মুহাম্মদ শফিকুর রহমান
ফিচার লিখতে গিয়ে অনেকেই ভাবেন, ভালো কিছু তথ্য, কয়েকটি উদ্ধৃতি আর সুন্দর ভাষায় লিখলেই একটি ভালো ফিচার হয়ে যায়। আসলে তা নয়। ফিচার হলো বাস্তব মানুষ, ঘটনা ও তথ্যকে গল্পের মতো করে পাঠকের সামনে তুলে ধরার একটি সাংবাদিকতামূলক রীতি। এখানে তথ্যের পাশাপাশি থাকে গল্প, দৃশ্য, পটভূমি, অনুভূতি ও কৌতূহল। একটি ভালো ফিচারের শুরু কীভাবে হবে, শিরোনাম কেমন হবে, কোথায় তথ্য দিতে হবে, কোথায় উদ্ধৃতি ব্যবহার করতে হবে এবং কোন ভুলগুলো এড়িয়ে চলতে হবে এসব নিয়েই এই লেখায় অল্প কথায় কিছু অভিজ্ঞতা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।
ফিচার কি?
ফিচার হলো সাংবাদিকতার এমন একটি লেখা, যেখানে শুধু ঘটনা বা তথ্য নয়,একজন মানুষ, ঘটনা বা বিষয়ের গল্প, পটভূমি, অনুভূতি ও অজানা দিক গল্পের মতো তুলে ধরা হয়। নিউজ জানায় কী ঘটেছে, আর ফিচার বলে কীভাবে, কেন, কার জীবনে কী প্রভাব ফেলেছে এবং এর পেছনের গল্পটা কী।
ফিচারের শিরোনাম
সাধারণত ছোট, আকর্ষণীয়, কৌতূহল জাগানো এবং লেখার মূল গল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়। সরাসরি সব তথ্য বলে না দিয়ে পাঠককে ভেতরের গল্প পড়তে আগ্রহী করে। যেমন ধরুন-
আরও পড়ুন
গোপাল ভাঁড়ের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র কি বাস্তবেও এমন বোকা ছিলেন?
মাটিতে ভবিষ্যৎ
এই শিরোনাম দেখেই পাঠকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে কার ভবিষ্যৎ? কীভাবে মাটিতে ভবিষ্যৎ তৈরি হচ্ছে? উত্তরটি জানতে সে লেখাটি পড়বে।
ফিচারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা
একটি ফিচারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো শুরুটা বিশেষ করে প্রথম ২-৩টি লাইন বা ইন্ট্রো। কারণ পাঠক প্রথম কয়েক লাইন পড়েই ঠিক করেন, লেখাটি তিনি চালিয়ে পড়বেন কি না।
ফিচারের ইন্ট্রো
একটি ভালো ফিচারের ইন্ট্রো আসলে পুরো লেখার দরজা। প্রথম কয়েকটি বাক্যেই পাঠককে ভেতরে ঢুকতে ইচ্ছা করাতে হয়। বিশেষ করে মানবিক ফিচারে ইন্ট্রো যত ছোট, দৃশ্যমান ও কৌতূহল জাগানিয়া হবে, তত ভালো।
ভালো ইন্ট্রোর ৮টি গুণ
ছোট হতে হবে। শুরুটা সাধারণত ৩-৬টি বাক্য যথেষ্ট। শুরুতেই পুরো গল্প বলে দেওয়া ঠিক নয়।
প্রথম বাক্যেই টান থাকতে হবে। প্রথম বাক্য পড়েই পাঠকের মনে প্রশ্ন তৈরি হওয়া ভালো ‘তারপর কী হলো?’
দৃশ্য থাকতে হবে। শুধু তথ্য নয়, পাঠক যেন চোখের সামনে দৃশ্যটি দেখতে পান। যেমন: ‘রাস্তার পাশে পড়ে ছিল ছোট্ট একটি পেয়ারা গাছ।’ এখানে একটি দৃশ্য তৈরি হচ্ছে।
কৌতূহল তৈরি করতে হবে। ইন্ট্রোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। পাঠক যেন মনে করেন, ‘এই মানুষটির গল্পটা একটু পড়ি।’
মূল চরিত্রকে দ্রুত সামনে আনতে হবে। তবে সব তথ্য একসঙ্গে নয়। তার পরিচয় এমনভাবে আসবে, যাতে গল্পের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশে যায়।
আবেগ থাকবে, কিন্তু আবেগ চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। ‘অসাধারণ’, ‘মহান’, ‘অনন্য’-এ ধরনের বিশেষণ না দিয়েও গল্প আবেগ তৈরি করতে পারে।
একটি বৈপরীত্য বা চমক থাকলে ভালো। সুন্দর একটি বৈপরীত্য হলো- এক হাতে ক্যামেরা, অন্য হাতে গাছের বীজ।একজন ফটোসাংবাদিক সাধারণত ক্যামেরা নিয়ে ভাবেন; তিনি ক্যামেরার সঙ্গে বীজও বহন করেন।
ইন্ট্রোতে সব উত্তর দেওয়া যাবে না। এটাই খুব গুরুত্বপূর্ণ। ইন্ট্রো যদি বলে দেয় তিনি কে, কেন গাছ লাগান, কত গাছ লাগিয়েছেন, কোথায় লাগিয়েছেন তাহলে পাঠকের জানার বাকি থাকে না।
ইন্ট্রোতে তথ্য নয়, গল্প আগে। যেমন- রাস্তার পাশে পড়ে থাকা ছোট্ট একটি পেয়ারা গাছ বাড়িতে এনে মাটিতে পুঁতেছিল তৃতীয় শ্রেণির এক শিশু। প্রায় ১০ বছর পর সেই গাছের পেয়ারা খেয়েছে তার পরিবার। সম্প্রতি বন্যায় গাছটি মারা গেছে। কিন্তু গাছ লাগানোর অভ্যাসটি মরেনি।
এখানে আমরা এখনো জানি না শিশুটি কে। তারপর- সেই শিশুটিই এখন এস এম আরিফুল আমিন। পেশায় ফটোসাংবাদিক। ক্যামেরার সঙ্গে তার ব্যাগে এখন জায়গা করে নেয় তালবীজ, খেজুরের বীজ কিংবা কোনো দেশীয় গাছের চারা। এখানেই গল্পের দরজা খুলে যায়।
আরও পড়ুন
৯০০ টাকা দিলেই পেশিবহুল সুদর্শন পুরুষকে জড়িয়ে ধরা যাবে
ফিচার লেখার সময় সবচেয়ে বেশি যে ভুলগুলো দেখা যায়, সেগুলো হলো-
ইন্ট্রো বেশি বড় করা-শুরুতেই সব তথ্য বলে দেওয়া।
গল্পের বদলে তথ্যের স্তূপ-একের পর এক তথ্য, কিন্তু গল্পের প্রবাহ নেই।
একই কথা বারবার বলা-বিশেষ করে চরিত্রের কাজ, সাফল্য বা অনুভূতি পুনরাবৃত্তি করা।
শিরোনাম দুর্বল হওয়া-খুব সাধারণ বা পুরো লেখার সবকিছু শিরোনামেই বলে দেওয়া।
অতিরিক্ত প্রশংসা করা-সাংবাদিকের বদলে লেখক যেন চরিত্রটির প্রচারক হয়ে যান।
অতিরিক্ত আবেগ ঢোকানো-তথ্যের চেয়ে আবেগ বেশি হয়ে যাওয়া।
উদ্ধৃতি বেশি ব্যবহার করা-সাক্ষাৎকারের উত্তর হুবহু বসিয়ে দেওয়া, প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পাদনা না করা।
দৃশ্য না থাকা-পাঠক যেন মানুষটিকে বা ঘটনাটিকে চোখের সামনে দেখতে না পান।
অপ্রয়োজনীয় তথ্য ঢোকানো-মূল গল্পের সঙ্গে সম্পর্ক নেই এমন তথ্য যোগ করা।
শেষটা দুর্বল হওয়া-হঠাৎ তথ্য দিয়ে লেখা শেষ করে দেওয়া; কোনো অর্থপূর্ণ সমাপ্তি না থাকা।
নিজের মতামত বেশি দেওয়া-চরিত্র বা ঘটনা সম্পর্কে সাংবাদিকের বিচার-বিশ্লেষণ বেশি চলে আসা।
তথ্য যাচাই না করা-বিশেষ করে সংখ্যা, পুরস্কার, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বা বড় কোনো দাবিকে যাচাই ছাড়া লেখা।
আরও পড়ুন
ব্লু-জুয়েলের পর্দার দুঃসাহসিক অভিযান যেন বাস্তবে তাদের ফেরার গল্প
সবচেয়ে বড় ভুলটি হলো: ফিচারকে জীবনী বা প্রশ্নোত্তর বানিয়ে ফেলা।
ফিচার মূলত নন-ফিকশন লেখা। অর্থাৎ, ফিচারে বাস্তব মানুষ, বাস্তব ঘটনা ও যাচাইযোগ্য তথ্য ব্যবহার করা হয়। তবে সেটিকে গল্পের মতো আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়। সহজভাবে: ফিচার = বাস্তব তথ্য + গল্প বলার কৌশল
লেখক: ফিচার লেখক
কেএসকে