মুহাম্মদ শফিকুর রহমান
‘স্যার’ বললে অনেকে খুশি হন। আবার কেউ কেউ সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠেন, ‘আমাকে ভাই বলবেন।’ কেউ আবার ‘ভাইয়া’ শুনতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। অন্যদিকে কেউ মনে করেন, অফিসে অতটা ঘনিষ্ঠ সম্বোধনের প্রয়োজন নেই। তাহলে প্রশ্ন হলো—কাকে স্যার বলব, কাকে বস আর কাকে ভাইয়া?
আসলে এর কোনো একক আন্তর্জাতিক নিয়ম নেই। কর্মক্ষেত্রে কাউকে কীভাবে সম্বোধন করা হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি, ব্যক্তির পছন্দ, পদমর্যাদা এবং পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর। বিভিন্ন পেশাগত শিষ্টাচার গাইডেও বলা হয়, নতুন বা অপরিচিত কারও সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে শুরুতে কিছুটা আনুষ্ঠানিক থাকা নিরাপদ; পরে তিনি কীভাবে সম্বোধিত হতে চান, সেটি অনুসরণ করা যেতে পারে।
আরও পড়ুন
সেনাবাহিনীর চাকরি পেতে যেসব যোগ্যতা আপনাকে এগিয়ে রাখবে
বাংলাদেশের অনেক অফিসে ব্যবহারের ক্ষেত্রে ‘স্যার’ বেশ পরিচিত একটি সম্মানসূচক সম্বোধন। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে আবার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ‘বস’ বলা হয়। কোথাও সবাই সবাইকে ‘ভাই’ বলে, আবার কোথাও একই প্রতিষ্ঠানে জুনিয়র-সিনিয়র সবাইকে ‘ভাইয়া’ বলার সংস্কৃতিও আছে। অর্থাৎ একই সম্বোধন একেক প্রতিষ্ঠানে একেক অর্থ বহন করতে পারে।
তাই নতুন কোনো অফিসে যোগ দিলে নিজের মতো করে সম্বোধনের নিয়ম চালু করার চেয়ে আগে পরিবেশটা বোঝা ভালো। সহকর্মীরা তাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে কীভাবে ডাকছেন, সেটি লক্ষ্য করা যেতে পারে। যিনি যে সম্বোধনে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, সেটি জানা গেলে বিষয়টি আরও সহজ হয়ে যায়।
ধরা যাক, একজন ম্যানেজারকে সবাই ‘স্যার’ বলে ডাকছেন। নতুন কর্মী এসে তাকে ‘ভাইয়া’ বলা শুরু করলেন। এতে ওই ম্যানেজার স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেও পারেন, আবার নাও করতে পারেন। বিপরীত ঘটনাও ঘটতে পারে। কেউ হয়তো নিজেই বলে দিলেন, ‘স্যার বলবেন না, ভাইয়া বলুন।’ তখন তাকে ভাইয়া বলায় কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়। কারণ সম্বোধনের ক্ষেত্রে ব্যক্তির নিজের পছন্দও গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন
নার্স হিসেবে ক্যারিয়ার গড়বেন যেভাবে
একই বিষয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রযোজ্য। বিশেষ করে পেশাগত প্ল্যাটফর্মে নতুন কারও সঙ্গে যোগাযোগের সময় শুরুতেই অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ সম্বোধন না করাই নিরাপদ। প্রথম যোগাযোগে কিছুটা ফরমাল থাকা পেশাগত সৌজন্যের অংশ হতে পারে। পরে ব্যক্তিটি কীভাবে সম্বোধিত হতে চান, সেটি বুঝে নেওয়া যায়। পেশাগত যোগাযোগের বিভিন্ন নির্দেশিকাতেও অপরিচিত ব্যক্তিকে প্রথমে টাইটেল ব্যবহার করে সম্বোধনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে ‘স্যার’, ‘বস’ কিংবা ‘ভাইয়া’—কোনোটিই কর্মক্ষেত্রে দক্ষতার বিকল্প নয়। বরং কখনো কখনো আমরা সম্বোধন নিয়ে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়ি যে আসল বিষয়টি ভুলে যাই—কাজ কেমন করছি?
একজন কর্মী তার বসকে দিনে বিশবার ‘স্যার’ বলছেন, কিন্তু সময়মতো কাজ জমা দিচ্ছেন না—এতে সেই সম্বোধনের মূল্য কতটুকু? অন্যদিকে কেউ হয়তো তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে শুধু নাম ধরে ডাকছেন, কিন্তু দায়িত্বের জায়গায় অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য। শেষ পর্যন্ত কর্মক্ষেত্রে তার মূল্যায়ন হবে কাজের মান, দায়িত্বশীলতা, সময়ানুবর্তিতা ও পেশাদার আচরণের ভিত্তিতেই।
তবে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টাও সব সময় ভালো ফল দেয় না। কাউকে ‘ভাইয়া’ বললেই সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়ে যায় না, আবার ‘স্যার’ বললেই সম্মান প্রমাণ হয় না। সম্মান আসলে আচরণে প্রকাশ পায়। কখনো দেখা যায়, একই অফিসে কেউ বসকে ‘স্যার’ বলছেন, কেউ ‘বস’, আবার কেউ ‘ভাইয়া’। এর পেছনে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, বয়স, প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি কিংবা দীর্ঘদিনের কাজের সম্পর্ক—বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। নারী ও পুরুষ সহকর্মীদের সম্বোধনের ধরনেও কখনো পার্থক্য দেখা যায়। কিন্তু এর পেছনে নির্দিষ্ট কোনো সার্বজনীন নিয়ম আছে—এমনটা বলার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। তাই বিষয়টিকে ব্যক্তিগত ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য হিসেবেই দেখা ভালো।
সবচেয়ে নিরাপদ নিয়ম হতে পারে—নতুন পরিবেশে গেলে আগে দেখুন, শুনুন, বুঝুন; তারপর সম্বোধন করুন। কেউ যদি বলেন, ‘আমাকে ভাইয়া বলবেন’—ভাইয়া বলুন। কেউ যদি ‘স্যার’ পছন্দ করেন—স্যার বলুন। প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতিতে ‘বস’ প্রচলিত হলে বস বলুন। আর যদি বুঝতে না পারেন, শুরুতে ভদ্র ও আনুষ্ঠানিক সম্বোধনই তুলনামূলক নিরাপদ।
আরও পড়ুন
আয়কর আইনজীবী হিসেবে ক্যারিয়ার গড়বেন যেভাবে
শেষ পর্যন্ত একজন কর্মীর পরিচয় তার মুখে কতবার ‘স্যার’ বা ‘বস’ শব্দটি এসেছে, তা দিয়ে নয়; তার কাজ দিয়ে তৈরি হয়। যে কর্মী দায়িত্ব বুঝে সময়মতো কাজ শেষ করেন, তাকে নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বারবার খোঁজ নিতে হয় না। কারণ তিনি জানেন—এই মানুষটিকে দায়িত্ব দিলে কাজটি ঠিক সময়ে হয়ে যাবে।
তাই অফিসে কাকে ‘স্যার’, কাকে ‘বস’ আর কাকে ‘ভাইয়া’ বলবেন—তা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করার চেয়ে একটি বিষয় মনে রাখা ভালো; সম্বোধন সৌজন্য তৈরি করতে পারে, কিন্তু আপনার কাজই তৈরি করবে আপনার পেশাগত পরিচয়।
এমআইএইচ