ক্ষুদ্র দানাকৃতির চিয়া বীজ পুষ্টি ও শক্তির উৎস। চিয়া বীজের বিশেষত্ব হলো এর পুষ্টিমান। চিয়া বীজের পুষ্টিগুণ দানাদার শস্য বা তেলবীজগুলোর মধ্যে সেরা। চিয়া বর্ষজীবী, ঔষধি তৈলবীজ তিল বা তিষির মতো। এক মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। পাতা প্রতিপন্ন, দন্তর। ফুল স্পাইকে সজ্জিত, নীল, বেগুনি বা সাদা রঙের হতে পারে। দুটি বর্ধিত ঠোঁটের মতো ফুল; যা মিন্ট পরিবারের বৈশিষ্ট্য, উচ্চমাত্রায় স্বপরাগী। গোল বা উপবৃত্তাকার বাদামি থেকে ধূসর সাদা বা ধূসর-সাদা রঙের বীজ হয়। চিয়া, দানা শস্য ও হেলথ ফুড হিসেবে প্রথমে আমেরিকায় এবং সেই সাথে সারা দুনিয়ায় গ্রহণযোগ্যতা পায়।
চিয়া বীজের প্রকারভেদ
প্রধানত দুটি ভিন্ন ধরনের চিয়া বীজ আছে, একটি কালো চিয়া বীজ এবং অন্যটি সাদা রঙের বীজ। বেগুনি ফুল, উৎপাদনকারী চিয়া গাছগুলো বাদামি বীজ দেয়। এই বাদামি রঙের বীজগুলোকে কালো চিয়া বলা হয়। সাদা ফুল উৎপন্নকারী চিয়া উদ্ভিদ কেবল সাদা বীজ উৎপন্ন করে। সাদা চিয়া বীজ হলো সাদা, ধূসর এবং হলুদ মার্বেলযুক্ত রঙের বীজ।
চিয়া বীজের বংশবিস্তার
চিয়া মূলত বীজ এবং চারা উভয় থেকে বংশবিস্তার করে। বীজ থেকে চিয়া উদ্ভিদ বৃদ্ধি করা সবচেয়ে ভালো। চিয়া বীজ ৫-৭ দিনের মধ্যে অঙ্কুরিত হতে শুরু করে।
আরও পড়ুন
সম্ভাবনাময় ভোজ্যতেল পেরিলা চাষ করবেন যেভাবে
চাষের জন্য তাপমাত্রা ও জলবায়ু
চিয়া বীজ ফসলের বৃদ্ধির জন্য সর্বনিম্ন ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বাধিক ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং অনুকূল তাপমাত্রা ১৬-২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস প্রয়োজন। চিয়া বীজ ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উষ্ণ তাপমাত্রায় ভালো জন্মে। চিয়া বীজ ফসলের জীবনচক্রের সময়কাল অবস্থানের ওপর নির্ভর করে। বৃদ্ধি উচ্চতা বা অক্ষাংশ দ্বারা প্রভাবিত হয়। অনেক সবজি বীজের মতো চিয়া উদ্ভিদ হলো স্বল্প দিনের ফুল গাছ, যা ১২-১৩ ঘণ্টা ফোটোপেরিওডিক থ্রেশহোল্ডে তার বৃদ্ধি এবং ফলের সময়কাল অক্ষাংশ বা উচ্চতার বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে। উত্তর গোলার্ধে চিয়া অক্টোবরে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে এপ্রিল মাসে ফুল আসতে শুরু করে। বিভিন্ন বাস্তুসংস্থানে চিয়া বীজের জীবনচক্রের সময়কাল ১০০-১৫০ দিনের মধ্যে।
বাংলাদেশে চিয়া বীজ চাষের উপযুক্ত মৌসুম
দেশীয় আবহাওয়ায় চিয়া বীজ রবিশস্য হিসেবে চাষ করা যায়। শীত হলো চিয়া বীজ রোপণ ও বৃদ্ধির আদর্শ সময়। কারণ এটি একটি স্বল্প দিনের ফুল গাছ হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় দীর্ঘদিনের ঋতুতে বৃদ্ধি পায় না। বেশি ফলনের জন্য ১৫ নভেম্বরের মধ্যে চাষ করতে হবে। তবে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ এবং জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহেও বোনা যেতে পারে। ফসল ঘরে ওঠাতে ৯০-১০০ দিন সময় লাগে।
চিয়া বীজ চাষের জন্য মাটি
ফসলটি সব রকম মাটিতে চাষ করা যায়। হালকা থেকে মাঝারি কাদামাটি বা বেলে থেকে বেলে দোআঁশ মাটি প্রয়োজন। ভালোভাবে নিষ্কাশিত, মাঝারি উর্বর মাটিতে ভালো ফলন দিতে পারে। এটি অ্যাসিড মাটি এবং মাঝারি খরাও প্রতিরোধ করতে পারে। চিয়া বীজ বপন ও চারা স্থাপনের জন্য সম্পূর্ণ আর্দ্র মাটির প্রয়োজন। কিন্তু পরিপক্ব চিয়া উদ্ভিদ বৃদ্ধির সময় ভেজা মাটি সহ্য করতে পারে না।
আরও পড়ুন
বাংলাদেশে ত্বীন ফলের বাণিজ্যিক চাষের সম্ভাবনা কেমন?
বীজহার, বীজ বপন ও চারা রোপণ
সাধারণত বিঘাপ্রতি ১০০ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়। ৩-৪টি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরা করে জমি প্রস্তুত করে নিতে হবে। মাটি আগাছামুক্ত হওয়া উচিত। চিয়া বীজ খুবই ক্ষুদ্র বীজ। তাই সরাসরি বীজ ছিটিয়ে বপন করার আগে প্রায় পাঁচ কেজি শুকনো বালি বা ছাই বীজের সাথে মিশিয়ে নিতে হবে। তারপর সরিষা বা তিল এবং ডাটাশাক বীজের মতো ৪০-৫০ সেন্টিমিটার সারি থেকে সারিতে বালু বা ছাই মাখা বীজ ক্রমাগত ছেটাতে হবে। এ ছাড়া চারা করে ১৫-২৫ দিন বয়সের চারা ৪০-৫০ সেন্টিমিটার সারি থেকে সারিতে এবং গাছ থেকে গাছ ২০ সেন্টিমিটার দূরত্বে ভেজা মাটিতে লাগানো যায়।
ফসল সংগ্রহ
যখন ৬০-৮০% ফুলের মাথা বাদামি এবং হলুদ-ব্রাউন রঙে পরিণত হয়; তখন চিয়া ফসল কাটার জন্য প্রস্তুত হয়। মাটির ওপরে থাকা পুরো চিয়া গাছগুলো কেটে নিয়ে ত্রিপল বা পরিষ্কার মেঝেতে রেখে রোদে শুকাতে হবে। এক-দুই দিন রোদে শুকানোর পরে, বাঁশ বা কাঠের লাঠি দিয়ে আলতো ভাবে আঘাত করলে গাছ থেকে বীজ আলাদা হয়ে যাবে। তারপর বীজ ঝেরে পরিষ্কার করে সংরক্ষণ করতে হবে। চাষের পদ্ধতি ও ভৌগোলিক অঞ্চলভেদে ফলন বিঘাপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ কিলোগ্রাম পর্যন্ত হতে পারে।
এসইউ