একটা স্মার্টফোনের স্ক্রিন মাঝখান থেকে ভাঁজ করে ফেলছেন, অথচ ডিসপ্লে দিব্যি কাজ করছে বিষয়টি অবাক করার মতোই। সাধারণ ফোনের কাচের স্ক্রিনে এমনটা করার চেষ্টা করলে মুহূর্তেই ফাটল ধরতে পারে। কিন্তু ফোল্ডেবল ফোনে বারবার স্ক্রিন খোলা ও বন্ধ করলেও সেটি কীভাবে টিকে থাকে? এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে ডিসপ্লের উপাদান, গঠন এবং বিশেষ হিঞ্জ প্রযুক্তিতে।
বর্তমান সময়ের ফোল্ডেবল ফোনগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে প্রয়োজনের সময় ছোট আকারে ভাঁজ করে রাখা যায় এবং খুললে পাওয়া যায় তুলনামূলক বড় ডিসপ্লে। ফলে স্মার্টফোন ও ছোট ট্যাবলেটের সুবিধা একই ডিভাইসে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল এমন একটি ডিসপ্লে তৈরি করা, যা নমনীয় হলেও দীর্ঘদিন ব্যবহারযোগ্য।
ওএলইডি-ই কেন ফোল্ডেবল ফোনে বেশি ব্যবহার করা হয়?
ফোল্ডেবল ফোনের ডিসপ্লেতে সাধারণত ওএলইডি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এর অন্যতম কারণ হলো ওএলইডি প্যানেলকে অত্যন্ত পাতলা এবং নমনীয় করে তৈরি করা সম্ভব। এলসিডি ডিসপ্লের মতো এর জন্য আলাদা ব্যাকলাইটের প্রয়োজন হয় না। ওএলইডি-এর প্রতিটি পিক্সেল নিজেই আলো তৈরি করতে পারে। ফলে ডিসপ্লের মোট স্তর তুলনামূলকভাবে পাতলা রাখা যায়। আর পাতলা ও নমনীয় গঠনই স্ক্রিনকে নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধে বাঁকানোর সুযোগ দেয়।
আরও পড়ুন
নতুন ফোল্ডেবল স্মার্টফোন আনছে স্যামসাং
সাধারণ কাচের স্ক্রিন নয়
ফোল্ডেবল ফোনের ডিসপ্লে নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো এটি বুঝি সাধারণ স্মার্টফোনের মতো পুরোপুরি কাচের তৈরি। বাস্তবে তা নয়। ডিসপ্লের ওপর বিশেষ নমনীয় কভার উপাদান ব্যবহার করা হয়, যা স্ক্রিনকে দৈনন্দিন ব্যবহারের সময় সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে।
এই নমনীয় স্তরের কারণে স্ক্রিন ভাঁজ করার সময় সাধারণ কাচের মতো সহজে ভেঙে যায় না। তবে ফোল্ডেবল স্ক্রিন যে একেবারেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, এমন নয়। ধারালো বস্তু দিয়ে আঁচড়, অতিরিক্ত চাপ, আঘাত কিংবা ভুলভাবে ব্যবহারে ডিসপ্লে নষ্ট হতে পারে।
স্ক্রিনের ভেতরে একাধিক স্তর
ফোল্ডেবল ওএলইডি ডিসপ্লে আসলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তরের সমন্বয়ে তৈরি। এর মধ্যে থাকে সাবস্ট্রেট, টিএফটি, ওএলইডি এবং সুরক্ষামূলক কভার স্তর। সাবস্ট্রেট পুরো ডিসপ্লে কাঠামোর ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। টিএফটি স্তর পিক্সেল নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক সংকেত পরিচালনা করে। ওএলইডি স্তরে থাকা পিক্সেলগুলো আলো তৈরি করে ছবি দেখায়।
সবশেষে থাকা কভার স্তর ডিসপ্লের উপরের অংশকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে। এই স্তরগুলোর উপাদান ও গঠন এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়, যাতে ডিসপ্লে বাঁকানোর সময় অতিরিক্ত চাপ তৈরি না হয়।
আরও পড়ুন
গ্যালাক্সি জেড ট্রাইফোল্ড: ৩ ভাঁজ করা ফোন আনলো স্যামসাং
শুধু স্ক্রিন নয়, হিঞ্জও গুরুত্বপূর্ণ
ফোনের ডিসপ্লে নমনীয় হলেই কিন্তু ফোল্ডেবল ফোন তৈরি করা যায় না। এর সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ফোনের হিঞ্জ বা কবজা ব্যবস্থা। ফোনের মাঝখানে থাকা এই মেকানিজম নির্দিষ্ট পথে দুই অংশকে ভাঁজ ও খোলার সুযোগ দেয়।
ফলে স্ক্রিনকে ইচ্ছামতো মোচড়ানো হয় না; বরং নির্দিষ্টভাবে বাঁকানো হয়। ডিসপ্লের নমনীয় স্তর এবং হিঞ্জের নকশা একসঙ্গে কাজ করেই ফোল্ডেবল ফোনকে এই বিশেষ সুবিধা দেয়।
তাহলে কি ফোল্ডেবল স্ক্রিন কখনো ভাঙবে না?
একেবারেই তা নয়। ফোল্ডেবল ফোনের ডিসপ্লে সাধারণ ফোনের তুলনায় নমনীয় হলেও এটি অক্ষত রাখার জন্য ব্যবহারকারীকেও সতর্ক থাকতে হয়। বিশেষ করে স্ক্রিনে অতিরিক্ত চাপ দেওয়া, ধুলা-ময়লা জমতে দেওয়া বা ধারালো বস্তুর সংস্পর্শে আনা থেকে বিরত থাকা উচিত।
অর্থাৎ, ফোল্ডেবল ফোনের স্ক্রিন ভাঁজ করেও টিকে থাকার রহস্য কোনো একক প্রযুক্তিতে নয়। নমনীয় ওএলইডি প্যানেল, একাধিক বিশেষ স্তর, সুরক্ষামূলক কভার এবং উন্নত হিঞ্জ প্রযুক্তি সবকিছুর সমন্বয়েই সম্ভব হয়েছে এই প্রযুক্তি। তাই ফোনের স্ক্রিন ভাঁজ হলেও তা সাধারণ কাচের মতো ভেঙে যায় না।
কেএসকে