্মী, কোনো দিন ব্যর্থ বন্ধু আবার কোনো দিন একজন ব্যর্থ স্বামী। প্রতিদিন আপনি সবকিছু ঠিকভাবে করতে পারবেন না। কিন্তু আমি মনে করি, সামগ্রিকভাবে সবকিছুর মধ্যে একটা ভারসাম্য রাখতে হবে।’
রিশাদ মনে করেন, সবকিছু একা করা সম্ভব ছিল না। বিশেষ করে স্ত্রী ফারহার সহযোগিতা পেয়েছেন। বন্ধু ও সহকর্মীরাও তাঁদের জায়গা থেকে সাহায্য করেছেন।

ছোটবেলা থেকে খেলাধুলা ভালোবাসতেন রিশাদ। স্কুলে ক্রিকেট, ফুটবল, বাস্কেটবলসহ সব ধরনের খেলাই খেলেছেন। স্কাউটিংও করতেন। বলছিলেন, ‘আমার মনে হয়, পড়ালেখার বাইরে খেলাধুলা গুরুত্বপূর্ণ। এটা আমাদের কঠিন সময়ে শান্ত থাকতে শেখায়, নেতৃত্ব শেখায়।’ প্রতিবছর ডিসেম্বরে দেশে আসেন তিনি। দেশে ‘হ্যামার হেডস’ নামে বন্ধুদের একটা ছোট ক্লাব আছে। দেশে এলে সেখানেই বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিতর্ক করতেন। ডিবেটিং ক্লাবের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। বিতর্ক করার পাশাপাশি শেখাতেনও। বিশেষ করে স্কুল ও কলেজ শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ দিতেন। বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
বিতর্কের সুবাদেই তাঁর একটা নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। দেশের তরুণদের ‘ক্রিটিক্যাল থিংকিং’ ও যোগাযোগ-দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করতে চান তিনি। রিশাদ বলেন, ‘জীবনে অসামান্য সব সুযোগ পেয়ে আমি অত্যন্ত ভাগ্যবান ও কৃতজ্ঞ। অর্জিত দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি কাজে লাগিয়ে যদি কোনোভাবে দেশের উপকারে আসতে পারি, তবে তা হবে আমার সৌভাগ্য।’