পূজার আবহে কলকাতার বাজারে বেড়েছে ইলিশের চাহিদা। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দামও। বিশেষ করে এক কেজি বা তার বেশি ওজনের তাজা ইলিশের সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে ক্রেতাদের কেউ ছোট আকারের তাজা ইলিশ কিনছেন, কেউ ভরসা করছেন হিমঘরে সংরক্ষিত মাছের ওপর।
তবে বড় আকারের ভালো মানের ইলিশ কিনতে গেলে গুনতে হচ্ছে আরও বেশি দাম। ব্যবসায়ীরা বলছেন, রান্নাপূজার আগে প্রতিবছরই ইলিশের চাহিদা বেড়ে যায়। এ সময় অনেক পরিবার পরদিনের রান্নার জন্য আগেভাগে খাবার তৈরি করে রাখে। সেই তালিকায় ইলিশের বিশেষ জায়গা রয়েছে।
আরও পড়ুন
প্রথমবার বাংলাদেশে এলো ‘স্বাদ-গন্ধহীন’ গুজরাটি ইলিশ
এবার বাড়তি চাহিদার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বড় ইলিশের কম সরবরাহ। ফলে উৎসবের বাজারে সুস্বাদু এই মাছের দামও আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে।
সাগরে বেশি মিলছে ছোট ইলিশ
বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরা পশ্চিমবঙ্গের জেলেদের ভাষ্য, এবার সাগরে ছোট আকারের ইলিশ বেশি পাওয়া যাচ্ছে। এক কেজি বা তার বেশি ওজনের ইলিশের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈরী আবহাওয়া। খারাপ আবহাওয়ার কারণে গভীর সমুদ্রে গিয়ে মাছ ধরা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বড় ইলিশের আশায় দীর্ঘ সময় সাগরে থাকার ঝুঁকি নিতে চাইছেন না অনেক জেলে।
আরও পড়ুন
পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশি বলে বিক্রি হচ্ছে ‘স্বাদ-গন্ধহীন’ নকল ইলিশ
জেলে তারাপদ দাস বলেন, এখন সাগরে ছোট ইলিশের পরিমাণ বেশি। একসঙ্গে অনেক ছোট মাছ ধরা পড়ছে। কিন্তু বড় ইলিশের আশায় গভীর সমুদ্রে গেলে মাছ পাওয়ার সম্ভাবনা কম থাকায় অনেক জেলে ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।
জালে পড়ছে কম বয়সী ইলিশও
জেলেদের কেউ কেউ ইলিশ কমে যাওয়ার জন্য মনোফিলামেন্ট জালের ব্যবহারকেও দায়ী করছেন। তাদের দাবি, প্রচলিত দড়ির জালের পরিবর্তে ক্যাটাগরি-১ ও ক্যাটাগরি-২ ধরনের মনোফিলামেন্ট জালের ব্যবহার বেড়েছে।
প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ মিলিমিটার ফাঁসের এসব জালে ছোট ও মাঝারি আকারের ইলিশ বেশি ধরা পড়ছে বলে অভিযোগ তাদের। ফলে মাছ অবতরণকেন্দ্রগুলোতে বড় ইলিশের সরবরাহ কমে যাচ্ছে।
আরও পড়ুন
একমাস আগেই বাংলাদেশের কাছে ইলিশ চায় ভারত, এখন কেন উল্টো যাত্রা?
সুন্দরবন সামুদ্রিক মৎস্যজীবী শ্রমিক ইউনিয়নের সম্পাদক সতীনাথ পাত্র বলেন, বর্তমানে ৫০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশই বেশি পাওয়া যাচ্ছে।
তার মতে, ৫০০ গ্রামের ইলিশেরও বিশেষ চাহিদা রয়েছে। বিশ্বকর্মা পূজা বা রান্নাপূজার সময় অনেক ক্রেতা এই আকারের ইলিশই পছন্দ করেন।
তবে তার অভিযোগ, কিছু ব্যবসায়ী বেশি দামে মাছ কিনে বাজারে ছাড়ার আগে সংরক্ষণ করে রাখছেন। উৎসবের সময় দাম আরও বাড়বে—এমন প্রত্যাশা থেকেই তারা এটি করছেন বলে দাবি করেছেন তিনি।
হিমঘরেও কমছে মজুত
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, রান্নাপূজার বাড়তি চাহিদা মেটাতে গত দুই মাসে ইলিশ মজুত করা হয়েছিল। দিঘা, নামখানা, ডায়মন্ড হারবার ও কলকাতায় প্রায় ২৫টি হিমঘরে ইলিশ মজুত করা হয়েছে বলে ধারণা।
এমন একটি হিমঘরের মালিক জয়দেব হাঁটি বলেন, মিয়ানমারের ইলিশ মজুত থাকলেও গুজরাটের ইলিশ খুব একটা মজুত করা হয়নি; কারণ গুজরাটের ইলিশের বেশিরভাগই ছিল ডিমভরা, যা কলকাতার বাজারে খুব একটা পছন্দ করা হয় না। তিনি বলেন, ‘নতুন চালান আসার কথা রয়েছে, তাই পূজার সময় বড় কোনো ঘাটতির আশঙ্কা করছি না।’
মিয়ানমারের ইলিশ সংরক্ষণ করা হয়েছে। তবে সেই মজুতের বড় একটি অংশ এরই মধ্যে বাজারে চলে গেছে। এ কারণে বাজারে ইলিশের দামও শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
১ কেজি ইলিশের দাম আড়াই হাজার রুপি
কলকাতার লেক মার্কেটের ব্যবসায়ী অমর দাশ বলেন, ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ এখন আগের তুলনায় পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি জানান, ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের সংরক্ষিত ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ রুপিতে। ১ দশমিক ১ কেজি ওজনের ইলিশের দাম প্রায় ১ হাজার ৬০০ রুপি। আর দেড় কেজি ওজনের মাছের দাম প্রায় ১ হাজার ৮০০ রুপি।
এছাড়া, দেড় কেজি ওজনের তাজা ইলিশের দাম উঠেছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ রুপিতে। অন্যদিকে এক কেজি বা তার বেশি ওজনের তাজা ইলিশের কেজি বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ রুপিতে।
পূজা পর্যন্ত দাম চড়া থাকার আশঙ্কা
পশ্চিমবঙ্গের ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মাকসুদ বলেন, বাজারে তাজা ইলিশের সরবরাহ কমেছে। তবে সংরক্ষিত ইলিশ ও গুজরাটের ইলিশ বাজারে পাওয়া যাচ্ছে।
রান্নাপূজাকে ঘিরে ইলিশের চাহিদা এখন তুঙ্গে। এর মধ্যে বড় আকারের তাজা ইলিশের সরবরাহ কম থাকায় দামও কমার সম্ভাবনা কম।
ব্যবসায়ীদের ধারণা, রান্নাপূজা পর্যন্ত কলকাতার বাজারে ইলিশের দাম চড়া থাকতে পারে। নতুন করে পর্যাপ্ত ইলিশ বাজারে না এলে বড় আকারের তাজা মাছের সংকটও অব্যাহত থাকতে পারে।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়াকেএএ/